বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচীর আজ ছিল শেষ দিন।
১৯৭১ সালের ১৪ই মার্চ সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির মধ্যেই ঢাকায় দীর্ঘক্ষণ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক করেন পাকিস্তানের নেতা ওয়ালি খান। বৈঠকে অসহযোগ ও ৬-দফা নিয়ে উভয় নেতার আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে ওয়ালি খান জানান, ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এদিন কিছু নির্দেশনা জারি করে। পূর্ব পাকিস্তানে ছুটি ভোগকারী বাঙালি সৈন্যদের স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান নেতারা।
দেশ স্বাধীন হলে তারা সেনাবাহিনীতে নিয়োগ পাবেন বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। শিল্পী জয়নুল আবেদিন ’৭১ সালের এদিন ১৪ ই মার্চ পাকিস্তান সরকারের দেওয়া ‘হেলালে ইমতিয়াজ’খেতাব বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের প্রতিবাদে তিনি এ খেতাব বর্জন করলেন।
১৯৭১ সালের উত্তাল ১৪ই মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ধারক কবি-সাহিত্যিকরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হওয়া বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক একাত্মতা ঘোষণা করেন। হাসান হাফিজুর রহমানকে আহ্বায়ক করে এর আগেই গঠিত হয় ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’। সংগঠনের অন্য সদস্যরা হলেন সিকান্দার আবু জাফর, আহমদ শরীফ, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, বদরুদ্দীন উমর, রণেশ দাশগুপ্ত, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, রোকনুজ্জামান খান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সুফিয়া কামাল, জহির রায়হান, আবদুল গনি হাজারী প্রমুখ।
১৯৭১ সালের ১৪ই মার্চ বিকাল ৫টায় বাংলা একাডেমি চত্বরে এক সভায় এ কমিটি মিলিত হয়। সভার সভাপতি ছিলেন আহমদ শরীফ। এ সভায় বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে লেখকদের সংগ্রামী ভূমিকা সম্পর্কে উদ্দীপনামূলক বক্তব্য রাখেন রণেশ দাশগুপ্ত, আলাউদ্দিন আল আজাদ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসান হাফিজুর রহমান, রাবেয়া খাতুন ও আহমদ ছফাসহ অনেকে।
সভা শেষে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক একাত্মতা ঘোষণা করে লেখকদের একটি মিছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত যায়। এই সময়ে দেশের প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার শিল্পীরাও বসেছিলেন না। মার্চের প্রথম থেকেই বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র সব মাধ্যমের শিল্পীরাই বঙ্গবন্ধুর আহূত অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিজ-নিজ অবস্থান থেকে প্রতিদিন মিছিল, মিটিং ও শোভাযাত্রা করে আসছিলেন। এ সময় বিভিন্ন শিল্পী সংস্থা থেকে প্রতিনিধি নিয়ে আলী মনসুরকে সভাপতি, সৈয়দ আবদুল হাদীকে সম্পাদক ও লায়লা আর্জুমান্দ বানুকে কোষাধ্যক্ষ করে গঠিত হয় ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ’।
কমিটির সদস্যরা ছিলেন: মোস্তফা জামান আব্বাসী, জাহেদুর রহিম, ফেরদৌসী রহমান, বশির আহমেদ, খান আতাউর রহমান, বারীণ মজুমদার, আলতাফ মাহমুদ, গোলাম মোস্তফা, কামরুল হাসান, অজিত রায়, হাসান ইমাম, কামাল লোহানী, জিএ মান্নান, আবদুল আহাদ, সমর দাস, গওহর জামিল, রাজ্জাকসহ অনেকে।
১৪ই মার্চ সেই দিন যথারীতি বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাড়ি ছিল মানুষের স্রোতের মোহনা।
১৪ই মার্চ করাচীর নিশাত পার্কে আয়োজিত এক সমাবেশে ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ (পিপিপি)-এর চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের দুই অংশের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক সমঝোতার পূর্বে শেখ মুজিবের দাবি অনুযায়ী যদি ক্ষমতা অর্পণ করা হয়, তবে পাকিস্তানের দুই অংশের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। আওয়ামী লীগ ৬দফার মাধ্যমে স্বাধীনতাই দাবি করছে।’ এ সময় পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তার সঙ্গে সংলাপ শুরু করার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রতি আহবানও জানান ভুট্টো।
১৪ই মার্চ রাতে গণমাধ্যমে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখা এবং এ লক্ষ্যে ৩৫ দফা নির্দেশ জারি করেন বঙ্গবন্ধু। এর মাধ্যমে তদাণীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন তার একক নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির আকাঙ্খাকে নির্মুল করা যাবে না। আমরা অজেয়, কারণ আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত।
১৪ই মার্চ ‘মন্টেসেলো ভিক্টরি’ নামে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য খাদ্যশস্যবাহী একটি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে করাচী নিয়ে যাওয়া হয়। ‘ওশান এন্ডুরাস’ নামে সমরাস্ত্র বাহী আরেকটি জাহাজ এদিন চট্টগ্রাম বন্দরের ১০ নং জেটিতে নোঙর করে। ইতোপূর্বে বন্দর শ্রমিকদের অসহযোগিতার কারণে গত ৯ মার্চ ১৬ নং জেটিতে নোঙরকারী ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে সমরাস্ত্র খালাস করতে ব্যর্থ হয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এদিন দেশের সম্পদ পাচার প্রতিরোধে ‘স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন করে।
এআইজে





