আজ পয়লা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। বাংলা ঋতুচক্রে বসন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঋতু। শীতকাল পেরিয়ে আসে বসন্ত। এ সময় ফুল ফোটে, পাখি গায়, কোকিল ডাকে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনে বাংলা আর বাঙালির অন্তরে বয়ে যায় আনন্দ বাতাস, হৃদয় নেচে ওঠে। বাংলা সাহিত্যে, গানে-সুরে বসন্ত আসন করেছে নিজের মতো করে।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন- ‘আসে বসন্ত ফুল বনে সাজে বনভূমি সুন্দরী, চরণে পায়েলা রুমঝুম মধুপ উঠিছে গুঞ্জরি (আহা)।’
ফাল্গুন এল, আজ বাসন্তী রঙের ছটায় খানিক হলেও সাজবে এই বাংলা। তার আভায় এই রূপসী বাংলাদেশ আরো সুন্দর রূপ ধারণের কথা ভাববে। কিন্তু উদ্বেগ সৃষ্টি হয় তখনই যখন দেখা যায় বন উজাড় হচ্ছে, গাছপালা কমে যাচ্ছে।
নগরায়ণের কারণে, পরিবেশ অনুকূল না হওয়ার কারণে পাখিদের থাকার জায়গা কমে যাচ্ছে। ফলে কমে যাচ্ছে পাখির সংখ্যা।
এ দেশে অনেক প্রজাতির পাখি আজ বিপন্ন। গানের পাখি কোকিলের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ঋতুতে, প্রকৃতিতে।
বসন্তেই আছে মধুমাস। সে তো চৈত্র। কিন্তু বনজ গাছ ক্রমাগত উজাড় হতে থাকায় প্রকৃতিতে ভারসাম্যের ঘাটতির আশঙ্কা বেড়েই চলেছে। এই ঘাটতি মেটাতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে সামাজিক বনায়নে।
গ্রামের মানুষ গাছ লাগান, কিন্তু সে ক্ষেত্রে চিন্তা থাকে অর্থকরী বৃক্ষের এবং তারা নিজেদের বাড়ির আঙিনায় বা জমিতে কিংবা পথের ধারে অর্থকরী গাছই লাগান। লজ্জাবতী, ধুতুরা, দণ্ডকলস, চুতরা, ভাদুল্লা, শুটি- এসব বুনো গাছ লাগান না।
সামাজিক দৃষ্টিতে বা যেকোনো বিবেচনায় এগুলো লাগানোর মতো গাছও নয়। এ কারণে ফুলে ফুলে এ প্রকৃতি অপরূপ রূপ ধারণে বাধাগ্রস্ত হয়। মধু আহরণে গিয়ে সংকটে পড়ে মৌমাছি। এ কারণে মৌমাছির সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।
খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, গ্রামাঞ্চলে মৌমাছির চাক বাঁধার পরিমাণ কমে গেছে। যে মধু এখন আমরা পাই তার বেশির ভাগই চাষের মধু। অর্থাৎ বিশেষ ব্যবস্থায় মৌমাছি পালন করে মধু সংগ্রহ করা হয়।
গাছ কমে যাচ্ছে, ফুল কমে যাচ্ছে, মৌমাছি কমে যাচ্ছে, পাখি কমে যাচ্ছে- এভাবে চলতে থাকলে আমাদের বসন্ত ঋতু, এর দুটি মাস ফাল্গুন ও চৈত্র তার জৌলুশ হারিয়ে ফেলবে। আর আমরা বঞ্চিত হব প্রকৃতির উদারতা থেকে।
বছরের শেষ ঋতু বসন্ত। এই সময়ে যে আবহাওয়া বিরাজ করে তার সঙ্গে বাঙালির সখ্য চিরন্তন। এই আবহাওয়ায় মন প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। মাঠে কাজ করার সময় কৃষকেরা গান ধরেন। দখিনা বাতাসে সেই সুরের ঢেউ ওঠে, ছড়িয়ে যায় বহুদূর।
মন প্রফুল্ল থাকায় কৃষকের কাজে থাকে ছন্দ। আর এর মধ্য দিয়ে খেতের ফসল পায় বাড়তি পরিচর্যা, ফলন আসে ভালো। এ রকম নানা উপায়েই বসন্ত বাংলাদেশের জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে যায়, তা কল্যাণকর।
জলবায়ুর পরিবর্তনে বিশ্বের উষ্ণতা বেড়ে চলেছে। এর প্রভাবে বেশ বড় ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে আমাদের দেশ। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ হারাচ্ছে। ঋতু বৈচিত্র্যেও এর প্রভাব লক্ষণীয়।
তারপরও বসন্ত তার আপন জৌলুশ নিয়েই বিরাজ করবে আমাদের মাঝে- এই আশায় আমরা বুক বেঁধে থাকি। প্রকৃতিবিদরা বলেন, বসন্ত হচ্ছে সেরা ঋতু। এ সময়ে যে আবহাওয়া বিরাজ করে তা মানুষকে সৃজনশীল হতে সাহায্য করে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘নবীন জীবন ফোটাতে, মধুর বসন্ত এসেছে…।’
বসন্তু ঋতু আমাদের সবার মাঝে সৃজনশীলতার বীজ বুনে দিক। সবার মন উচ্ছ্ল ও চঞ্চল হয়ে উঠুক। সেই উচ্ছলতা আর চঞ্চলতায় বাংলাদেশ নতুনের সমারোহে ভরে উঠুক। প্রতিটি হৃদয়ে উপলব্ধি হোক, আমাদের প্রকৃতির যে ঐতিহ্য তা আমাদেরই রক্ষা করতে হবে।
এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আমাদেরই নিতে হবে। বসন্ত বাতাসে ফুলের সুবাস নিয়ে দেশের মানুষ এগিয়ে চলুক সমৃদ্ধির দিকে- এটাই প্রত্যাশা। টাইমনিউজবিডি পরিবারের পক্ষ থেকে এর পাঠক, শুভানুধ্যায়ীসহ সকলকে পয়লা ফাল্গুনের শুভেচ্ছা।
এসএইচ





