২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। এই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচন বর্জন করে।
এ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার ফলে এবারের নির্বাচনে সাড়া দেশের মোট ৯,১৯,৬৫,৯৭৭ ভোটারের মধ্যে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান ৪,৩৯,৩৮,৯৩৮ জন।
এ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রগুলো সকাল থেকেই ছিল ফাঁকা। কয়েকটি আসনের ৪১টি কেন্দ্রে কোনো ভোটই পড়েনি সারা দিনেও।
নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন আনসার সদস্য, একজন আওয়ামী লীগ কর্মী ও একজন পথচারী ছিলেন। বাকিরা বিএনপি ও জামায়াত কর্মী। ভোটের দিন এতসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি এর আগে দেখা যায়নি।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় ১৮২ জন।আহত হন পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ।
ওদিকে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এক বিবৃতিতে জানায়, ২৫শে নভেম্বর থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সহিংসতায় ১৪৯ জন নিহত এবং ৪৮৮৬ জন আহত হন।এসময় ৫৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে শিকার হন বলেও তথ্য প্রকাশ হয়। (তথ্য সূত্র-মানবজমিন ৪ জানুয়ারি ২০১৫)
নির্বাচনপূর্ব সহিংসতার দিক থেকেও এই নির্বাচন অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনুষ্ঠিত আসনগুলোর ভোটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়। চূড়ান্ত হিসাবে, সারা দেশের ১৩৯টি আসনে গড়ে ৪০ দশমিক ৫৬ শতাংশ ভোট পড়ে।
এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলে আসছেন, দশম সংসদের এ সরকারকে কেউ স্বীকৃতি দেয়নি। তারা (সরকার) দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে শতকরা ৫ ভাগ মানুষের ভোট পায়নি।
তিনি আরো বলেন, একদলীয় নির্বাচন জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বর্জন করেছেন, ঘৃণাভরে প্রহসনের ভোট প্রত্যাখ্যান করেছেন। নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে। (তথ্য সূত্র : আমাদের সময়, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪)
একতরফা ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর বিরোধী দল আন্দোলন করেছে, মামলা-মোকদ্দমায় আসামি হয়েছে, গুম হয়েছে, ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে, সর্বোপরি বিরোধী দল আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, প্রহসনের নির্বাচন তারা মেনে নেয়নি।
এ নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে, এটা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। সময় গড়িয়ে চলে এলো ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিকে সরকার গণতন্ত্র রক্ষা দিবস পালন করতে চাইলেও বিএনপি এটাকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করার উদ্যোগ নেয়।
সে দিনও খালেদা জিয়াকে গুলশান অফিস থেকে বের হতে দেয়া হয়নি পুরনো কায়দায় সেই বালুর ট্রাক।বালুর ট্রাক সম্পর্কে সরকারি মুখপাত্র (মন্ত্রী) বলেছেন যে, ‘খালেদা জিয়া বাড়ি মেরামতের কাজের জন্য বালুর ট্রাক এনেছে।’ অন্য দিকে ট্রাকের ড্রাইভার-হেলপাররা বলেছেন, ‘পুলিশ আমাদের কেন ধরে এনেছে তা আমরা জানি না।’
জনসভায় যোগ দেয়ার জন্য অফিস থেকে বের হতে না পেরে তিনি বাধ্য হয়ে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন যা ৯৩ দিন অবদি চলে।অনেক ঘটনা অঘটনের মাধ্যমে ২০১৬ অতিক্রম করলেও ‘গণতন্ত্র’ আর আলোর মুখ দেখতে পায়নি।
কারণ ২০১৫-১৬ দুটো বছরই ছিল স্থানীয় সরকার অর্থাৎ ইউপি, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচন।সে নির্বাচনও ছিল মানুষ হত্যার নির্বাচন। সংঘর্ষেঅন্তত ১৪৫ জন নাগরিক ইউপি নির্বাচনে হত্যা হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন যে, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।’
২০১৬ সালে দিনটিকে ঘিরে উত্তেজনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দুই দলই শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করে। ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারিতেও বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি না পেয়ে সমাবেশ করেছে নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে।
২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের প্রতিশ্রুতি দেয় দুই দল। ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ওইদিন ঢাকাসহ সারা দেশে শান্তিপূর্ণভাবে বিজয়োৎসব পালন করে। অন্যদিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে ওইদিন বিএনপি সারা দেশে ‘কালো পতাকা’ মিছিল করে।
অবশ্য ৫ জানুয়ারি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ আদালতে হাজিরার দিন ধার্য থাকায় দুই দিন পর ৭ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিল দলটি।
৫ই জানুয়ারি উপলক্ষে বিএনপির কর্মসূচিকে ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস এলাকায় জলকামান, রায়টকার, এপিএসসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়ন করা হয়।
সমাবেশের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কর্তৃপক্ষ পিডব্লিউডি এবং সমাবেশের নিরাপত্তা ও মাইক ব্যবহারের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনের (ডিএমপি) কাছে অনুমতি চেয়ে চিঠি দেয় বিএনপি। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পিডব্লিউডি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহারের অনুমতি দিলেও ডিএমপি থেকে সমাবেশের অনুমতি দেয়নি।
এর প্রতিবাদে এবং গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে রবিবার ঢাকা মহানগরীর থানায় থানায় এবং দেশব্যাপী জেলা সদর ও মহানগরগুলোতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।
সমপ্রতি ৭ জানুয়ারির সমাবেশ নিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, "আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার জন্য পুলিশের কাছে বার বার আবেদন করেছি। আমাদেরকে দেয়া হয়নি। কিন্তু সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে এরশাদের মত রাজাকারদেরকে। তাই ভবিষ্যতে সমাবেশ করার জন্য বিএনপি পুলিশের অনুমতির অপেক্ষা করবে না, কেড়ে নেয়া হবে।"
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণতন্ত্র নয় বিএনপির নেতাকর্মীদের রক্ত চান মন্তব্য করে তিনি বলেন, "বিএনপির নেতাকর্মীদের লাশ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে শেখ হাসিনা আনন্দিত হন, উল্লাস করেন।"
বিএনপিরর এই নেতা বলেন, "বর্তমান অবৈধ সরকারের শামনকালে প্রকৃত অপরাধীরা সব সময় প্রশ্রয় পেয়ে যাচ্ছেন। যার কারনে, তনু, মিতু, সাগর-রুনীসহ- কোন হত্যাকান্ডের বিচার হচ্ছে না।"
আর সমপ্রতি আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, "বিএনপি নেতা রিজভী আহমেদের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়েছে তারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চান।"
তাই সব ধরনের নৈরাজ্য ও অগণতান্ত্রিক পথ থেকে ফিরে এসে বিএনপিকে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ড. হাছান।
ড. হাছান মাহমুদ বলেন, "গত তিন বছরে সরকার জনগণকে উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার চেয়েও অনেক বেশি দিয়েছে। দেশ আজ স্থিতিশীল।"
সমপ্রতি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান ৫ জানুয়ারী নিয়ে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, “বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী দেশের জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে নির্বাচনের প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ করে গণতন্ত্র হত্যা করেছে। এ দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।”
এমবি





