গত সোমবার থেকে গাজায় সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানবতার শত্রু ইসরাইল। টানা এক সপ্তাহের শকুনি আক্রমণে আজ সোমবার (১৪ জুলাই, ২০১৪) পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭২ জন ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার; হামলা চালানো হয়েছে এক হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে।
ইসরাইল, ফিলিস্তিন ও ইহুদি জাতি নিয়ে একটি চমৎকার নিবন্ধ লিখেছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক। তাঁর লেখাটি চারটি অংশে বিভক্ত করে টাইমনিউজের পাঠকদের জন্যে অনুলিখন করে প্রকাশ করা হলো। আজকে পড়ুন এর প্রথম অংশ-
ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী ভূখন্ড ফিলিস্তিন বা প্যালেস্টাইন মুসলিম, খৃষ্টান ও ইহুদী তথা সকল ধর্মাবলম্বীর নিকট একটি পবিত্র ভূমি। সুদীর্ঘ ইতিহাস বিজড়িত ফিলিস্তিন মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঞ্চল। অথচ জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়াবেষ্টিত এ ভূখন্ডের প্রতিটি বালুকণার সাথে মিশে আছে ছোপ ছোপ রক্ত। ক্রসেড যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই ছোট্ট অঞ্চলটি আজ ইসরাঈল নামক এক আস্ত হায়েনার করতলগত।
গত ৬০ বছর থেকে ফিলিস্তিনিদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলছে আমেরিকার অনৈতিক সমর্থনপুষ্ট ইসরাঈল। অন্যদিকে সারা বিশ্বের মোড়লরা কেউবা এ অন্যায়ের সহযোগিতা করছে, কেউবা কাপুরুষের ন্যায় চোখ বুজে সহ্য করছে রক্তের এই হোলি খেলা। এই গণহত্যা সারা বিশ্বের মানুষকে আরো একবার ইসরাঈল সম্পর্কে ভাবাতে শুরু করে। চলুন আরেকবার জেনে নেয়া যাক ইসরাইল ও ইহুদিদের সম্পর্কে।
ইহুদী জাতির পরিচয়:
ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রসঙ্গে আলোচনার শুরুতেই ইহুদীদের সম্পর্কে বলা প্রয়োজন। কেননা ইহুদী রাষ্ট্র হিসাবেই ইসরাঈলের জন্ম। ইহুদীদের প্রধান নবী হলেন মূসা (আঃ), যার কিতাব হলো তাওরাত। ইহুদীরা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, যার নাম তাদের কাছে জেহোভা। এখান থেকেই ইহুদী নামের উৎপত্তি। কারো মতে, ইহুদীদের অপর নাম বনী ইসরাঈল।
ইসরাঈল মূলত ইয়াকুব (আঃ)-এর অপর নাম। তাঁর মোট ১২ জন সন্তান ছিল। ১২ ভাইয়ের বড় ইয়াহুদার নামানুসারেই বনী ইসরাঈলকে ‘ইহুদী’ বলা হয়। বনু ইসরাঈলরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেলে আল্লাহ তাদের হেদায়াতের জন্য মূসা (আঃ)-কে তাওরাতসহ প্রেরণ করেন।
বনী ইসরাঈলের উপর আল্লাহর ছিল অগণিত নিয়ামত, অফুরন্ত অনুগ্রহ। পবিত্র কুরআনে প্রায় ৪৩টি স্থানে বনী ইসরাঈলের আলোচনা রয়েছে। তন্মধ্যে প্রায় ১৬টি স্থানে বনী ইসরাঈলের উপর আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতরাজির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর যখন আমি সমুদ্রকে পৃথক করে দিলাম অতঃপর তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং ফেরাঊনকে ডুবিয়ে দিলাম’ (বাক্বারাহ ৫০)। তাদেরকে প্রদত্ত আরো নেয়ামতসমূহ যেমন- রাজাধিপতির মর্যাদা প্রদান (মায়েদাহ ৬০), রিযিক প্রদান (জাছিয়া ১৬), তীহ প্রান্তরে ছায়া ও খাবারের ব্যবস্থা (বাক্বারাহ ৫৭), পানির ব্যবস্থা (বাক্বারাহ ৬০)।
এ ছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর আরো অনেক অনুগ্রহ করেছেন। যেমন- গো-বৎসের পূজা করার পরও আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন (বাক্বারাহ ৫১-৫২)। বজ্রপাতে মৃত্যু ঘটানোর পর তাদেরকে আবার পুনর্জীবন দান করেন (বাক্বারাহ ৫৫)। এ রকম আরো অভাবনীয়, আশাতীত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেয়ামতরাজি দিয়ে আল্লাহ ইহুদীদের মান-মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি, শান-শওকত বৃদ্ধি করেছেন।
