ঈদ (عيد) আরবি শব্দ। যার অর্থ খুশি। মুসলমানদের জন্য এধরনের দু'টি খুশির দিন রয়েছে। একটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর আর একটি হচ্ছে ঈদুল আজহা। ঈদ শব্দের আরেক অর্থ ফিরে আসা।

এমন দিনকে ঈদ বলা হয় যেদিন মানুষ একত্র হয় ও দিনটি বারবার ফিরে আসে। এ শব্দ দ্বারা এ দিবসের নাম রাখার তাৎপর্য হলো আল্লাহ রাববুল আলামিন এ দিবসে তাঁর বান্দাদেরকে নিয়ামত ও অনুগ্রহ দ্বারা বারবার ধন্য করেন ও বারবার তাঁর ইহসানের দৃষ্টি দান করেন।

যেমন রমাদানে পানাহার নিষিদ্ধ করার পর আবার পানাহারের আদেশ প্রদান করেন। ছদকায়ে ফিতর, হজ-জিয়ারত, কুরবানির গোশত ইত্যাদি নিয়ামত তিনি বারবার ফিরিয়ে দেন।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনাতে আগমন করলেন তখন মদিনাবাসীদের দু'টো দিবস ছিল, যে দিবসে তারা খেলাধুলা করত।

আনাস (রা:) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন এ দু’দিনের কী তাৎপর্য আছে? মদিনাবাসীগণ উত্তর দিলেন- আমরা জাহেলী যুগে এ দু'দিনে খেলাধুলা করতাম।

তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহ রাববুল আলামিন এ দু দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দু’টো দিন দিয়েছেন। তা হল ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।’

ঈদুল ফিতর (عيدالفطر) শব্দের অর্থ রোজা ভাঙার দিবস। একমাস সিয়াম সাধনার পর মুসলিম উম্মাহর জন্য খুশির সওগাত নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। ধর্মীয় পরিভাষায় একে ‍'ইয়াউমুল জাএজ‍' (পুরস্কারের দিবস) হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।

দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখা বা সিয়াম সাধনার পর মুসলমানেরা এই দিনটি ধর্মীয় কর্তব্য পালনসহ খুব আনন্দের সাথে পালন করে থাকে।

হিজরি বর্ষপঞ্জী অনুসারে রমজান মাসের শেষে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদুল ফিতর উৎসব পালন করা হয়।

তবে এই পঞ্জিকা অনুসারে কোনও অবস্থাতে রমজান মাস ৩০ দিনের বেশি দীর্ঘ হবে না। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রমজানের সমাপ্তিতে শাওয়ালের প্রারম্ভ গণনা করা হয়।

বর্তমানে অনেক দেশে গাণিতিক হিসাবে ঈদের দিন নির্ধারিত হলেও বাংলাদেশে ঈদের দিন নির্ধারিত হয় দেশের কোথাও না-কোথাও চাঁদ দর্শনের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে। দেশের কোনো স্থানে স্থানীয় ভাবে চাঁদ দেখা গেলে যথাযথ প্রমাণ সাপেক্ষে ঈদের দিন ঠিক করা হয়।

ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকে তাকবীর পাঠ করার মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা হয়। তাকবীর হলো : আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। ওয়া লিল্লাহিল হামদ। মুসলমানদের জন্য ঈদের পূর্বে পুরো রমজান মাস রোজা রাখা হলেও ঈদের দিনে রোজা রাখা নিষিদ্ধ বা হারাম।

ঈদের দিন সকালে মুসলমানরা স্রষ্টার ইবাদত করে থাকে। ইসলামের বিধান অনুসারে ২ রাকাত ঈদের নামাজ ৬ তাকবিরের সাথে ময়দান বা বড় মসজিদে পড়া হয়।

ফজরের নামাযের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের নামাযের সময় হয়। এই নামায আদায় করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব। ঈদের নামাজের পরে ইমাম সাহেব খুৎবা (ইসলামিক বক্তব্য) পাঠ করেন, যদিও শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পূর্বে খুৎবা পাঠের বিধান।

ইসলামের বর্ননা অনুযায়ী ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে খুৎবা প্রদান ইমামের জন্য সুন্নত; তা শ্রবণ করা নামাযীর জন্য ওয়াজিব। সাধারণত ঈদের নামাজের পরে মুসলমানরা সমবেতভাবে মুনাজাত করে থাকে এবং একে অন্যের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের সম্ভাষণ বিনিময় করে থাকে। ঈদের বিশেষ শুভেচ্ছাসূচক সম্ভাষণটি হলো, 'ঈদ মুবারাক'।

ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার আগে একটি খেজুর কিংবা খোরমা অথবা মিষ্টান্ন খেয়ে রওনা হওয়া সওয়াবের (পুণ্যের) কাজ। ঈদুল ফিতরের ব্যাপারে ইসলামী নির্দেশসমূহের মধ্যে রয়েছে গোসল করা, মিসওয়াক করা, আতর-সুরমা লাগানো, এক রাস্তা দিয়ে ঈদের মাঠে গমন এবং নামাজ-শেষে ভিন্ন পথে গৃহে প্রত্যাবর্তন।

এছাড়া সর্বাগ্রে অযু-গোসলের মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার বিধানও রয়েছে। ইসলামে নতুন পোশাক পরিধান করার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বিভিন্ন দেশে তা বহুল প্রচলিত একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে।

রমজান মাসের রোজার ভুলত্রুটির দূর করার জন্যে ঈদের দিন অভাবী বা দুঃস্থদের কাছে অর্থ প্রদান করা হয়, যেটিকে ফিৎরা বলা হয়ে থাকে। এটি প্রদান করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব।

ঈদের নামাজের পূর্বেই ফিৎরা আদায় করার বিধান রয়েছে। তবে ভুলক্রমে নামাজ পড়া হয়ে গেলেও ফিৎরা আদায় করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে। ফিৎরার ন্যূনতম পরিমাণ ইসলামী বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট।

ঈদ মুসলমানদের জীবনে শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসবই নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদাত যার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা খুঁজে পায়, ধনী-গরীব, কলো-সাদা, ছোট-বড়, দেশী-বিদেশী সকল ভেদাভেদ ভুলে যায় এবং সকল শ্রেণী ও সকল বয়সের নারী-পুরুষ ঈদের জামাতে শামিল হয়ে মহান প্রভুর শুকর আদায়ে নুয়ে পড়ে।

ঈদের আগমনে অনুগত মুসলিম মুছে ফেলে পাপ-পঙ্কিলতার কালিমা। নিভিয়ে দেয় হিংসা-বিদ্বেষ, কাম-লোভ,আর রাগ-ক্ষোভের আগুন। কি আমীর-ফকীর, কি শ্রমিক-মালিক, কি উচু- নীচু প্রত্যেকে আপন আপন ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে হাতে হাত মেলায়।

শান্তি, সম্প্রীতি, ভাতৃত্ব আর সাম্যের গান গায়। ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত মুমিন-মুসলিম দয়াল মাওলার গুণকীর্তন করে।

তবে আমাদের মাঝে আজ এই মহৎ গুণগুলো হারাতে বসেছে। আমরা গায়ের জোর আর অর্থের বলে অন্যের অধিকার হরণ করি। কৃষকের ঘাম আর শ্রমিক- মজুরের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অর্থ লুট করে অন্যায় লালসা চরিতার্থ করি।

অথচ অগণিত মানুষ খেতে পায় না। অনাহারে অর্ধাহারে কাটে তাদের দিন। আজকের ঈদের দিনেও নতুন পোষাক দুরে থাক- পেটভরে খাওয়ার মত দু’মুঠো ভাতও তাদের জোটে না।

তাই মানুষের এই দুর্দশায় কবির উদাত্ত আহবান 'ও মন রমযানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনারে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকিদ'।

আসুন মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য পালন করি। আজকের ঈদকে সামনে রেখে নিজেকে সাধ্যমত বিলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি।

অসহায় মানুষেরা যেন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারে, সেজন্য দানের হাত প্রসারিত করি। একটুখানি ভাল খাবার, একটা নতুন কাপড় আর কিছু টাকা বিলিয়ে দিলে আমাদের ঈদের আনন্দ বাড়বে বৈ কমবে না।

এ দেশে অসংখ্য শিশু রাস্তার বাসিন্দা। এদের মা- বাবা নেই। আত্মীয় স্বজন নেই। নেই কোন ঠিকানা। শীত-গ্রীষ্ম আর রোদ-বৃষ্টিতে এদের অবস্থান ফুটপাত, ওভার ব্রীজ আর যানবাহনের স্টেশনে। ঈদের সকালে কেউ এদের সেমাই-নাস্তা দেয় না, মাথায় হাত বুলায় না। “খোকা! গোসল করে আয়। নতুন কাপড় পরে ঈদগাহে যা”একথা কেউ বলে না।

