দীর্ঘ আট বছর পার হয়ে গেলেও ২৮ অক্টোবরের দোষীদের শাস্তি হয়নি আজও। ২০০৬ সালের এই দিনে রাজধানীর পল্টনে জামায়াতের সমাবেশে লগি-বৈঠা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে ৬ জনকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। আহত হয় কয়েকশ সাধারণ মানুষ। সেদিনের সেই খুনীদের চিহ্নিত করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়নি। এ নিয়ে আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর তৎপরতাও দেখা যায়নি। উল্টো ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি নির্বাহী আদেশবলে প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার।
২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রেডিও-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তার ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই দেশব্যাপী শুরু হয় তাণ্ডব। বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াতের অফিসসহ নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালায় দুর্বৃত্তরা।
পরদিন চারদলীয় জোট সরকারের ৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমাবেশের আয়োজন করা হয়। জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সেদিন সকাল থেকেই সভার মঞ্চ তৈরির কাজ চলছিল। হঠাৎ করেই বেলা ১১টার দিকে লগি-বৈঠা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে জামায়াতের সমাবেশস্থলে হামলা চালায় এক দল সন্ত্রাসীরা। পল্টনজুড়ে চলতে থাকে সেই তাণ্ডব। হামলায় বাধা দিতে গিয়ে লগি-বৈঠা আর অস্ত্রধারীদের হাতে একের পর এক আহত হতে থাকেন নিরস্ত্র জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের মেধাবী ছাত্র মুজাহিদুল ইসলামকে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর সন্ত্রাসীরা তার লাশের ওপর উঠে উল্লাস প্রকাশ করে। এ সময় তারা কয়েকজন জামায়াত ও শিবির নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, সেদিন ঘটনার সময় কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেও পুলিশ কোনো ভূমিকা পালন করেনি। পুলিশের সামনেই জামায়াত কর্মী মোশাররফকে রক্তাক্ত অবস্থায় মারতে থাকলেও পুলিশ বাঁশিতে একটি বারের জন্য হুইসেলও দেয়নি।
বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে জামায়াতের সমাবেশ শুরু হয়। মাওলানা নিজামীর বক্তব্য শুরু হওয়ার পর নির্মাণাধীন র্যাংগস টাওয়ারের ছাদ থেকে সমাবেশ লক্ষ্য করে ১০-১২টি বোমা নিক্ষেপ করা হয়। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে দফায় দফায় গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা।
সেদিন তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি পথচারী, এমনকি ছোট্ট শিশুরাও। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে তাদের তাণ্ডব। শুধু ঢাকাতেই নয়, লগি-বৈঠাধারী সন্ত্রাসীরা সেদিন সারাদেশে চালিয়েছে এই নারকীয় তাণ্ডব। ওইদিন লগি-বৈঠা বাহিনীর তাণ্ডবে ঢাকাসহ সারাদেশে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের।
২৮ অক্টোবরের তাণ্ডবে নিহত হয়েছিল স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্র মুজাহিদুল ইসলাম, হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপন, জসিম উদ্দিন, হাবিবুর রহমান হাবিব, জসিম, আবদুল্লাহ আল ফয়সাল। তাদেরকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছিল জামায়াত। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাইফুল্লাহ মুহাম্মদ মাসুম।
একই দিন গাজীপুরে মারা যান রুহুল আমিন, নীলফামারীতে মারা যান সাবের হোসেন, মাগুরায় আরাফাত হোসেন সবুজ, মেহেরপুরে আব্বাস আলী ও সাতক্ষীরায় জাবিদ আলী। হামলার ৮ বছর পার হলেও এখনও শোকের সাগরে ভাসছে নিহতদের পরিবার।
