‘ওইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে/ তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে’ বা ‘তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে/ গাছের ছায়া লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়’ কিংবা ‘বাবু সেলাম বারে বার/ আমার নাম গয়া বাইদ্যা/ বাবু বাড়ী পদ্মার পাড়’

এভাবেই বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য কবিতা, গল্প, নাটক, গানের মাধ্যমে তুলে ধরে জসীম উদ্‌দীন পেয়েছিলেন পল্লীকবির উপাধি।

তাঁর ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী শনিবার। ১৯৭৬ সালের এই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেন।

পুরো নাম জসীমউদ্দীন মোল্লা। তিনি বাংলাদেশে পল্লীকবি হিসেবে পরিচিত। তার লেখা কবর কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য অবদান।

ফরিদপুর জেলার তাম্বলখানা গ্রামে ১৯০২ সালের ১ জানুয়ারি পল্লীকবি জসীমউদ্দীন জন্মগ্রহণ করেন। এটি ছিল তার নানার বাড়ি। নিজের বাড়ি ছিল গোবিন্দপুর গ্রামে। তার বাবা আনসার উদ্দীন ছিলেন ফরিদপুর হিতৈষী এমই স্কুলের শিক্ষক। মায়ের নাম আমেনা খাতুন।

নেহাজউদ্দীন নামে জসীমউদ্দীনের এক চাচাতো ভাই ছিলেন। তারা দু’জন সারাদিন টোটো করে ঘুরে বেড়াতো পথেঘাটে, ক্ষেতখোলা আর নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়াতেন। এমনি দুষ্টুমি আর দস্যিপনায় মেতে থাকতে থাকতে স্কুলে যাওয়ার বয়স হলে বাবা তাদের দু’জনকেই শোভারামপুর গ্রামে অম্বিকা মাস্টারের পাঠশালায় ভর্তি করে দিলেন।

তারপর কবি অম্বিকা বাবুর পাঠশালা থেকে আসেন বাবার স্কুলে। সেখানে পড়েন চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত। তারপর জেলা স্কুলে। এই স্কুল থেকেই তিনি ১৯২১ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর ভর্তি হন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে। এখান থেকেই তিনি আইএ এবং বিএ পাস করেন ১৯২৯ সালে। তারপর তিনি চলে যান কলকাতায়। সেখান থেকে তিনি এমএ পাস করে ১৯৩৩ সালে চাকরি জীবন শুরু করেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের অধীনে ‘রামতনু লাহিড়ী’ গবেষণা সহকারী নিযুক্ত হন। এরপর তিনি ১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। অধ্যাপনা ছেড়ে ১৯৪৪ সালে তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগে চাকরি গ্রহণ করে ১৯৬১ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

জসীমউদ্দীনের কবি প্রতিভা বিকশিত হয় শৈশবেই। কবি খ্যাতির শীর্ষে ওঠেন যখন তিনি কলেজে পড়ার সময় কবর কবিতাটি লেখেন। তিনি যখন বিএ ক্লাসের ছাত্র তখনই কবিতাটি প্রবেশিকা পরীক্ষার্থীদের পাঠ্য তালিকাভুক্ত হয়। ১৯২৭ সালে তার দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে আরো খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে — একটি রাখালি অন্যটি নকশীকাঁথার মাঠ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কবি বই দুটি উপহার দিলে তিনি বই দুটির প্রশংসা করে একটি আলোচনাও লিখেছিলেন।

গ্রামের সহজ-সরল মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের বিচিত্র বিষয় ছিল তার কবিতার বিষয়বস্তু। গ্রামের সাধারণ মানুষের কথাই তিনি তার কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। দেশের মানুষ তাই তাকে ভালোবেসে ‘পল্লীকবি’ হিসেবে ভূষিত করেছে।

১৯৭৬ সালে ১৪ মার্চ ঢাকায় জসীমউদ্দীন ইন্তেকাল করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে দাফন করা হয় নিজ গ্রাম গোবিন্দপুরে।

কবি জসীম উদ্‌দীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ রাখালী। এরপর তার বিভিন্ন বিষয়ে ৪৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। নকঁশী কাথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, এক পয়সার বাঁশি, রাখালী, বালুচর প্রভৃতি তার অমর সৃষ্টি।

তাঁর লেখা কাব্যগ্রন্থ- রাখালী (১৯২৭), নকশী কাঁথার মাঠ (১৯২৯), বালু চর (১৯৩০), ধানখেত (১৯৩৩), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৪), হাসু (১৯৩৮), রঙিলা নায়ের, মাঝি(১৯৩৫), রুপবতি (১৯৪৬), মাটির কান্না (১৯৫১), এক পয়সার বাঁশী (১৯৫৬), সকিনা (১৯৫৯), সুচয়নী (১৯৬১), ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৬২), মা যে জননী কান্দে (১৯৬৩), হলুদ বরণী (১৯৬৬), জলে লেখন (১৯৬৯), কাফনের মিছিল ((১৯৮৮)।

তাঁর লেখা নাটক- পদ্মাপার (১৯৫০), বেদের মেয়ে (১৯৫১), মধুমালা (১৯৫১), পল্লীবধূ (১৯৫৬), গ্রামের মেয়ে (১৯৫৯), ওগো পুস্পধনু (১৯৬৮), আসমান সিংহ (১৯৮৬)।

তাঁর লেখা আত্মকথা- যাদের দেখেছি ((১৯৫১), ঠাকুর বাড়ির আঙ্গিনায় (১৯৬১), জীবন কথা ( ১৯৬৪), স্মৃতিপট (১৯৬৪)।

তাঁর লেখা উপন্যাস- বোবা কাহিনী (১৯৬৪)।

তাঁর লেখা ভ্রমণ কাহিনী- চলে মুসাফির (১৯৫২), হলদে পরির দেশে ( ১৯৬৭), যে দেশে মানুষ বড় (১৯৬৮), জার্মানীর শহরে বন্দরে (১৯৭৫)।

তাঁর লেখা সঙ্গীত- জারি গান (১৯৬৮), মুর্শিদী গান (১৯৭৭)।

তাঁর লেখা অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে হচ্ছে বাঙালির হাসির গল্প ডালিমকুমার (১৯৮৬)।

দিবসটি উপলক্ষে ফরিদপুর জেলা প্রশাসন ও জসীম উদ্‌দীন ফাউন্ডেশনসহ জেলার বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

এ উপলক্ষে শনিবার সকাল ৮টায় শহরের অম্বিকাপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে কবির কবরে জেলা প্রশাসন, জসিম উদ্‌দীন ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে সম্মান জানানো হবে। পরে সেখানে দোয়া মাহফিল করা হবে বলে জসিম উদ্‌দীন ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে।

কবি ১৯৭৬ সালে ইউনেস্কো পুরস্কার, ১৯৬৮ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.লিট উপাধি ও ১৯৭৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।

এএইচ