এরকম দশ- বিশটা শিশুকে আপনার সাধ্যমত নতুন পোষাক কিনে দিতে পারেন। সেমাই, মোরগ-পোলাও পাকিয়ে ঈদের সকালে এদের পেট ভরে খাওয়াতে পারেন। মাথায় হাত বুলিয়ে পড়া-শুনার কথা বুঝাতে পারেন।

এতে এতীম শিশুরা পিতা মাতার স্পর্শ অনুভব করবে । হাড্ডিসার বুকের মাঝের ছোট্ট হৃদয়ে খুশির জোয়ার বইবে। আপনার ঈদ স্বার্থক হবে, মনুষত্যের বিজয় হবে। আল্লাহ খুশি হবেন।

আমাদের দেশে গৃহকর্মীদের কোন মর্যাদা নেই। তারা যে দিন- রাত শ্রম দিয়ে গৃহকর্তাদের সেবা করে তার কোন মূল্য নেই। গৃহকর্মীরা না থাকলে যে আমাদের জীবন স্থবির হয়ে যায় সে কথা আমরা ভুলে গেছি ।

তাদেরকে মারপিঠ করি । তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেইনা । দুঃখের বিষয় - কেউ কেউ তাদের সঙ্গে দাস-দাসির আচরণ করে থাকি। আমাদের কর্তব্য, তাদের ন্যায্য অধিকার দেয়া। উচ্ছিষ্ট খাবার আর ব্যবহরিত পোষাকের পরিবর্তে ভাল খাবার আর নতুন পোষাক দেয়া।

বিশ্ব মানবতার নবী বলেছেন, “তুমি যা খাও, যা পর তা-ই কাজের ছেলেটিকে, কাজের মেয়েটিকে খাওয়াও, পরাও ।”গৃহকর্মীদের অবশ্যই ঈদ উপলক্ষে বোনাস দেয়া আবশ্যক। সম্ভব হলে তাদের বাবা- মার জন্য কিছু করা উচিৎ। ঈদের ছুটিতে তারা যেন বাবা মা ভাই বোনদের সঙ্গে ঈদ করতে পারে সে ব্যবস্থা করা গেলে খুবই ভাল হয়।

ঈদের দিন মালিক ও ধনিক শ্রেণীর লোকেরা দামী পোষাক পরে, বিভিন্ন ব্রান্ডের পারফিউম মেখে, গাড়ী হাকিয়ে সমগোত্রীয়দের বাড়ী বাড়ী যাবে । আর ধনিক শ্রেণীর মাঝেই দামী উপহার আদান প্রদান করবে । এমনটি অসুন্দর। উচিৎ হলো মালিকরা শ্রমিকের বাড়ী যাবে আর শ্রমিক মালিকের বাড়ী যাবে । উপহার দিবে শ্রমিকদের ছেলে মেয়েদেও । তবে একে অপরকে উপলব্ধি করার সুযোগ পাবে । শ্রমিকের কষ্ট মালিক বুঝবে ।

আর মালিকের ঘরের দামী খাবার দাবার শ্রমিকরা ঈদের দিনের জন্য হলেও খেতে পারবে। এক কথায় পোষাকাষাক, খাবার দাবার এবং আচার –অনুষ্টানে আনন্দের ভাগ সমান করে নিবে । এভাবে ঈদের শিক্ষা নিতে পারলে কল্যান সকলের।

সব মানুষেরই দরিদ্র আত্মীয় স্বজন আছে। দরিদ্র আত্মীয়রা খেতেও পায় না, চাইতেও পারে না। দরিদ্র আত্মীয়দের খাটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই। এদের সহযোগীতা করা সীমাহীন মর্যাদার।

বিশেষত ঈদ-পার্বনে, বিয়ে-শাদীতে তাদের সাহায্য করা বিশেষ ভাবে আবশ্যক । এদেরকে গোপনে সাহায্য করা উচিৎ । যেন অন্যরা না দেখে । আমি অট্টালিকায় চরম বিলাসিতায় বসবাস করলাম আর আমার ভাই অথবা বোন কিংবা মামা-খালার ভাঙ্গা ঘরে ছানী নেই- এতে অপমান আমারই বেশি । ঈদ উপলক্ষে নিকট আত্মীয়দের মর্যাদার প্রতি লক্ষ রেখে দান করা, উপহার দেয়াতে দ্বিগুন নেকী পাওয়া যায়।

