মানুষের চাহিদার কোনো শেষ নেই। তবে সেই চাহিদা পূরণ করতে হবে জোগান অনুযায়ী। যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই ব্যয় করতে হবে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যম বা মাঝামাঝি পন্থা অবলম্বন করাই হলো মিতব্যয়িতা। কোনো কাজ ও কথায় সীমা অতিক্রম, বাড়াবাড়ি ও মাত্রাতিরিক্ত কিছু না করা হলো মিতাচার।
সঞ্চয়ী হওয়ার তাগিদ দিয়ে প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর সারা বিশ্বে একইসঙ্গে পালিত হয় বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস। বাংলাদেশেও সরকারিভাবে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তর এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে।
প্রতিটি মানুষই যেন মিতব্যয়ী হয় এবং সঞ্চয় করে সেই দিকে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য দিবসটি পালন করা হয়। দিবসটি প্রথমবার পালন করা হয়েছিল ১৯২৪ সালে।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের নাগরিকদের জন্য মিতব্যয়িতা অত্যাবশ্যক। এদেশে অপচয়ের অভ্যাস সাধারণভাবেই বেশি পরিলক্ষিত হয়। অপচয়কারীরা নিজের জন্য তো নয়ই, বরং সমাজ, পরিবার ও জাতির জন্যও কিছু করতে পারে না।
বাংলাদেশে জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তর সঞ্চয়ের জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প চালু করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- পাঁচবছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিনমাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, জামানত সঞ্চয়পত্র, তিনবছর মেয়াদী জাতীয় বিনিয়োগ বন্ড, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক ও প্রাইজবন্ডসহ প্রভৃতি কার্যক্রম।
তবে ১৯২৪ সালের আগে পৃথকভাবে বেশ কয়েকটি দেশ নিজ উদ্যোগেই জাতীয় পর্যায়ে দিবস পালন করতে শুরু করেছিল। যেমন স্পেনে দিনটি পালন করা শুরু হয়েছিল ১৯২১ সাল থেকে।
ইতালির মিলানোতে ওয়ার্ল্ড সোসাইটি অব সেভিংস ব্যাংক, তথা সঞ্চয়ী ব্যাংকগুলোর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকেই এটি উদযাপন শুরু হয়।
সম্মেলনের শেষ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মিতব্যয়িতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন ইতালীয় অধ্যাপক ফিলিপ্পো রাভিজ্জা। মিতব্যয়ী সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে দিবসটিতে বিশ্বজুড়ে সঞ্চয়ের প্রচারণার উদ্দেশ্যে পালিত হবে।
সঞ্চয় বাড়ানোর প্রচারণা হিসেবেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র ও নারী সমিতিগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্তও সেদিনই প্রথমবার নিয়েছিল সঞ্চয়ী ব্যাংকগুলো।
বিশ্ব জুড়ে সবগুলো দেশের প্রতিটি মানুষের মনে সঞ্চয় এবং অর্থনীতিতে ব্যক্তির সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বদ্ধমূল করতে চেয়েছিলেন ২৯টি দেশের প্রতিনিধি।
১৯২৩ সালে জার্মানির অর্থবাজার পুনর্গঠিত হলে অনেক জার্মান নিজেদের সঞ্চয় হারিয়েছিলেন। সঞ্চয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে সে সময় জার্মানিও দিনটি পালনের উদ্যোগ নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও দিনটি উদযাপন অব্যাহত ছিল। তবে এটি জনপ্রিয় হয় ১৯৫৫ থেকে ৭০ সালের মধ্যে। বিশেষ করে অস্ট্রিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে এটি আক্ষরিক অর্থেই ঐতিহ্যে পরিণত হয়ে ওঠে।
আজকের যুগে দিনটির মূল লক্ষ্য উন্নয়নশীল দেশগুলো, যেসব দেশের অসংখ্য মানুষের এখনো ব্যাংক হিসাব নেই। দরিদ্রদের সঞ্চয়ী ব্যাংক হিসাবের আওতাভুক্ত করার মাধ্যমে সঞ্চয়ী ব্যাংক হিসাব ব্যবহারকারীদের সংখ্যা দ্বিগুণ করাই বর্তমান সময়ে দিবসটির মূল লক্ষ্য।
