ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে ক্রমশই উত্তরাঞ্চল পানি শূন্য হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে খরা মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দেয় পানি সংকট। যত দিন গড়াচ্ছে এ সংকট আরো প্রকট হয়ে উঠছে। পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য দীর্ঘ সাড়ে ৩ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো সুষ্ঠু সমাধান হয়নি।
গঙ্গার পানির চুক্তি সম্পাদন হলেও তার কার্যকারিতাও খুব কম। বরং গেল ৪৫ বছরের মধ্যে এবার পদ্মা নদীর পানির লেভেল সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
অথচ ফারাক্কার কারণে এ অঞ্চলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে সে ব্যাপারে প্রতিবাদের ঝড় উঠে সেই ১৯৭৬ সালের ১৬ মে। এর পর প্রতি বছর এ অঞ্চলে ১৬ মে ফারাক্কা দিবস হিসেবে পালন হয়ে আসছে। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে গঙ্গার পানির নায্য হিস্যা পাবার দাবি জানাচ্ছেন এ অঞ্চলের মানুষ।
১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে সারাদেশের লাখ লাখ মানুষ রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে মরণ বাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চে অংশগ্রহণ করেন।
দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জনদুর্ভোগের জন্য তারা ওইদিন লংমার্চ করে ভারত সরকারের কাছে প্রতিবাদ জানায়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন মওলানা ভাসানী। তাই এ দিনটি আজও শোষণ, বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং দাবি আদায়ের পক্ষে বঞ্চিতদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
প্রসঙ্গত, ভারতের একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের উদ্দেশ্যে ১৯৬১ সালের ৩০ জানুয়ারি ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। আর ১৯৭০ সালে শেষ হয় বাঁধটির নির্মাণকাজ। তখন পরীক্ষামূলকভাবে ভারত কিছু কিছু পানি ছাড়ে। আর ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ফারাক্কা বাঁধের সবকটি গেট খুলে দেয় দেশটি, সেবারই মূলত চাহিদা অনুযায়ী পানি পেয়েছিল বাংলাদেশ, তারপর ১৯৭৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত চাহিদানুযায়ী পানির নায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেছে বাংলাদেশ।
অথচ ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে, শীতকালের শুষ্ক মৌসুমেও পদ্মা নদী থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানি পেত বাংলাদেশ।
ফারাক্কার অভিশাপে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৯ ফুট উঁচুতে অবস্থিত রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়তই নিচে নামছে। এতে অগভীর কোন নলকূপ থেকে বর্তমানে কোন পানি উঠছে না।
সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতিবছর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর স্থানভেদে ১-২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। এর মধ্যে ২০১০ সালে বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে খ্যাত গোদাগাড়ী এলাকায় পানির স্তর ছিল মাটির ১৯ ফুট গভীরে। ২০১১ সালে স্থানভেদে ১৯-২১ ফুট। ২০১২ সালে ২০-২৩ ফুট এবং ২০১৩ সালে পানির স্তর ছিল স্থানভেদে ২৩-২৫ ফুট মাটির গভীরে।
চুক্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি প্রদান করবে। শুষ্ক মৌসুমের এ সময়ে ভারত বাংলাদেশকে চুক্তি অনুযায়ী পানি প্রদান করলে পদ্মায় অন্তত পানি প্রবাহ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন।
গত নভেম্বরের প্রথম থেকেই পদ্মায় পানির প্রবাহ একেবারেই কমে গেছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পদ্মায় সর্বোচ্চ পানির পরিমাণ রেকর্ড করা হয় ২৪ দশমিক ১৪ মিটার। গত কয়েক বছর থেকে পদ্মায় পানির পরিমাণ ১৩-১৪ মিটারে উঠা-নামা করে। তবে এক দশক পর গত ৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপরে ১৮ দশমিক ৬২ মিটারে। পরদিন সকালে পদ্মার পানি ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার নিচে এসে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৪৬ মিটারে।
একাধিক সূত্রের দাবি, প্রথমদিকে উত্তরাঞ্চলের মানুষ ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব বুঝতে না পারলেও ক্রমশই তা ফুটে উঠতে থাকে। পানির স্তর নেমে যাওয়া, খাল-বিল, নদী-নালা, ছোট্ট-বড় পুকুর, দিঘি শুকিয়ে যাবার কারণে এখন এ অঞ্চলে ক্রমশই পানি শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলে জলাশয়ের মধ্যে বিল রয়েছে ৩৩ হাজার ৬৪৯ হেক্টর, পুকুর ৮৪ হাজার ৪৩১ হেক্টর ও প্লাবনভূমি ৬ লাখ ১০ হাজার ২৭ হেক্টর। ভারতের সাথে গঙ্গাচুক্তি থাকলেও ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় এ অঞ্চলের জলাশয়গুলো শুকিয়ে গেছে।
পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, মহানন্দাসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত অন্যান্য অধিকাংশ নদীর অস্তিত্ব এখন বিপন্ন। নদী ও অন্যান্য জলাশয়ের তলদেশ শুষ্ক মৌসুমে পানি শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে মানুষকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে হয়। জমিতে সেচ দেওয়া থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। এলাকাভেদে গত ১৫ বছরে ৩০ থেকে ৪০ ফুট নিচে পানি স্তর নেমে গেছে।
এদিকে ফারাক্কা বাঁধের দীর্ঘদিনের কুফল হিসেবে এ বছর পদ্মায় পানির লেভেল সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা জানান, উজানে গঙ্গা থেকে অব্যাহতভাবে পানি বিকল্প পথে টেনে নিয়ে যাওয়া, অনাবৃষ্টি, জলবায়ুর পরিবর্তন, আর্দ্রতা কম, নদীর বুকে বালিময়তা, চ্যানেল পরিবর্তন অর্থাৎ নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ফারাক্কা বাঁধই দায়ী।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১০ মে রাজশাহীর রামপুর-বোয়ালিয়া টি-বাঁধের কাছে পদ্মায় পানির লেভেল ছিল ৬ দশমিক ৮৭ মিটার। গত ১২ মে দুপুরের পর বৃষ্টি হওয়ায় ৩ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে পানির লেভেল ৬ দশমিক ৯০ মিটার হয়। এর আগে পদ্মায় সর্বনিম্ন পানির লেভেল ছিল ২০০৬ সালের ১৮ এপ্রিল (৭ দশমিক ৭২ মিটার)। ১৯৮৩ সালের ৬ এপ্রিল পানির সর্বনিম্ন লেভেল ছিল ৭ দশমিক ৭৪ মিটার। অর্থাৎ ৪৫ বছরে পানির লেবেল সর্বনিম্ন ১৯৮৩ ও ২০০৬ সালের চেয়ে এবার আরো ৮৫ সেন্টিমিটার কমেছে।
ওএফ