আমাদের একটা প্রবণতা হলো - তেলা মাথায় তেল দেয়া। ঈদের দিন আমরা বিত্তবানরা অনেক লোককে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াই। যাদের দাওয়াত দেই তাদের সবার ঘরে ভাল খাবার আছে। কিন্তু যাদের ঘরে খাবার নেই তাদের কথা ভাবি না। যারা বস্তিবাসী, বাস্তুহারা তাদের চিন্তা করি না।

আমাদের উচিৎ বস্তিবাসীদের নিয়ে ঈদ উদযাপনের প্রোগ্রাম করা। বাড়ীর পাশের বস্তি অথবা বাস্তুহারাদের সাধ্যমত তালিকা করে ভালো খাবার খাওয়ানো যেতে পারে। কিছু নতুন কাপড় বিলি করা যেতে পারে। তাতে সুষম বণ্টনের মর্যাদা পাওয়া যাবে। মনুষত্ব রক্ষা পাবে।

পশ্চিমা দুনিয়ার অনুসরণে আজ কাল আমাদের দেশেও অনেক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে। কোনটি ফ্রি, কোনটি আবার ব্যায়বহুল। এ যেন পূর্বেকার যুগের বনবাস। জন্মদাতা মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা বানানোর মত অপরাধ আর কিছু দেখি না? যে মা-বাবা নিজের সর্বস্ব বিলীন করে সন্তানকে বড় করেছে, যারা নিজেদের সহায় সম্পদ বিক্রি করে উচ্চ শিক্ষা দিয়েছে, বিদেশে পড়া শুনার ব্যবস্থা করেছে সন্তানের বড় মানুষ হবার প্রত্যাশায়।

সেই তারাই এখন সন্তানের কাছে বড় বোঝা। বাড়ীর কুকুরটি খাবার পায়, চিকিৎসা সেবা পায়, কিন্তু পায় না মা বাবা। হায়রে মানবতা! হায়রে পশিচমা সভ্যতা ! এসকল মর্মস্পশী ঘটনা থেকে সর্ব প্রথম মা-বাবারই শিক্ষা নেয়া উচিৎ। সন্তানকে সেই শিক্ষাই দেয়া উচিৎ যাতে তারা মা-বাবার মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারে।

সন্তানেরও মনে রাখা দরকার- আজ আপনি আপনার পিতামাতাকে আশ্রমে পাঠালেন, কাল আপনাকে আপনার সন্তান যে আশ্রমে পাঠাবে না- সে কথা আপনি জোর দিয়ে বলতে পারবেন না ।

যা হোক - যে সকল সন্তানরা বাবা-মাকে আশ্রমের বাসিন্দা বানিয়েছেন- তারা অবশ্যই মা-বাবাকে ঈদের আগে বাড়ী নিয়ে আসবেন, পা ধরে মাফ চাইবেন । পরমশ্রদ্ধা ও ভালবাসায় বাবা-মার খিদমত করবেন। মনে রাখবেন স্ত্রী সন্তানের চেয়েও বৃদ্ধ বাবা-মার অধিকার আপনার উপর অনেক বেশি।

মজলুম মুসলিমদের ঈদ: সারা বিশ্বের মুসলমানরা যখন ঈদুল ফিতরের আনন্দ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিজেদের জন্য, ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন পোষাকাষাক কেনাকাটা করছে। ভাল খাবার দাবারের আয়োজন করছে ।

ঠিক তখনই পৃথিবীর কিছু জনপদে মুসলিম নারী- শিশু- পুরুষরা জালেমদের নিপীড়নে মুত্যুর প্রহর গুণছে । বোমার আঘাতে ধুলিস্যাত হচ্ছে ঘর বাড়ী। ছিন্নভিন্ন হচ্ছে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ।

শহীদ মুসলিমদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে মুসলিম জনপদ । ফুলের মত শিশুদের লাশের গন্ধে ভারী হচ্ছে আকাশবাতাস । ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, আফগানিস্তান, আরাকান যে দিকেই তাকাবেন একই দৃশ্য, একই আর্তনাদ।

