বাংলাদেশের ১৩ জেলার মধ্যে এক কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার ১৫ লাখ মানুষ। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এ তিন জেলার ৭৫ শতাংশ মানুষ কীটনাশকযুক্ত মশারি দিয়ে রাতে ঘুমানোয় কমে এসেছে এর প্রকোপ। এ ছাড়া দেশের অন্য ১০ জেলার মানুষ সংখ্যায় কম হলেও ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে।

এ অবস্থায় আজ পালন হচ্ছে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। তবে দিবসটি নিয়ে সরকারিভাবে বড় কোনো কর্মসূচি নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্তাব্যাক্তির দাবি ঢাকায় বড় কোনো কর্মসূচি পালন করা না হলেও জেলা ও উপজেলায় সচেতনতাবিষয়ক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।

সরকার এ বিষয়ে না ভাবলেও এখনো ম্যালেরিয়া পৃথিবীজুড়ে একটি ঘাতকরোগ হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ লোক এ রোগে প্রাণ হারায়। আর ৮৫ ভাগ মৃত ব্যক্তিই হলো পাঁচ বছরের নিচের শিশু। এ রোগ যদিও আফ্রিকা মহাদেশের প্রধান রোগ, তবুও এশিয়া ও ল্যাতিন আমেরিকার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ম্যালেরিয়া।

বিশ্বে ৩৩০ কোটি মানুষ রয়েছে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে। আনুমানিক প্রতিবছর ৩৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন লোক পৃথিবীতে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৩৩.৬ শতাংশ অর্থাৎ ৫১ মিলিয়নের মতো মানুষ রয়েছে ঝুঁকিতে, এর মধ্যে ১০.৯ মিলিয়ন লোকের রয়েছে উঁচু থেকে মাঝারি ঝুঁকি এবং ৩৯.৭ শতাংশ মিলিয়নের রয়েছে নিম্ন ঝুঁকি। দেশের ৬৪টি জেলার ১৩টি থেকে বেশি ম্যালেরিয়া রোগী পাওয়া যায়। এ ১৩টি জেলার ২৪ মিলিয়ন লোকের ক্ষেত্রে ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি ক্রমে শোচনীয় হচ্ছে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও বনাঞ্চলে, সীমান্তবর্তী এলাকায় রয়েছে ১১টি ম্যালেরিয়া-দুর্গত জেলা। সেসব অঞ্চলে ক্লোরোকুইন ও ফেনসিডার রেজিস্ট্যান্ট ম্যালেরিয়াও বেশ পাওয়া যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার আগে এ অঞ্চলে ব্যাপক ভিত্তিতে ডিডিটি প্রয়োগ করা হলে অন্যান্য মশার সাথে ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী মশার উপদ্রবও কমে যায়। তবে পার্বত্য অঞ্চলের ঘন ঝোপ-ঝাড় ও বনাঞ্চলে জীবাণুবাহী কিছু মশা থেকেই যায়। এখান থেকেই পরে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে ম্যালেরিয়া।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে ভারত ও মিয়ানমারের বিশাল পার্বত্যাঞ্চল রয়েছে। দুই দেশের পার্বত্যাঞ্চল থেকে ম্যালেরিয়া জীবাণুবাহী মশা ধীরে ধীরে চলে আসে আমাদের লোকালয়ে। এভাবে নির্মূলের পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও দ্রুত বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ম্যালেরিয়া।

ম্যালেরিয়া শুরু যেভাবে

ডা.আঞ্জুমান বলেন, যেহেতু মশার কামড়ে এই রোগটি হয় এবং জ্বর এর প্রধান লক্ষণ তাই ম্যালেরিয়া জ্বর নামেই প্রচলিত রোগটি। এনোফিলিস নামক এক ধরনের মশা যাদের স্ত্রী প্রজাতির কামড়ে ম্যালেরিয়ার জীবানু ছড়ায়।

ম্যালেরিয়ার পেছনে রয়েছে ‘প্লাজমোডিয়াম’ নামে এক পরজীবী; ম্যালেরিয়া আক্রান্ত লোকের রক্ত যখন শুষে নেয় স্ত্রী অ্যানোফিলিশ মশা, আর সেই মশা যখন অন্য লোককে কামড়ায়, তখন ওই পরজীবী স্থানান্তরিত হয় সুস্থ মানুষের দেহে, এভাবে ঘটে ম্যালেরিয়ার আক্রমণ। এই পরজীবী প্রথম পরিচিত হয়ে ওঠে বিজ্ঞানীদের কাছে ১৮৮০ সালে, যখন চালর্স লুই আলফোন লাভারেন প্রথম একে শনাক্ত করেন সেনাদের সংক্রমিত রক্তে। এই পরজীবীর রয়েছে চারটি প্রজাতি। প্রতিটির সংক্রমণে দেখা দেয় উপসর্গ, তবে সবচেয়ে মারাত্মক প্রজাতি হলো ‘প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম’।

কিভাবে বুঝবেন ম্যালেরিয়া হয়েছে কিনা?

