মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই, ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভূবনে নাই। সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক মাথার 'পরে আজি, অন্তরে মা থাকুন মম ঝরুক স্নেহরাজি।

সত্যি মায়ের মত আপন আর কেউ ত্রিভুবনে নাই। মা এমন একটি শব্দ যা একেবারে অন্তর থেকে আসে। পৃথিবীতে মা-বাবার চেয়ে আপন আর কেউই নাই। সব আবদার-অভিযোগও যেন মা ছাড়া কাউকে বলা যায় না।

‘মা’ ডাকের মধ্যে কী যে পরিতৃপ্তির সুখ, অনাবিল আনন্দ তা অন্য কিছুতেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। নিজের যত কষ্টই হোক, সব লাঞ্ছনা- বঞ্ছনা সহ্য করে, নিজের জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে মা তার সন্তানকে বড় করে তোলেন। মা কখনও নিজের সুখের চিন্তা করেন না। সন্তানের সুখই মায়ের বড় সুখ, সন্তান সুখে থাকলেই মা খুশি।

মায়ের ভালোবাসায় কোনো স্বার্থ নেই, কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নেই। মা তার সন্তানকে বুকভরা ভালোবাসা, প্রাণঢালা আদর বিলিয়ে দিয়ে ধন্য হন। মায়ের মমতার আঁচল সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রদ্ধা এবং অকৃত্রিম ভালোবাসার সম্পদ এ মাকে সম্মান জানাতেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মা দিবস। আমাদের দেশে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস পালিত হলেও বিভিন্ন দেশে বছরের বিভিন্ন সময়ে পালন করা হয় মা দিবস।

‘মা দিবস’ এর ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেরালে আমরা দেখতে পাই, পাশ্চাত্যের বিশেষত আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গির কতটা শক্তিশালী প্রভাব তার পেছেনে কাজ করেছে এবং কত বিচিত্র ভাবে আর বিচিত্র গতিতে দিবসটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

উইকিপিডিয়া অনুসারে মা দিবসের তাৎপর্যের মূলে আছে তিনটি বিষয় - ১. সকল মা’দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ২. সকল মাতৃত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ৩. সমাজে মা’দের প্রভাবের প্রতিফলন। অন্যান্য আধুনিক দিবসের মতো ‘মা দিবস’ও একটি অধুনা সংস্করণ।

১৮৭২ সালে জুলিয়া ওয়ার্ড হওয়ির প্রচেষ্টায় একবার ‘মা দিবস’ পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু তা সার্থক হয়নি, কেননা সেই দিবস সকল মা’য়ের উদ্দেশ্যে পালনের জন্যে ছিল না। তা ছিল শুধু শান্তিকামী, যারা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সেসব মা’য়ের জন্যে। ১৯০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনা জারভিসের মা মারা গেলে তার মাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে আনা জারভিস প্রথম ‘মা দিবস’ পালন করেন। তারপর থেকে প্রতি বছর ‘মা দিবস’ পালনের লক্ষ্যে আনা তার ক্যাম্পেইন বা প্রচারাভিযান শুরু করেন যা ১৯১৪ সালে সেই ক্যাম্পেইন স্বীকৃতি বা প্রতিষ্ঠা পায়।

১৯২০ নাগাদ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে তার প্রচলন শুরু হয়ে যায়। তবে স্থান-কাল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে তা পালন করতে দেখা যায়। যেমন রোমান ক্যাথলিকরা এই দিবসটি মা মেরিকে স্মরণের উদ্দেশ্যে পালন করে। হিন্দু সম্প্রদায়, বিশেষত নেপালে এই দিবস ‘মা’য়ের (ধর্মীয় দেবী) পাক্ষিক তীর্থযাত্রা’ নামে প্রতি বৈশাখ মাসের প্রথম চাঁদ ওঠার দিন তা পালন করে।

সৌদি আরবে প্রতি বছর ২১ মার্চ, বসন্তের প্রথম দিনটিতে পালিত হয়। যেটা আবার তুরস্কের সাংবাদিক মোস্তফা আমিনের বরাত দিয়ে সৌদি আরবে প্রবেশ ঘটে। বিশেষত মোস্তফা আমিন যখন একজন বিধবা মা’য়ের গল্প শোনেন - যিনি তার ছেলেকে অনেক কষ্টে ডাক্তারি পড়ান এবং ছেলে ডাক্তার হবার পর বিয়ে করে মা’কে ফেলে চলে যায়। ঘটনাটা তার মনে প্রচন্ড রেখাপাত করে এবং শুরু হয় ‘মা দিবস’ পালন।

আর্জেন্টিনায় দিবসটি পালিত হয় প্রতি অক্টোবর মাসের তৃতীয় রবিবার, মা মেরির স্মরণের উদ্দেশ্যে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯২৪ সালে মিসেস জেনেট হেডেন যখন নিউইংটন স্টেট হোম ফর ওয়োমেন এ তার একজন রোগী দেখতে যান তখন অনেক মা’য়ের দেখা পান যারা নিঃসঙ্গ এবং সন্তানেরা যাদের ভুলে গিয়েছে। এসব নিঃসঙ্গ আর ভুলে যাওয়া মা’দের জন্যে ‘মা দিবস’ পালনের ব্যবস্থা করেন।

চীন প্রজাতন্ত্রে ১৯৯৭ সাল থেকে দুঃস্থ মা’দের উদ্দেশ্যে দিবসটি পালন শুরু হয়। জার্মানিতে ১৯২০ নাগাদ বিভিন্ন কল-কারখানায় নারী শ্রমিকের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন শুরু হয়। নারীকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ১৯২৩ সাল থেকে ‘মা দিবস’ এর প্রচলন শুরু হয়।