কোথায় তাদের ঈদ ? কোথায় ঈদের পোষাক ? কিসের মিষ্টান্ন ?আমাদের মনে রাখা দরকার, একদিন তারাও আমাদের মত সুখী ছিল । হাসতো, খেলতো, গাইতো । ঈদ-পর্বনে আমাদের মতই আনন্দ উল্লাসে ব্যস্ত থাকতো ।

আজ আমরা হয়তো দূর থেকে তাদের জন্য কিছুই করতে পারবো না । তবে অনুভব করতে পারবো তাদের ব্যাথা ।

ঘৃণা করতে পারবো জালিমদের। ধিক্কার দিতে পারবো বিশ্বনেতাদের। আর দোয়া করতে পারবো মজলুম আর শহীদ মুসলমানদের জন্য।

ইয়াতীম ও অভাবীকে খাবার খাওয়ানো : ইয়াতিমের খোঁজ-খবর নেয়া, তাদেরকে খাবার খাওয়ানো এবং সম্ভব হলে তাদের নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দেয়া। এটা ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

আল কুরআনে বলা হয়েছে, তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে [সূরা আদদাহর : ৮]

আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেয়া : ঈদের সময় বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেয়া ও তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে আখেরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে।’ [সহীহ বুখারি : ৬১৩৮]

প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর নেয়া : ঈদের সময় প্রতিবেশীর হক আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরিক করো না।

আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতীম, মিসকীন, প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে, যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী।’ [সূরা নিসা : ৩৬]

মন-মালিন্য দূর করা : জীবন চলার পথে বিভিন্ন পর্যায়ে কারো কারো সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। ঈদের সময় পারস্পরিক মন-মলিন্য দূর করা ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উত্তম সময়।

হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে। তাদের অবস্থা এমন যে দেখা সাক্ষাৎ হলে একজন অন্য জনকে এড়িয়ে চলে। এ দুজনের মাঝে ঐ ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যে প্রথম সালাম দেয়।’ [সহীহ মুসলিম : ৬৬৯৭]

পবিত্র রমজানের দিনগুলো এবং রাতের প্রহরগুলো যে ভাবে অতিক্রম হয়েছে সারাটা বছর যেন এভাবে কাটানো যায় মহান স্রষ্টার সমীপে তা একান্তভাবে কাম্য। ঈদ পবিত্র, ঈদ খুশির, ঈদ আনন্দের, ঈদ ক্ষমার, ঈদ প্রার্থনার। সব ভেদাভেদ ভুলে একে অপরকে বুকে জড়ানোর দিন; সাম্য, সৌহার্দ্য, ভালোবাসা, মিলনের দিন।

এক মাসের রোজার অবসানে তাই ঈদুল ফিতরের উৎসব কেবল ভোজনের মাধ্যমে ইন্দ্রিয়তৃপ্তির উৎসব নয়, বিশুদ্ধ আত্মা নিয়ে জীবনকে নতুন করে সাজানোর অঙ্গীকারেরও উৎসব। আত্মিক পরিশুদ্ধির ফলে দূর হয়ে যাবে সব সংকীর্ণতা ও ভেদাভেদ।

পুরো রমজান মাস আমরা যে সংযমের অনুশীলন করেছি, তা আমাদের জীবন চলার সব ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘনের নেতিবাচক প্রবণতা থেকে রক্ষা করবে—এমনই প্রত্যাশা। অন্যায়, অবিচার, ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসা, হানাহানি—মানুষের সব নেতিবাচক প্রবণতার রাশ টেনে ধরবে।

ঈদ যে আনন্দের বার্তা বয়ে এনেছে, তার মর্মমূলে আছে শান্তি ও ভালোবাসা। পরস্পরের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হয়ে ওঠার এক মহান উপলক্ষ ঈদ। ঈদুল ফিতরের আগমনী সুরে বেজে চলেছে মানুষে মানুষে মিলনের এই আকুতি। তাই মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ সব ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের প্রতিবেশীদের নিয়ে তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব বরণের জন্য প্রস্তুত।

আসুন আমরা সবাই ইসলামের নির্দেশনা অনুয়ায়ী নিজেকে চালিত করে একটি সুখী সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব গড়ে তুলি।

এই হোক ঈদুল ফিতরের চেতনা ও শিক্ষা। আল্লাহ আমাদের ইসলামের সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এআর/এসএইচ