আজ ৮ই মে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি দিবস। মানবতার সেবায় সর্বদা নিয়োজিত আন্তজার্তিক সংগঠন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি।

১৮৫৯ সালের ২৪ জুন ইটালির উওরাঞ্চলের পল্লী প্রান্তরে সলফিয়া নামক স্থানে ফ্র্যান্স ও অষ্ট্রিয়ার মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়, তাতে টানা ১৬ ঘন্টা যুদ্ধের পর একদল মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে আর অন্য দিকে বিজয়ী দল উল্লাস করছে। সে যুদ্ধে প্রায় ৪০/৪২ হাজার সৈনিক বিভিন্ন ভাবে আহত হয় , যা এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য।

জীন হেনরি ডুনান্ট সুইজারল্যান্ডে এক ব্যাবসায়িক যুবক,সে কাজের জন্য ফ্র্যান্সের তৃতীয় নেপোলিয়ান এর সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলেন, পথি মধ্যে মানব সমাজের প্রতি এহেন অবজ্ঞা দেখে মানব সেবী ডুনান্ড সহ্য করতে পারেননি। তাই তিনি ব্যাবসায়িক কাজ বাদ দিয়ে আশে পাশের গ্রাম থেকে লোক জড়ো করতে লাগল এবং তাদের নিয়ে আহতদের সেবা সুস্থতা করতে লাগলেন । তাতে অধিকাংশই মহিলা ছিল ।  

সে সব মহিলা ই রেড ক্রস সোসাইটির প্রথম সদস্য। তিনি যুদ্ধের বিভিষীকাময় স্মৃতি তার প্রতিকার করার জন্য ১৮৬২ সালে “ এ মেমোরি অফ সলফেরিনা ”নামক একটি বই রচনা করেন,যাহার মূল ভাষ্য ছিল বিশ্ব বিবেকের কাছে মানবিক আবেদনটি সৃষ্টি করা, যা তিনি করতে সক্ষম হন ।

জেনেভার একটি সমাজ সেবা মূলক সংগঠন‘পাবলিক ওয়েল ফেয়ার সোসাইটি ” হেনরি ডুনান্ট এর আহ্ববানে এগিয়ে আসেন। হেনরি ডুনান্ড এর জন্য ১৮২৮ সালের ৮ মে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে। ১৮৬৩ সালে ৯ ফেব্রুয়ারী ডুনান্ড ৪ জন জেনেভাবাসিকে নিয়ে “কমিটি অফ ফাইভ ” নামে একটি কমিটি গঠন করেন । যার পরবর্তী নাম হয় আন্তজার্তিক রেড ক্রস কমিটি বা (আই সি আর সি) ।

১৯৬৩ সালে প্রথম বারের মত এ কমিটি ১৬ টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে জেনেভায় আন্তজার্তিক সম্মেলন আহ্ববান করে। এ সম্মেলনে হেনরি তার মহতী উদ্যেগ ও প্রস্তাব গূলো উপস্থাপন করার পর পর্যালোচনার পর গৃহিত হয় এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে রেড ক্রস নামে আন্তজার্তিক সেবা মূলক ও নিরপেক্ষ সংস্থা হিসাবে গঠিত হয় ।  

১৯৬৫ সালে অক্টোবর মাসে ভিয়েনায় ২০ তম আন্তজার্তিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের মূলণীতি সমুহ এক সভায় সর্ব সম্মতি ক্রমে গৃহীত হয় এবং বর্তমান বিশ্বে সর্ব শ্রেষ্ট মানব সেবা মূলক সংস্থার রেড ক্রস এর আবির্ভাব ঘটে।

১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তান রেড ক্রস সোসাইটি পূর্ব পাকিস্তান নামে যে সংগঠন ছিল তা বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি নামে আত্বপ্রকাশ করে ।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করেন এবং বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনের আওতায় আসে। তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার আইন করে বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি প্রতিষ্টা করে যা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয় ।

যদিও বা এ মানবিক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান টি ১৯২০ সাল থেকে বাংলাদেশের ভূখন্ডে ব্যবহৃত হয়ে আসছে । ১৯৮৮ সালে ৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি আদেশ বলে এর নাম বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি নামকরন করা হয় ,যার সদর দপ্তর ঢাকায় অবস্থিত।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ সোসাইটি প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকবে এবং অন্যান্য সম্পাদকীয় পদ সমূহ নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠিত হয় ।