লক্ষণগুলোর কথা বলতে গিয়ে ডা.আঞ্জুমান বলেন, দুইদিনের বেশি কাপুনিসহ জ্বর কিংবা হজমের গোলযোগ দেখা যায়। শরীরে ক্লান্তি আসে। এছাড়াও রক্ত শূণ্যতা, কিডনি সমস্যা, শ্বাস কষ্ট, জন্ডিস, খিঁচুনি, রক্তে গ্লুকোজ কমে যাওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়।

নিজেরও সচেতনতা প্রয়োজন

রোগ থেকে নিরাপদ থাকতে হলে কিছুটা নিজেরও সচেতনতা প্রয়োজন। বাড়ির বাইরে গাছের টব ও জলাধার গুলো শুকনো ও পানি শূন্য রাখা,যেসব জিনিসে বৃষ্টির পানি জমে, যেমন ফ্রিজের নিচের ট্রে, ফুলদানিতে যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা।

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা পাবেন সব ধরনের হাসপাতালে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল এবং পাহাড়ী এলাকায় ম্যালেরিয়ার প্রাদূর্ভাব বেশি তাই থানা স্বাস্থ কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক অথবা জেলা হাসপাতালগুলোতে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা পাওয়া যায়। প্রথমেই দরকার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করা। যদি ম্যালেরিয়া ধরা পরে তাহলে উদ্বিগ্ন না হয়ে, সঠিক চিকিৎসা নিলেই ম্যালেরিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

ম্যালেরিয়া নিরাময়যোগ্য রোগ অথচ এ রোগে লাখ লাখ লোক মারা যায়, রুগ্ণ হয় অসংখ্য মানুষ। ম্যালেরিয়া যেমন প্রতিরোধসাধ্য, তেমনি নিরাময়যোগ্য। আবার যথাযথ চিকিৎসা না হলে রোগের পরিণতি হয় মারাত্মক।

সাশ্রয়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা

রক্তের স্লাইড পরীক্ষা বা ডায়াগনস্টিক কিটের’ সাহায্যে চিহ্নিত হয় ম্যালেরিয়া পরজীবী ও নির্দিষ্ট প্রজাতির উপস্থিতি ও ঘনত্বের (পরিমাণগত বিচার) ওপর নির্ভর করে দেওয়া হয় চিকিৎসা। রোগীর স্বাস্থ্যের অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব যেসব অঞ্চলে, সেখানে সাম্প্রতিক একটি বড় সমস্যা হলো বেশির ভাগ ম্যালেরিয়া পরজীবী ম্যালেরিয়ার সহজ ওষুধ ক্লোরোকুইনের প্রতি রেজিস্ট্যান্ট হয়ে উঠছে। নতুন সম্মিলিত চিকিৎসা আর্টিমিসিন বেস্ড কমবিনেশন থেরাপি (ACT) বেশ কার্যকর, তবে তা প্রচলিত ওষুধ থেকে ব্যয়বহুল। ভয়ানক ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম সারির চিকিৎসা হলো, এখনো আর্টিমিসিন বেস্ড কমবিনেশন থেরাপি বা ACT।

আর্টিমিসিন ওষুধ হিসেবে যে কার্যকর এবং মলদ্বার দিয়ে আর্টিমিসিন প্রয়োগ করে ভয়ানক ম্যালেরিয়া নিরাময়ের ক্ষেত্রে বিশ্বের যেসব গবেষক অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক বিজ্ঞানী এম এ ফয়েজ, অধ্যাপক ইমরান বিন ইউনুস, অধ্যাপক রেদওয়ান ও Malaria Research Group-এর অন্যরা। বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া হলো বড় রকমের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে ভয়ানক ফ্যালসিপেরাম পরজীবীর প্রাদুর্ভাব রয়েছে। চট্টগ্রামের ম্যালেরিয়া রিসার্চ গ্রুপ এ ব্যাপারে ব্যাপক গবেষণা করেছে।

২০০৭ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের ৬০তম অধিবেশনে ঘোষিত হয়েছিল বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। সারা বিশ্ব যেন সাড়া দেয় বিশ্বের বড় সমস্যা ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে। এমনটাই আশা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার।

এএইচ/কেএইচ