এই লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলোর সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করাসহ নির্দিষ্ট প্রচারণা চালানো ও পদক্ষেপ গ্রহণ করছে উন্নয়নশীল দেশসমূহের সঞ্চয়ী ব্যাংকগুলো।
পৃথিবীতে প্রতি বছর ১৩০ কোটি টন খাবার নষ্ট হয় –জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রচারিত এক তথ্যে একথা জানা গেছে। অথচ বিশ্বের বহুসংখ্যক মানুষের এখনো নিয়মিত তিন বেলা খাবার জোটে না।
ধনী দেশগুলোর ভোক্তারা বছরে ২২ কোটি টন খাদ্য নষ্ট করছে, যা সাব-সাহারান আফ্রিকার এক বছরের প্রকৃত উৎপাদনের সমান। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ভোক্তাপ্রতি খাদ্য নষ্টের পরিমাণ বছরে ৯৫ কেজি থেকে ১১৫ কেজির মতো। এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় এর পরিমাণ ৬ থেকে ১১ কেজি।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬০ লাখ টন খাদ্য সচেতনতার অভাবে নষ্ট বা অপচয় হয়। এর মাত্র পাঁচ শতাংশ অপচয় কমানো গেলে প্রায় ২০ লাখ টন খাদ্যশস্য সাশ্রয় করা সম্ভব হবে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে জোরদার করবে। আর পুরো অপচয় কমানো গেলে কেবল ধানই অতিরিক্ত পাওয়া যাবে ১ কোটি টন। এই অপচয় থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
এছাড়া ইসলামে মিতব্যয়তা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে কারিমের সূরা মুমিনের ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারী ও মিথ্যাবাদীকে পথ প্রদর্শন করেন না।’
এ আয়াতের ব্যাখায় আলেমরা বলেছেন, ওই সব অপব্যয়কারীর ওপর ভর্ৎসনা যারা অপব্যয়ের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধনের পথ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। অপচয়কারীরা সৎ কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে কারণ অপচয়ের মাধ্যমে সে ক্রমান্বয়ে ভালো কাজ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এছাড়া, অপচয়কারীর দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না।
এছাড়া হাদিসে বলা হয়েছে, ‘হে আদম সন্তান, তুমি যদি তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ আল্লাহর অভাবী বান্দাদের দারিদ্র্য বিমোচনে ও দীন ইসলামের কাজে খরচ কর, তাহলে এটি তোমাদের জন্য উত্তম।’মিতব্যয়িতা মুমিনের সাফল্যের চাবিকাঠি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিতব্যয়িতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে ধনী বানিয়ে দেবেন, আর যে ব্যক্তি বাহুল্য খরচ করবে, আল্লাহ তাকে গরিব বানিয়ে দেবেন।’
মিতব্যয়িতা এমন একটি সৌন্দর্য, যা মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আমাদের সমাজে অভাব ও সংকটের একটি বড় কারণ মিতব্যয়ী না হওয়া। ইসলাম ও রাসুল (সা.)-এর আদর্শ হচ্ছে সবকিছুতে ব্যয়সঙ্কোচন। এই নীতি অবলন্বন করলে পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত কোথাও দারিদ্র্য থাকবে না। এ জন্য প্রত্যেক মুমিনের উচিত মিতব্যয়ে অভ্যস্ত হওয়া এবং অপচয় থেকে বেঁচে থাকা।
অপচয় ও অপব্যয়ের কারণে মানুষ ইহকাল ও পরকাল দুটোই হারায়। আমরা যদি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) সহ ইসলামের ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও মনীষীদের জীবন প্রণালী বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাব তাদের সবাই সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। তারা কখনোই ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়েননি। অর্থ-সম্পদ অপচয় ও অপব্যয় না করে মানুষকে বেশি বেশি দান করেছেন।
এজন্যই মিতব্যয়িতা সকল সামাজিক বিপর্যয় থেকে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। যে কোন মুল্যে অপচয় রোধ করে সকল মানব জাতিকে মিতব্যয়ি হওয়া জরুরি। আর এটাই হোক আজকের দিবসের প্রত্যাশা।
এআই