সেদিনের ঘটনায় নিহতদের পরিবার ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ৩টি মামলা দায়ের করা হয়। যুবমৈত্রীর পক্ষ থেকে জামায়াত নেতাদের আসামি করে আরও একটি মামলা করা হয়। যুবমৈত্রীর মামলায় ১০ জামায়াত নেতাকে অভিযুক্ত করে ১১ এপ্রিল চার্জশিট দেয়া হয়। জামায়াতের দায়ের করা মামলাটি পল্টন থানা ও পুলিশ তদন্ত করে ৪৬ জনকে অভিযুক্ত করে ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল আদালতে চার্জশিট দেয়। চার্জশিট দাখিল করেন ডিবি’র সাব-ইন্সপেক্টর এনামুল হক।
চার্জশিট দাখিলের পর একই বছর ২২ এপ্রিল তা গ্রহণ করেন মহানগর হাকিম মীর আলী রেজা। তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ২০০৭ সালের ২৩ এপ্রিল এক আদেশে মামলার অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন। সারাদেশে লগি-বৈঠা নিয়ে মহাজোট নেতাকর্মীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেয়ায় এ মামলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চার্জশিটে হুকুমের আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।
২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তাদের দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভাকাঙ্খীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আবু সাঈদ জনস্বার্থে পল্টন থানায় দায়ের করা হত্যা মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসককে একটি পত্র দেয়।
পল্টন থানায় দায়েরকৃত ৬১ নম্বর মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো: আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সরকারের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৭ আগস্ট আদালত বাদীপক্ষ ও নিহতদের পরিবারের বক্তব্য গ্রহণ ছাড়াই একতরফ মামলাটি বাতিল করে দেন।
অপর দিকে কামরুল আহসানের দায়েরকৃত মামলায় জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ২০০৯ সালের ৫ মে এই মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করা হয়। কিন্তু মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়নি। উচ্চ আদালতে মামলাটি কোয়াশমেন্টের আবেদন করা হলে মামলাটি স্থগিত করে রাখা হয়।
অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকার মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তিনি বলেন, এই মামলাটি হলো ইতিহাসের জঘন্যতম পরিকল্পিত নৃশংস হত্যা মামলা। এই মামলার বিচার এক দিন হবেই।
মামলা প্রত্যাহারের প্রতিক্রিয়ায় জসিম উদ্দিনের পিতা আবদুর রশীদ বলেছিলেন, "তারা এখন ক্ষমতায়, এখন যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। দেশে কোনো আইন আছে বলে মনে হয় না। কারো জবাবদিহিতাও নেই। বিচার পাওয়ার অধিকার এভাবেই কেড়ে নেয়া হলো? তদন্ত না করেই এভাবে মামলাই বাতিল করে দেয়া হলো?"
তিনি আরো বলেন, "এর নিন্দা জানানোর ভাষাও আমাদের জানা নেই। এটা দেশের জনগণ মেনে নিবে না। ২৮ অক্টোবর কী হয়েছে শুধু দেশের মানুষই নয়, সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছে। সেদিন দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে রাজপথে সাপের মতো পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। এর বিচার হওয়া তো দূরে থাক, এখন পুরো মামলাই প্রত্যাহার করে নেয়া হলো। অবাক কাণ্ড!
মাসুমের মা শামসুন্নাহার রুবী বলেন, "সেদিন দিবালোকে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। সেদিনের ভিডিও চিত্র দেখলেই তা বুঝা যাবে। সে দিনের হত্যা মামলা প্রত্যাহার হয় কী করে? আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়। তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলে এখন নিজেরাই আইন ভঙ্গ করছে। দিন বদলের কথা বলে, নিজেদের কথাই বদল করে ফেলেছে।"
শহীদ ফয়সলের মা মামলা প্রত্যাহারের খবর শুনে বলেছিলেন, "আমি গরীব ও দুর্বল। ফয়সলের বাবা নেই। আইন আদালত করার শক্তি নেই। অপরাধীরা শক্তিশালী। দুনিয়ার আদালত তাদের রেহাই দিলেও আল্লাহর আদালতে অবশ্যই ওরা শাস্তি পাবে।"
এআর/ জেডআই





