আধুনিক বিশ্বে যখন বিজ্ঞানের জয় জয়কার সেখানে প্রায় ১৫০ কোটিরও বেশী মানুষের জন্য নাই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, আর প্রতি বছর শুধু পানিবাহিত রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ।
বিশ্ব পানি দিবস আজ। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘পানি-শক্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাই স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের ভিত্তি’। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ এই দিনটিকে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘ পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলনের (ইউএনসিইডি) এজেন্ডা ২১-এ প্রথম বিশ্ব পানি দিবস পালনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়। ১৯৯৩ সালে প্রথম বিশ্ব পানি দিবস পালিত হয় এবং তার পর থেকে এই দিবস পালনের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বেঁচে থাকার জন্য প্রথমে অক্সিজেন ও দ্বিতীয় উপাদান পানি অপরিহার্য। তাইতো বলা হয় পানির অপর নাম জীবন। আর এই জীবন রক্ষাকারী পানি অবশ্যই হতে হবে বিশুদ্ধ।
মানব দেহের প্রতিটি কোষ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য পানির চেয়ে কার্যকরী অপরিহার্য উপাদান আর কিছুই নেই। মস্তিস্কের ৭৫%, রক্তের৮৩%, হাঁড়ের ২২%, পেশির ৭৫% এবং ফুসফুসের ৯০%-ই পানি। অথার্ৎ মানব দেহের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশী অংশ জুড়ে রয়েছে পানি। কিন্তু সেই পানিই যদি হয় অনিরাপদ, তাহলে জীবন পড়ে যায় হুমকীর মুখে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে জীবাণুমুক্ত বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির বিকল্প নেই।
পৃথিবীর শতকরা ৭১% পানি হিসেবে থাকলেও এর মাত্র ৩% খাবার যোগ্য যার বিরাট অংশই এন্টার্কটিকা ও গ্রীনল্যান্ডে বরফ হিসেবে জমা আছে অথবা মাটির নীচে।
হিসেব করলে দেখা যায় যে, পৃথিবীর মোট পানির মাত্র ০.০১ শতাংশ মানুষের ব্যবহারোপযোগী। তাও আবার পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে।
আমাদের দেশে পানযোগ্য পানির প্রধান উৎস নদী-খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর ও জলাশয়। এক সময় এ দেশে ১ হাজারের বেশি নদী থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগই এখন মরে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ হিসাবে বর্তমানে দেশে নদীর সংখ্যা ৩১০ এ নেমে এসেছে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (হু) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষ পানি নিয়ে চরম ঝুঁকির মধ্যে বাস করছেন। কারণ বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হলেও দেশের সাড়ে নয় কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারছে না।
হু জানিয়েছে, বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর পানির উৎস ভারত থেকে বয়ে আসা অভিন্ন নদীর পানি। কিন্তু দেশটিতে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ এবং পানির প্রাপ্যতা ভয়াবহভাবে কমেছে। মানুষের পানি প্রাপ্যতা এবং অপ্রাপ্যতাও ঋতুভেদে ওঠানামা করে। বর্ষায় পানির ঢল থাকলেও গ্রীষ্ম ও শীত মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা কমে যায়।
এর প্রধান কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের কোনো নদীতেই বর্ষার পানি ধারণের ব্যবস্থা নেই। ফলে গ্রীষ্মকালে পানিপ্রবাহ কমে আসায় সমুদ্রের পানি উঠে আসছে উজানে। এতে জমির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে, পানির চাহিদা মেটাতে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন বাড়ছে। এতে পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি।
এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালে বিশ্বে যে ১৫টি দেশ সবচেয়ে বেশি ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে তাদের মধ্যে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ইরানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।
জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। একই অবস্থা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য শহরগুলোতেও। কিন্তু এক্ষেত্রে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার একসময় অনেক ভালো অবস্থানে থাকলেও সাম্প্রতিককালে এ শহরেও দেখা দিয়েছে সংকট। এমনকি উপ-শহরও গ্রামাঞ্চলেও পানি সংকট দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েরর (বুয়েট) পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রতিবছর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ২ থেকে ৩ মিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা না হলে ৫ বছর পরে প্রতিবছর ১০ মিটার করে পানির স্তর নিচে নেমে যাবে। অথচ সত্তরের দশকে যেখানে ভূ-গর্ভস্থ পানিতল ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এক মিটারেরও কম গভীরতায় ছিল, বর্তমানে তা সর্বোচ্চ ৭০ মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে।