এরপরও কুটিল ইহুদীরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করে একের পর এক নাফরমানী করে চলেছিল। গোবৎসের পূজা, যুদ্ধ করতে অস্বীকার, আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখতে চাওয়ার মত ধৃষ্টতা, মান্না ও সালওয়ার উপর আপত্তি, নবীদেরকে হত্যা, শনিবারের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা লংঘন (বাকারা ৫১-৫২; মায়েদা ২৪; ঐ ৬১; নিসা ১৫৭; বাকারা ৬৫-৬৬) ইত্যাদি বহু ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর নাফরমানী করে। ফলে আল্লাহ তাদের উপর নানাবিধ গযব নাযিল করেন। যেমন- লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা (বাক্বারাহ ৬১, আলে ইমরান ১১২)। এ ছাড়াও ক্ষণিক গযবসমূহ ছিল-
(ক) তীহ প্রান্তরে ৪০ দিন উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ানো (মায়েদা ২৪)।
(খ) বজ্রপাতে ধ্বংস হওয়া (বাক্বারাহ ৫৫)।
(গ) গো-বৎস পূজার জন্য পরস্পরকে হত্যার মাধ্যমে নিষ্ঠুর শাস্তি প্রাপ্ত হওয়া (বাক্বারাহ ৫৪)।
(ঘ) মাথার উপর তূর পাহাড়কে ঝুলিয়ে দেয়া (আ‘রাফ ১৭১)।
(ঙ) বৈধ ও পূত-পবিত্র বস্ত্ত হারাম হয়ে যাওয়া (নিসা ১৬০-১৬১)।
(চ) নিকৃষ্ট বানর ও শুকরে পরিণত হওয়া (বাক্বারাহ ৬৫-৬৬) প্রভৃতি।
মূলত ইহুদীরা হচ্ছে একটি প্রতারক, ধুরন্ধর, বিশ্বাসঘাতক নিষ্ঠুর জাতি। তাই লাঞ্ছনা ও অপমান এদের চিরসঙ্গী। এদের উপর আল্লাহর সবচেয়ে বড় গযব হচ্ছে মুসলমান বা অন্য কোন জাতির ন্যায় তারা কোন স্থানে একত্রিত জীবন যাপন করতে পারবে না। এজন্য ইতিহাসের পাতায় তাদেরকে সবসময় দুরাচারী, অপমানিত, বহিষ্কৃত অবস্থাতেই দেখা যায়। এইতো গত শতাব্দীতেই তারা মুসলিম খিলাফত আমলে আরব থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আশ্রয় নেয়। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার কর্তৃক নিষ্ঠুরভাবে আক্রান্ত ও বিতাড়িত হয়।
ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক পরিচয়:
Palestine-এর আরবী নাম فلسطين যার অর্থ সুন্দর কিছু। এর আরেকটি অর্থ আল্লাহর ভূমির রক্ষক (ইসলামী বিশ্বকোষ ১৫তম খন্ড, পৃঃ ১৫৩)। মূলত শব্দটি গ্রীক। যার অর্থ- ফিলিসিয়াবাসীদের ভূখন্ড। অর্থাৎ যারা আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ১২০০ শতকের দিকে কেনান তথা জর্ডান নদীর বেলাভূমির দক্ষিণ তীরাঞ্চল দখল করেছিল। এরা ছিল প্রাচীন জুডা রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ফিলিসিয়ার অধিবাসী।
এশিয়ার পশ্চিম প্রান্তসীমা ও ভূমধ্যসাগরের পূর্ব সীমানা বরাবর ফিলিস্তীন রাষ্ট্রটি অবস্থিত। এর উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণে ইসরাঈলের অস্তিত্ব থাকলেও মূলত উত্তরে লেবানন এবং সিরিয়া, দক্ষিণে সুয়েজ উপসাগর ও মিশরীয় সিনাই উপদ্বীপ, পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর ও পূর্বে জর্ডান অবস্থিত। এর মোট আয়তন ৬৩৩৫ বর্গকিলোমিটার। ১৯৪৮ সালে এই পরিমাণ ছিল ২৬,৩২৩ বর্গকিলোমিটার। মোট জনসংখ্যা ৪০ লাখ। ১৯৪৮ সালে ছিল ১ কোটি। তন্মধ্যে পশ্চিমতীরে বাস করে ২৫ লাখ, গাজায় ১৫ লাখ, ইসরাঈলে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ১১ লাখ, জর্ডানে ২৮ লাখ, অন্যান্য আরব দেশে ১৭ লাখ এবং সারা পৃথিবীতে ১ লাখ। প্রায় ১ কোটি মানুষের একটি জাতিগোষ্ঠী এমনইভাবে আজ স্বদেশ থেকে বিতাড়িত, ভাগ্যবিড়ম্বিত। তাদেরকে পাশবিক শক্তি প্রতারণার মাধ্যমে এ অবস্থায় নিক্ষেপ করেছে।
গাজা: আয়তন ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার। দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার। প্রস্থ ১২ কিলোমিটার। প্রাচীরবেষ্টিত একটি কারাগারের মতো। ইসরাঈলের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় ভূমধ্যসাগর ঘেঁষে এক চিলতে জায়গা গাজা।
পশ্চিম তীর: দুই হাজার ৩৯০ বর্গ কিলোমিটার। এখানকার অনেকেই উচ্চ মধ্যবিত্ত ও বিদেশে কর্মরত। চলবে.........( মূল লেখক: আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক)
ঢাকা, ১৪ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) এমএ





