আজ ১৪ নভেম্বর, বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতির অনুরোধে, বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবে, জাতিসংঘের সম্মতিতে সারাবিশ্বে ১৪ই নভেম্বর “বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস” হিসাবে পালিত হচ্ছে। ডায়াবেটিস এর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য এ ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করাই হলো এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজকে পালিত হচ্ছে এ দিনটি।
দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করি, ডায়েবেটিস থেকে মুক্ত থাকি’।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ডায়াবেটিস সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য সরকারের পাশাপাশি এগিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, গণমাধ্যম, অন্যান্য সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সুধীজনদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘নগরায়নের ফলে মানুষের জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাবেই ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা সারা বিশ্বে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশেও এ রোগীর সংখ্যা কম নয়। এ অবস্থায় ডায়াবেটিস রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ জরুরি।’
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকার ডায়াবেটিসসহ সব ধরনের রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বিভিন্নমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।’
দেশে গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ‘নতুন নতুন হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বহু গুণে বাড়ানো হয়েছে। বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও প্যারামেডিকস্ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশু স্বাস্থের উন্নতি হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে আমাদের সাফল্যের স্বীকৃতি আজ বিশ্বব্যাপী। আমরা এমডিজি অ্যাওয়ার্ড ও সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল রোগ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য। আর এজন্য দরকার স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া, কায়িক পরিশ্রম বা নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া, কায়িক পরিশ্রম বা নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত রাখলে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়।’
বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি এবং ২০৩০ সালে এ সংখ্যা ৫০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আশির দশকে দেশে ডায়াবেটিসের প্রবণতা ছিল মাত্র দুই শতাংশের মতো। সেখানে আজ তা ঢাকা শহরেই প্রায় ১০ শতাংশ ছুঁয়েছে এবং প্রি-ডায়াবেটিসের (ডায়াবেটিস এর আগের ধাপ) হার আরো প্রায় ১০ শতাংশ।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলেও এর সামগ্রিক প্রবণতা প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশ। এভাবে বাড়তে থাকলে শুধু ডায়াবেটিসের কারণেই দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। শুধু দেশেই এখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। সেই সঙ্গে প্রতি বছর এক লাখ নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছে।
আর বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি। যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আশির দশকে দেশে ডায়াবেটিসের প্রবণতা ছিল মাত্র দুই শতাংশের মতো। সেখানে আজ তা ঢাকা শহরে প্রায় ১০ শতাংশ ছুয়েছে এবং প্রিডায়াবেটিসের (ডায়াবেটিস এর আগের ধাপ) হার আরো প্রায় ১০ শতাংশ।
স্বাস্থ্যসম্মত খাবার শুরু হোক সকালের নাস্তা থেকেই।ডায়াবেটিস রোগীদের চাই স্বাস্থ্যকর প্রাতরাশ। কারণ প্রাতরাশ বা সকালের খাবার খুব গুরুত্বপূর্ণ ।
তাই সকালের খাবারে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। প্রাতরাশে যদি এমন সব খাবার থাকে যেগুলো খেলে রক্তের সুগার বেশি বাড়ে না তাহলে পুরো সকাল রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে। স্বাস্থ্যসম্মত প্রাতরাশ অনেক কমিয়ে আনে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। বিশ্বজুড়ে হাইক্যালরি ও অপুষ্টিকর খাবার (ফাস্টফুড) গ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস।
ডায়াবেটিস রোগীর নিয়ম ৪ ঘণ্টা পর পর ৬ বার খাওয়া (টাইপ ২ ওবেস রোগী হলে নাস্তা কিছু কম হতে পারে) সেখানে সারা রাত খালি পেটে থাকার পর কোনো অবস্থাতেই সকালের নাস্তা বাদ দেওয়া যাবে না এবং তা হতে হবে অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত।
যেসব খাবার টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায় যেমন শাকসবজি, তাজা ফল, মোটা শস্যদানা এবং অসম্পৃক্ত চর্বি-এগুলো খাওয়া উচিত। এতে কমবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি এবং পরিহার করা যাবে ডায়াবেটিসের জটিলতা ।
স্বাস্থ্যকর খাবারঃ
-ফলের রস, কোমল পানীয়র বদলে ফল, পানি, চিনি ছাড়া চা ও কফি ।
-প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি।
-নাস্তার জন্য বাদাম, এক টুকরো ফল এবং চিনি ছাড়া দই (টক দই) ।
-প্রক্রিয়াজাত মাংস, চর্বি বহুল মাংস, লাল মাংস-এগুলোর বদলে কচি মোরগ, মাছ, সামুদ্রিক খাবার ।
-ময়দার রুটির বদলে লাল আটার রুটি, ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত।
-রুটির ওপর জ্যাম-জেলি বা চকলেট ব্রেডের বদলে পিনাট বাটার।
স্যাচুরেটেড ফ্যাট যেমন ঘি, মাখন, ডালডা, প্রাণিজ চর্বি, নারকেলের তেলের বদলে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট যেমন সূর্যমুখী তেল, কর্নতেল, জলপাই তেল, রাইসান তেল, ক্যানোলা তেল।
শিশু- কিশোরদের মধ্যেও আজকাল টাইপ -২ ডায়াবেটিস দেখা যাচ্ছে। মেদবহুল শিশু-কিশোর- তরুনরাই এতে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। তাই শিশুরা যাতে উচ্চ ক্যালরি বহুল খাবার খেয়ে মোটা না হয়ে যায় বা শ্রমবিমুখ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
আপনার বয়স যদি ৪০ এর বেশি হয় অথবা এক বা একাধিক ঝুঁকির মধ্যে থাকেন যেমন– বংশে ডায়াবেটিস, ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, অতিমাত্রায় ফাস্টফুড গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের কাজ না করা, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের চর্বি বেশি, তাহলে আজকেই ডায়াবেটিস পরীক্ষা করান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীরব ঘাতকরূপী এই রোগের কারণে হৃদরোগ, কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। এছাড়া ডায়াবেটিস ক্ষেত্রবিশেষে অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ধূমপান ও ফাস্টফুড খাওয়ার প্রবণতা অবশ্যই পরিহার করা উচিত। ফাস্টফুডে অনিয়ন্ত্রিত পরিমাণে ক্যালরি থাকে। বিশেষত অল্পবয়সী শিশু-কিশোর ও যুবকরা ফাস্টফুডে অভ্যস্ত বেশি। ফলে তাদের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি। শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া ও ধূমপানের কারণে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়।
এ দুটি স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ন্ত্রণ না করলে হার্ট ও কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যু ডেকে আনে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। প্রি-ডায়াবেটিক অবস্থায় আছেন কয়েক কোটি মানুষ।
শিশুদের মধ্যে কেউ কেউ জন্মগত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। জীবনাচরণ নিয়ন্ত্রণে না রাখায় প্রতি বছর অনেকে নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। একবার এ রোগ হয়ে গেলে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
বাডাস বলছে, সচেতনতা সৃষ্টিই এক্ষেত্রে মুখ্য। সমিতির অধিভুক্ত হয়ে দেশের সবকটি জেলায় সচেতনতা সৃষ্টি ও আক্রান্তদের চিকিৎসায় কাজ করছে স্থানীয় উদ্যোগে পরিচালিত ডায়াবেটিক সমিতি।
এমকে





