রমজানের আবির্ভাব হয় রহমত,মাগফিরাত,নাজাত এই তিন দশক নিয়ে।এর মধ্যে নাজাতের দশকের মধ্যেই কদরের রাত্র নিহত রয়েছে।

বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল ক্বদর। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে লাইলাতুল ক্বদরের অপরিশীম ফজিলত ও অসাধারণ মাহাত্ম্যের বিবরণ রয়েছে। কিন্তু শবে ক্বদর কবে? হযরত মুহাম্মদ (স.) রমজানের শেষ দশকের বেজোড় পাঁচটি রাতে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করতে বলেছেন।

হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, নবী করীম (স.) ইরশাদ করেন যে, তোমরা রমজানের শেষ দশকে শবে কদর অনুসন্ধান কর (বুখারী : ১/২৭০)।

হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্নিত। তিনি রসূল (স.) কে শবে ক্বদর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে রসূল (স.) বললেন, শবে কদর রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর কোন একটি-একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ বা উনত্রিশতম রাত।

হযরত মুহাম্মদ (স.) লাইলাতুল ক্বদর পাওয়ার জন্যই রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন। ইবাদত-বন্দেগীতে অধিক মনোনিবেশ করতেন। কঠোর পরিশ্রম করতেন, যাতে এতেকাফ অবস্থায় ইবাদত বন্দেগীর মধ্যদিয়ে শবে ক্বদর অতিবাহিত হয়।অজান্তে অবহেলায় যেন শবে ক্বদরের অপরিসীম ফজিলত থেকে বঞ্চিত হতে না হয়।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, হযরত রসূল (স.) রমজানের শেষ দশকে এতো বেশি ইবাদত করতেন যা অন্য সময় করতেন না (মুসলিম শরীফ ১/৩৭০ তিরমিযী ১/১৬৪)। আরেকটি হাদিসে বর্নিত আছে রমজানের শেষ দশক এলে রসূল (স.) লুঙ্গি খুব শক্ত করে পরতেন। নিজেও রাত জেগে ইবাদত বন্দেগী করতেন।পরিবার পরিজনকেও জাগাতেন (বুখারী ১/২৭১)।

শবে ক্বদরের ফজিলত মাহাত্ম্য, গুরুত্ব ও তাত্পর্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, নিশ্চয় আমি এই কুরআন অবতীর্ন করেছি লাইলাতুল ক্বদরে। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে তুমি কী জানো? লাইলাতুল ক্বদর হচ্ছে হাজার মাস থেকেও উত্তম। এ রাতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতারাও রূহ স্বীয় পালনকর্তার নির্দেশে অবতীর্ন হন। শান্তিই শান্তি। যা ফজরোদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে (সুরা কদর)।

এ সূরা এবং বিভিন্ন হাদিস থেকে জানা যায়, লাইলাতুল কদরের ইবাদতের দ্বারা এক হাজার মাস (৮৩ বছর চার মাস) এর ইবাদতের সমপরিমান ছওয়াব পাওয়া যাবে।

সূরা দুখানে লাইলাতুল ক্বদরকে বরকতময় রাতও বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, নিশ্চয় আমি ইহা (পবিত্র কুরআন) অবতীর্ন করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরিকৃত হয়। আমার আদেশ-(দুখান :৩-৫)।

লাইলাতুল ক্বদর এতো ফজিলতপূর্ণ বলেই হযরত মুহাম্মদ (স.) রমজান আসার আগেই শাবানের শেষ দিন সাহাবাদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে এ রাতের ফজিলত বর্ণনা করে পূর্ব থেকেই এ রাতটির জন্য প্রস্তুত থাকতে উদ্বুদ্ধ করতেন।

অবহেলায় কেউ যেন এ রাতের ফজিলত থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্য সতর্ক করে দিয়েছেন। লাইলাতুল ক্বদর একমাত্র উম্মতে মুহাম্মদীর বৈশিষ্ট। পূর্বেকার কোন উম্মতকেই শবে ক্বদর দান করা হয়নি।

শবে কদরের ফজিলত সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেন, যে ঈমানসহ ছওয়াবের আশায় শবে ক্বদরের রাতে জেগে থেকে ইবাদত করবে তাঁর অতীতের সকল পাপ মার্জনা করা হবে। (বুখারী ১/২৭০)।

লাইলাতুল ক্বদরে বিশেষ কোন আমল নেই। হাদিসে এ রাতে জেগে থেকে ইবাদত করার জন্য বলা হয়েছে। সুতরাং এ রাতে নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ, তাহলীল,জিকির, তওবা, ইস্তেগফার দোয়া সবই করা যাবে। রাসূল (স.) বলেন, লাইলাতুল ক্বদরে হযরত জিবরাঈল (আ.) ফেরেশতাদের একটি দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন, এবং তাঁরা কি দাড়িয়ে, কি বসে যে যেভাবেই মহান আল্লাহর স্মরণ করে তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন।

লাইলাতুল ক্বদরে নফল নামাজ, স্বাভাবিক নিয়মেই পড়তে হবে। এর কোন স্বতন্ত্র নিয়ম নেই। বিশেষ কোন সূরা নির্দিষ্ট সংখ্যক পড়ার কোন ভিত্তি নেই। হযরত মুহাম্মদ (স.) লাইলাতুল ক্বদরে বিশেষ একটি দোয়া পড়তে বলেছেন, তা হচ্ছে- আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুব্বুন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাকআফু ফায়ফু আন্নি। অর্থ হচ্ছে- হে আল্লাহ: আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন।

আমাদের দেশে শুধু সাতাশ রমজান রাতে শবে কদরের উদ্দেশ্যে ইবাদত করার একটি রেওয়াজ চালু হয়ে গেছে। কিন্তু বিশুদ্ধ হাদিসগুলোর আলোকে এটি সঠিক নয়।

কারণ, সাতাশ রমজানের রাতেই শবে ক্বদর হওয়াটা তো নিশ্চিত নয়। সুতরাং শবে ক্বদর পেতে হলে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় পাঁচটি রাতেই ইবাদত বন্দেগী করতে হবে।

আরেকটি বিষয় সকলের লক্ষ্য রাখা জরুরি তা হচ্ছে লাইলাতুল কদরের ইবাদত নফল। আর সকল নফল ইবাদত ঘরে করাটাই উত্তম। সুতরাং লাইলাতুল ক্বদরের নফল নামাজ. তেলাওয়াত, জিকির ইত্যাদির জন্য মসজিদে ভিড় না করে প্রত্যেকে নিজ নিজ বাসা-বাড়িতে করাটাই উত্তম।

এআই