যে দিকে চোখ যায় কেবল দিগন্ত বিস্মৃত সবুজ আর সবুজ। মাঠের পর মাঠ শুধু ফসল আর ফসল। এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মার ধু-ধু বালুচরে এখন নানা অর্থকারী ফসলের সমাহার। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও দৌলতপুর উপজেলার অনাবাদি পদ্মা চরে এখন নানা ফসলে সম্ভার।

এই চরে রবি শষ্য চাষ করে বিপুল সাফল্য পেয়েছেন এখানকার চাষীরা। অর্থকারী এসব ফসলের আবাদ করে সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে হতদরিদ্র চরবাসির। তবে সহজ শর্তে ঋণ আর কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে এই পদ্মা চরে ফসলের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব বলে মনে করেন কৃষকরা।

জানা গেছে, প্রায় দেড় যুগ আগে ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ, বাহাদুরপুর, মোকারিমপুর এবং দৌলতপুর উপজেলার চিলমারি, মরিচা ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা পদ্মানদীর কড়াল গ্রাসে বিলীন হয়ে যায়। এতে আবাদি জমি-ভিটেবাড়ি হারিয়ে পথে বসেন হাজার হাজার কৃষক। কাজ না থাকায় অভাব অনটনে জর্জরিত হয়ে পড়ে ছিন্নমূল মানুষ।

তখন এক বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো তাদের। এই এলাকাটি ভারত সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় পেটের তাগিতে চোরাচালানের সাথে জড়িয়ে পড়ে অনেক পরিবার। তবে কয়েক বছর পরেই পদ্মানদীর বুক জুড়ে বিশাল চর জেগে উঠে। প্রথম দিকে এসব জমি চাষীদের কোন কাজেই আসতো না। বালু চরে কোন ফসলো হতো না।

তবে গেল কয়েক বছরে পলি জমে এই জমি চাষযোগ্য হয়ে উঠায় নতুন করে বাঁচার অবলম্বন খুঁজে পেয়েছে এ অঞ্চলের কয়েক হাজার কৃষক। পলি জমে যাওয়ায় এসব চরে সোনার ফসল ফলিয়েছে কৃষকরা। এই রবি মৌসুমে গম, মশুর, সরিষা, খেসাড়ী, মটর, চিনা বাদাম, আখসহ নানা ফসলে ভরে উঠেছে চরাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি। এতে দারিদ্র পীড়িত কৃষকদের জীবনে সুদিন ফিরেছে।

ভেড়ামারার বাহাদুরপুর উপজেলা গ্রামের কৃষক মসলেম উদ্দিন ও দৌলতপুর উপজেলার ঠোটারপাড়া গ্রামের কৃষক জানান, পদ্মার ভাঙনে এক সময় ৫০ বিঘা জমিসহ সহায় সম্বল সব হারিয়ে ছিলাম। সে সময় পরিবার নিয়ে কিভাবে দিন কেটেছে তা আর মনে করতে চাই না। তবে দিন এখন বদলে গেছে, নদী আবার আমাদের অনেক জমি ফিরিয়ে দিয়েছে। এ বছর ৫ বিঘা জমিতে গম, ৩ বিঘা মসুরী ও ৩ বিঘা জমিতে মটরচাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ফলন ভালো হবে।

ইসলামপুর গ্রামের চাষী আমজাদ হোসেন বলেন, একদিন সব হারালেও আমরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। নদী ভাঙনে ২০ বিঘা জমি হারিয়েছিলাম, এর মধ্যে ১০ বিঘা জমি আবার জেগে উঠেছে। পলি পড়ে দিন দিন জমিগুলো উর্বর হয়ে উঠছে। এসব জমিতে ভালো ফসল ফলিয়েছি। ইতিমধ্যে দু‘বিঘা জমির মশুরী উত্তোলন করেছি। এতে প্রায় ১৬ মণ মশুরী ঘরে তুলেছি।

একই এলাকার কৃষক ফজল শেখ বলেন, নদীতে সব হারানোর ফলে তাদের হাতে তেমন টাকা পয়সা নেই। তাই সরকার সহজ সর্তে ঋণ দিলে তারা সময় মত জমিতে ফসল বুনতে পারবেন। তবে কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় কৃষি বিভাগ তেমন খোঁজ খবর রাখেন না। অনেক সময় পোকার আক্রমনে ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আবার কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যাপারেও তাদের অভিজ্ঞতা নেই।

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দীন জানান, কৃষি বিভাগের সহযোগিতার হাত বাড়ালে কৃষকদের এই প্রচেষ্ট আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। দৌলতপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা খালেদুর রহমান জানান, কৃষি বিভাগ তাদের সাধ্যমত কৃষকদের সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে এখনও দৌলতপুরের পদ্মাচরের অনেক জমি আবাদের বাহিরে রয়েছে। এসব জমি চাষের আওতায় আনা গেলে চরের হতদরিদ্র কৃষকদের মুখে হাসি ফুটানো সম্ভব।

এআর