কেউ আসত আসামিদের দেখতে, কেউ আসত জামিনে আসামিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য । আসামিদের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করতো কেউ কেউ। ফলে আত্মীয়-স্বজনদের ভিড় জমতো কারা ফটকে। কারো দেখা হতো, কারো দেখা হতো না। অপরাধীরা কারাগারে প্রবেশের সময় কাঁদতেন, মুক্তির সময় হাসতেন। রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তিতে প্রতিদিনই ফুলের মালা বদল হতো। কারা ফটক থেকেই বের হতো আনন্দ মিছিল। ছিল কারারক্ষীদের নিরাপত্তা বলয়।
গত ২৯ জুলাই পর্যন্ত এমন দৃশ্য চোখে পড়তো পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে। দেশের সবচেয়ে পুরনো এ জেলখানার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক দুঃখ গাথা । অপরাধীরা তো বটেই বিভিন্ন সময়ের শাসক, বিদ্রোহী প্রজা কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহী ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিবিদ এমনকি এই তো কয়েক বছর হলো বিচার শুরু হওয়া স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদেরও অন্যতম সাক্ষী দেশের প্রথম এই জেলখানা।
১৭৮৮ সালে মাত্র একটি অপরাধ ওয়ার্ডের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের আমলে এই জেলখানার যাত্রা শুরু হয়। ২২৮ বছরের ইতিহাসে অনেক ঘটনা প্রবাহ আবর্তিত হয়েছে এখানে। ফাঁসি কার্যকর হয়েছে বহু অপরাধীর। শুধুমাত্র স্বাধীন বাংলায় ৪৩৩ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে দিয়ে এই জেলখানায় ফাঁসির সূচনা। যার শেষ হয় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে।
জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মনসুর আলী ও আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। যে সেলে তাদের হত্যা করা হয়েছিল, সেই সেলে তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে মৃত্যঞ্জয়ী শহীদ স্মৃতি জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে।
গত ২৯ জুলাই কারাগারের সকল আসামিকে কেরাণীগঞ্জের নতুন কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। এবং দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় এই কারাগার রূপান্তর করা হয় স্মৃতি জাদুঘরে।
গত ১ নভেম্বর উদ্বোধন শেষে ২ নভেম্বর থেকে একশ টাকা টিকিটের বিনিময়ে কারাগারটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
ঐতিহাসিক কারাগারটি এক নজর দেখার জন্য দর্শনার্থীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। এ সময় অনেককে ফাঁসির আসামিদের কনডেম সেলে ঢুকে কারারুদ্ধ অবস্থার অভিনয় করে সেলফিও তুলেন অনেকে। শুধু যে কৌতূহলী দর্শক এসেছেন তা নয়, দীর্ঘদিন সেখানে কারাভোগ করেছেন এমন অনেকেও কারাগারটি আবার দেখতে আশেন।