ইসরাইলে ইহুদি ক্যালেন্ডার অনুসারে শিভাত মাসের ৩০ তারিখে ( যা ৩০ জানুয়ারি থেকে ১ মার্চ এর কোন এক সময়ের অন্তর্গত) ‘মা দিবস’ পালন করা হয়। দিনটি হেনরিটা স্কল এর মৃত্যুদিবস। হেনরিটা যিনি কোন সন্তান ধারণ না করলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক ইহুদি সন্তানের প্রাণরক্ষার জন্যে সংগ্রাম করেন। মূলত তাকে উদ্দেশ্য করেই দিবসটি পালন করা হয়।

ইরানে ইসলামিক ক্যালেন্ডারের জুমাদা-আল-থানি মাসের ২০ তারিখে ‘মা দিবস’ পালন করা হয়। তারিখটি হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর কন্যা ফাতিমার জন্মদিনকে সামনে রেখে পালিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানে দিবসটি বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয়।

কাজেই দেখা যাচ্ছে ‘মা দিবস’ এর উৎস মুখ যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হলেও বিভিন্ন দেশ যার যার মতো করে বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ‘মা দিবস’ এর লক্ষ্য আর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে এ ধরণের কোন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের কোন ইঙ্গিত দেখা যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশে তো নয়ই।

যেহেতু দিবসটি পশ্চিমের এবং আমাদের অচেতন মনে পশ্চিমে যা ঘটে বা ঘটবে সেটাই এখানে ঘটতে দেয়া হবে বা উচিত, এই বোধ কাজ করে। কাজেই এখানেও একটি ‘মা দিবস’ আমাদের প্রয়োজন। সেই দিবস কিন্তু আবার শহরের বিত্তশালী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অচেতন মনের গন্ডিতেই বিরাজিত।

আমাদের গ্রামের এবং দরিদ্র শ্রেণীর লক্ষ লক্ষ মা’য়েরা সেখানে অন্তর্ভূক্তি হন না বা হতে পারেন না। কারণ ‘মা দিবস’ এর কোন তাৎপর্য এই শ্রেণীর ভেতর বিরাজ করে না। কেননা এই মা’য়েরা এতোটাই আটপৌরে, এতটাই প্রতিদিনের যে তাকে কোন বিশেষ দিনে বিশেষ ভাবে বিশেষায়িত করার কথা তারা ভাবতেই পারেন না।

যখনই কোন কিছুকে বা কাউকে ‘বিশেষ’ ভাবে বিশেষায়িত করা হয় তখনই, তা বা সেই ব্যক্তি আর দশজন থেকে পৃথক হয়ে পড়েন। এই ধরণের পৃথকিকরণের কোন ব্যবস্থা এই দরিদ্র শ্রেণীর ভেতর নেই। তাই আমাদের শহুরে বা বিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সন্তানেরা ‘মা দিবস’ উপস্থিত হলে বিভিন্ন ধরণের বৈচিত্রময় কার্ড, খাবার, অনুষ্ঠান এবং ‘মা’ কে নিয়ে পত্রিকার পাতা, টিভি নাটক এবং অনুষ্ঠানে আবেগ, অনুভূতি আর ব্যাকুলতা দিয়ে ‘মা’ কে মহিমান্বিত করে তোলেন।

একজন ‘মা’কে পৃথক ভাবে মহিমান্বিত বা মহীয়সী করার কিছু নেই। একজন ‘মা’ সব সময়, প্রতি মুহূর্ত্তেই একজন মা। দৈনন্দিনতার মাঝে যে মাকে আমরা পাই বা স্মরণ করি তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকতার মা’কে আমরা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলি। মা, মাতৃত্ব এবং মায়ের প্রতি অনভূতির সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনকিছুর তুলনা হয় না বলেই তা এতো বিরল। সেই বিরল আর দুর্লোভ অনুভূতি আমাদের মনের গভীরে সহজাত ভাবেই বিরাজ করে।

সর্বপরি একজন ‘মা’ একজন নারীও বটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় আমরা আমাদের ‘মা’ কে যতটা আবেগ দিয়ে স্মরণ করি, নারী হিসেবে তাকে দেখি অনেকটাই অবহেলায়। একজন নারীকে হারিয়ে ফেলার অর্থ যে একজন মা’কেও হারিয়ে ফেলা এই সহজ বোধটুকু আমাদের মাথায় থাকে না। এই হারিয়ে ফেলার বোধের অভাবের কারণে অসংখ্য মহীয়সী মা’কে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়।

শুধু একজন নারী অর্থাৎ একজন মা’ই পারেন জীবনবাজি রেখে তার সন্তানকে বাঁচাতে। একজন নারী সন্তানধারণ করেও এবং না করেও একজন ‘মা’ ই থাকেন শেষ পর্যন্ত। কাজেই একজন মা’কে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখার অর্থ একজন নারীকে সেভাবে দেখা।

মায়ের জন্যে অনুভূতি কোন ধারণার ঘেরাটপে বন্দী করা যায় না। মা’য়ের জন্যে পৃথক একটা দিবস সাজিয়ে মা’কেই পৃথক করে দিচ্ছি কিনা সেটা ভাববার বিষয়। শুধু বিশেষ একটা দিনে বিশেষভাবে মা’কে স্মরণ করা নয়। কারণ, মা প্রতিদিনের। মা একটি বটবৃক্ষের মতো, যার প্রতিদিনের ছায়ায় আমরা বেঁচে থাকি। তাই প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তই হোক আমাদের ‘মা দিবস’। বিশ্ব মা দিবসে সকল 'মা' ও 'মা জাতি'র প্রতি রইলো শ্রদ্ধা এবং অকৃত্তিম ভালোবাসা।

এআর/ইআর