বিএডিসি জানায়, দেশের প্রায় ১৭ লাখ শ্যালো টিউবওয়েল (শ্যালো মেশিন) দ্বারা সেচের জন্য পানি উত্তোলন করা হয়। কিন্তু ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে প্রায় ৪ লাখ শ্যালো টিউবওয়েলে পানি উঠছে না।
কারণ শ্যালো মেশিন মাটির ওপর থেকে ২৬ ফুট নিচ পর্যন্ত পানি তুলতে পারে। আর পানির স্তর আরো নিচে চলে গেলে শ্যালো টিউবওয়েল পানি তুলতে পারে না। পানির স্তর অব্যাহত নিচে নামতে থাকলে একসময় শ্যালো টিউবওয়েলে পানি উঠবে না। সেচের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার না করে বিকল্প উৎস ব্যবহার করতে হবে।
সূত্র জানায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। দৃশ্যত মরুকরণ প্রক্রিয়ার দিকে এগুচ্ছে এ অঞ্চলের সার্বিক আবহাওয়া। যা এ অঞ্চলের কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। খরা মৌসুমে রাজশাহীর নিকটবর্তী পবা উপজেলায় ১৯৮৫ সালে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ছিল গড়ে ২০ ফুট ৬ ইঞ্চি।
১৯৯৫ সালে ৩০ ফুটের নিচে ও ২০১০ সালে পানির স্তর নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ ফুটে। বরেন্দ্র অঞ্চল, বিশেষ করে রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলায় পানির স্তর প্রতি মাসে দশমিক ০০৪ থেকে দশমিক ০২৮ হারে নিচে নামছে। বর্ষাসহ বছরজুড়ে পরিমিত বৃষ্টিপাতের অভাব দেখা দিয়েছে এ অঞ্চলে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী দেশে মোট নদীর সংখ্যা ৩১০টি। অনেকের মতে, বাংলাদেশে ছোট-বড় প্রায় ৬০০টি নদী রয়েছে। এর মধ্যে ৫৭টি নদী আন্তর্জাতিক।
যার ৫৪টিই এসেছে ভারত থেকে নেমে। বাকি ৩টি এসেছে মিয়ানমার থেকে। সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ নাব্যতা হারিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে ভূ-গর্ভস্থ পানির অধিক ব্যবহার, অন্যদিকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার কারণে পানির স্তর দিনদিন ভয়াবহ হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মওসুমে নদীনালা খালবিল, পুকুরে পানি থাকে না।
ফলে এই অঞ্চলের পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। একই কারণে বিল্ডিং বা স্থাপনার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে। তা থেকে পরিত্রাণে সুপেয় পানি হিসেবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদীনালা, খালবিলের পানি সংরক্ষণ করে তা সেচসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করার উপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা যায়, পৃথিবীতে পানির মাত্র ২.৫ শতাংশ মিঠাপানি। এ মিঠাপানির ৩০.১ শতাংশ পানি থাকে ভূ-গর্ভে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি মাঠ-ঘাট, রাস্তা, জলাশয় ভেদ করে মাটির নিচে জমা হয় ও সারাবছর আমাদের পানির চাহিদা মেটায়। সূক্ষ্ম বালিকণা ভেদ করে মাটির নিচে জমা হয় বলে এ পানি হয় বিশুদ্ধ। গভীর নলকূপের পানি এতটাই নিরাপদ যে তা না ফুটিয়েই খাওয়া যায়।
তবে বর্তমানে দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, দেশে ক্রমাগত ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে ভূ-গর্ভে পানি জমা হওয়ার যে হার তার চেয়ে অধিক পরিমাণে পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত চাহিদা ছাড়াও আরো বিভিন্ন কারণে পানির অপ্রাপ্যতা দেখা দিয়েছে।
অপরিকল্পিত নগররায়নের ফলে শহরগুলো হয়ে উঠছে কংক্রিটের শহর। যার ফলে পানি মাটি ভেদ করে নিচে পৌঁছাতে পারছে না। ইটের তৈরি ভবন গড়ে ওঠায় বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি মাটি শোষণ করে নিতে পারে না। এর আগেই তা খাল বা নদী নালায় চলে যাচ্ছে। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই বন্যা দেখা দেয়ার এটাও একটা কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূ-গর্ভস্থ পানির বিকল্প ছাড়া এ অবস্থা থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ নেই। ভূ-গর্ভস্থ পানির বিকল্প হিসেবে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে, পুকুর, লেক বা নদী বৃদ্ধি করে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে হবে। অতিমাত্রায় পানি তুললে এই উৎসটি আর নবায়ন যোগ্য থাকে না। তাই অতিমাত্রায় পানি তোলা বন্ধ করতে হবে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী দেশে মোট নদ-নদীর সংখ্যা ৩১০টি। এরমধ্যে মৃত ও মৃতপ্রায় নদীর সংখ্যা ১১৭টি। অনেকের মতে, নামবিচারে বাংলাদেশে ছোট-বড় নদী রয়েছে প্রায় ৬০০টি। এর মধ্যে ৫৭টি নদী আন্তর্জাতিক। ৫৪টির উত্সস্থল ভারত এবং বাকি ৩টির মিয়ানমারে।
২০ বছর আগেও মৃত নদীর সংখ্যা ছিল অর্ধেক। সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ নাব্যতা হারিয়েছে।
ওএফ