প্রতিটি জেলা, সিটি কর্পোরেশনের ৬৮ টি ইউনিটে রয়েছে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সরকারের প্রধান সহযোগী সাহার্য্য সংস্থা হিসাবে নিয়োজিত থেকে প্রত্যেক ইউনিটের স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মকর্তার সহযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বিভাগের আওতাধীন অধিদপ্তর সমূহ জনসেবা ও কল্যাণ মূলক কাজ করে থাকে ।  

যদিও এ সংগঠনের কাজ ছিল মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবা ও নিহতদের সৎকার করা, কিন্তু বর্তমান বিশ্বে এর সেবা ও কর্ম পরিধি ব্যাপক আকার ধারন করেছে।

হেনরি ডুনান্ড এর আদর্শে অণূপ্রানিত হয়ে কোটিকোটি মানব সন্তান বিপন্নতা বিশ্বের পাশে এসে নির্বিগ্নে কাজ করে যাচ্ছে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষ কে এক কাতারে এক পতাকা তলে এক কর্মসূচীতে আবদ্ধ করতে পেরেছেন ।

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংঘঠিত দূর্যোগ, প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা,অগ্নিকান্ড, ভূমিকম্পে ভবনধস সহ বিভিন্ন সহযোগিতা মূলক কাজ আসছে।

১৯৭০ সালে প্রলয়ঙ্কন ও ঘূর্ণিঝড়ে জলোচ্ছাসে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত ও প্রাণহানি     ঘটেছিল,১৯৭২ সালে সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচী ( সিপিপি) চালু করেন।

১৯৭১ সাল থেকে সমাজ ভিত্তিক দূর্যোগ মোকাবেলা কর্মসূচীর মাধ্যমে গণ মানুষের সেবায় নিরলস ভাবে কাজ হয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে সংগঠিত শতাব্দির ভয়াবহ প্রলয়নকরী বন্যায় এ সংগঠন যেভাবে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন তাতে ই সারা বিশ্বের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন ।

সম্প্রতি আমাদের দেশে বেশ কিছু ঘটনা ঘঠেছে তাতে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব অত্যান্ত গুরুত্বের সহিত পালন করেছেন।

আসুন জেনে নেই এ সংগঠনের মূলনীতি সমূহ কি কি:

ক) মানবতা :

যুদ্ব ক্ষেত্রে আহতদের সাহায্যর উদ্দেশ্য সৃষ্ট আন্তজাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলন জাতীয় ও আন্তজার্তিক ক্ষেত্রে সর্বত্র বিপন্ন মানুষের দু:খ দূদর্শা প্রতিরোধ ও উপশম করার চেষ্টা,জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার এবং সকল জাতির মধ্যে বন্ধুত্ব,শান্তি প্রতিষ্টার পথ সুগম করা।  

খ) পক্ষপাতহীনতা:

এ সংগঠন তাদের নির্ধারিত আন্দোলনে কোন জাতি গোত্র ধর্মীয় বিশ্বাস বা রাজনৈতিক মতবাদ বৈষম্য তৈরী করে না। সর্বদা বিপদাপন্ন মানুষের কষ্ট লাগবের সব দিককে অগ্রাধিকার প্রদান করে।

গ) স্বাধীনতা:

মানব সেবা কাজে নিজেদের সরকারের সহযোগী সংস্থা বিধায় সকল বিষয়ে স্বাধীন মতামত এবং নিজ নিজ আইনুণীতি মালা অনুযায়ী কাজ করতে থাকে।

ঘ) সেবামূলক সেবা :

এ সংপঠন একটি স্বেচ্ছাসেবা মূলক ত্রান আন্দোলন হিসাবে নিয়োজিত,কোন কিছুর বিনিময়ে সেবা চালিয়ে যাওয়া তাদের উদ্দেশ্য নয়।

ঙ) একতা :

এ সংগঠনের উদ্দেশ্য একটাই আর তাই সকল কে সব ধরনের সেবা প্রদান করে থাকে।

চ) সার্বজনীনতা :

সমান দায়িত্ব কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপি সমমর্যাদা সম্পন্ন আন্দোলন সার্বজনীন ভাবে স্বীকৃত।

জীন হেনরি ডুনান্ড রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি প্রতিষ্টার জন্য সর্ব প্রথম শান্তি পুরস্কার লাভ করেন । আর তাই ৮ মে তার জন্য দিনকে প্রতি বছর রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

এসএইচ