ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার মিলিত বিপ্লবে চারদিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর শেষ হয়। প্রতিহত হয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্র। এদিন সিপাহি-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ক্যান্টনমেন্টের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনেন স্বাধীনতার ঘোষক তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।

দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন দেশব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন।

বিপ্লব ও সংহতি দিবসে ৭ নভেম্বর শনিবার সকাল ৬টায় বিএনপির উদ্যোগে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় এবং দলীয় পতাকা উত্তোলন। ১০টায় শহীদ রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। একইভাবে সারাদেশে দলের সব ইউনিট কমিটি যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন করবে। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর অনিশ্চিত অবস্থা বিরাজ করছিল। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী দল তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটালে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনা সাধারণ জনগণ ও সিপাহিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বমহলে বিশেষত সিপাহিদের কাছে ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। ফলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঘটে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ এক বিপ্লব—যা ইতিহাসে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে স্থান লাভ করেছে। দেশবাসী সেদিন জিয়ার হাতেই তুলে দিয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তদানীন্তন দৈনিক বাংলার রিপোর্টে বিপ্লব সম্পর্কে বলা হয়—‘সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহী-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা।

৭ নভেম্বর শুক্রবার ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি’। জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। এদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পথে পথে সিপাহী-জনতা আলিঙ্গন করেছে একে অপরকে। নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ধ্বনিতে ফেটে পড়ে তারা। সিপাহী-জনতার মিলিত বিপ্লবে ভণ্ডুল হয়ে যায় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী সব ষড়যন্ত্র। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ নেমে আসেন রাজপথে। সাধারণ মানুষ ট্যাংকের গলায় পরিয়ে দেয় ফুলের মালা। এই আনন্দের ঢেউ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের সব শহর-নগর-গ্রামেও পৌঁছে যায়।’

রেডিও বাংলাদেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে জেনারেল জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেন, তিনি সাময়িকভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। সেনাবাহিনীর অনুরোধে এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাধ্য অনুযায়ী তিনি তার কর্তব্য পালন করবেন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ এবং কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান। তিনি অবিলম্বে সবাইকে কাজে যোগ দেয়ারও নির্দেশ দেন।

এভাবে জাতিরাষ্ট্রের আত্মমর্যাদাবোধ ঐ দিন থেকে যে স্বকীয়তা, স্বনির্ভরতা ও আত্মোন্নতির উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল, আজও তা জাতিকে প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে। যদিও ভূরাজনৈতিক চক্রান্তে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা একটা পরিবারতন্ত্রের সংঘশক্তির করায়ত্ত, জাতিরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানকে সাবোটাজ করে ঐ সংঘশক্তির পঞ্চম বাহিনী এদেশকে বিশ্বের চোখে স্বশাসনের অযোগ্য প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে।

চলমান বিশ্বব্যবস্থার সংঘাতসঙ্কুল আবর্তে, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের হুমকিতে কিংবা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার গোলকধাঁধায় পথ হারায়নি। রাষ্ট্রঘাতী চক্রান্তের মোকাবেলায় রাজপথে নেমে এসেছে, প্রতিবাদে প্রতিরোধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রঘাতী চক্রের কবল থেকে অচিরে আবার রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে জাগ্রত জনতা, এ কথা সুনিশ্চিত।

এমএইচ