‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সুর্যাস্তের জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়’।

৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ আসাদের রক্তাক্ত জামার চিত্র ``আসাদের শার্ট`` কবিতায় এভাবেই তুলে ধরেন কবি শামসুর রহমান।

২৪ জানুয়ারি মহান গণ-অভ্যুত্থান দিবস। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারী এই দিন তত্কালীন স্বৈরাচারী আইয়ূব সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকা ঐতিহাসিক ১১দফা আন্দোলনের হরতাল চলাকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনের সড়কে পাকিস্তানের পুলিশের গুলিতে প্রথম শহীদ হন কিংবদন্তিতুল্য অকুতোভয় এই ছাত্রনেতা। সে দিন থেকে দিনটি শহীদ আসাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আজ আসাদুজ্জামানের ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এ দিনটি একটি স্মরণীয় দিন ।

শহীদ আসাদ আসাদের পুরা নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি ১৯৮২ সালের ১০ জুন হাতিরদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আলহাজ্ব মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের বিএবিটি হাতিরদিয়া সাদত আলী হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে তখন কর্মরত ছিলেন। সাবেক ঢাকা জেলার, বর্তমানে নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামের এক ঐতিব্যবাহী সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের জন্ম স্থান তার।

শহীদ আসাদ পিতার শিক্ষকতাধীনে শিবপুর পাইলট হাই স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন। ১৯৬০ সনে মেট্রিকুলেশন পরে ঢাকায় জগন্নাথ কলেজে বড় তিন ভাইকে অনুসরন করে বিজ্ঞান পড়ার জন্য এইচএসসি ভর্তি হন এবং এখানে এক বছর লেখাপড়া করেন। পরে সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজে গিয়ে আইএসসি ভর্তি হন। উক্ত কলেজে পড়া অবস্থায়ই আসাদ ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শুধু তাই নয় সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করার উদ্দেশ্যে পরিবারের অজ্ঞাতে বিজ্ঞান পড়া ছেড়ে দিয়ে আইএসসি ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে ঐ কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্সসহ বিএ ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৬৬ সালে বি,এ (অনার্স) এবং ১৯৬৭ সালে এম,এ ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা সিটি ল কলেজে এল,এল, বি কোর্সে ভর্তি হন। ফলাফল আশানুরুপ না হওয়ায় ঐ বছরেই দ্বিতীয়বার মানোন্নয়ন-মূলক এমএ পরীক্ষা দেন। কিন্তু জীবদ্দশায় এই পরীক্ষার ফলাফল আসাদ দেখে যেতে পারেননি।

১৯৬৮ সালের নভেম্বরে ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে সূত্রপাত হওয়া আন্দোলন ক্রমশ আইয়ুবের পতনকে কেন্দ্র করে এগোতে থাকে। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে ঊনসত্তরের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ এবং মতিয়া গ্রুপ) ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নেতারা ছাত্র সংগ্রাম কমিটিগঠন করে এবং এগারো দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কিত ছয় দফার সঙ্গে ছাত্র সমস্যাকেন্দ্রিক দাবি দাওয়া এবং কৃষক ও শ্রমিকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৬৯ সালে ১৭ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটির সমাবেশ থেকে ১১ দফা দাবিতে এবং পুলিশ-ইপিআর বাহিনীর ছাত্র-জনতা ওপর বর্বর নির্যাতনের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারী পূর্ণ দিবস হরতাল কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। এদিন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ডাকা হয়। গর্ভনর মোনায়েম খান ওই দিন ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেন। ১১ দফা দাবিতে প্রায় ১০ হাজার ছাত্রে বিশাল মিছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে পুলিশ বাধার মুখে পড়ে। আসাদসহ কিছু ছাত্র ছাত্রভঙ্গ মিছিলটি আবার সংগঠিত করে ঢাকা হলের (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করেন। এ সময়ই পুলিশের গুলিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কে আসাদ শহীদ হন।

পরে রাজপথে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেমন) গ্রুপ এ নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল শাখার সভাপতি আসাদের মৃত্যু আন্দোলনের অগ্নিশিখা জ্বল উঠে। শহীদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে পরদিন রাজধানী ঢাকায় বের হয় স্মরণকালের বৃহত্তর শোক মিছিল, যে মিছিলের সামনে ছিল শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট। মিছিলটি বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয় প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা। আসাদের রক্ত আর বিক্ষুদ্ধ জনতা সেই সময়ই ছুটে যাওয়া মোহাম্মদপুর তৎকালীন আইয়ূব গেটের সামনে এবং প্রতিবাদের ক্ষুদ্ধ প্রতীক হিসাবে আইয়ূব গেটের নামফলক গুড়িয়ে দিয়ে রক্ত দিয়েই লেখে আসাদ গেট। সেই থেকে মোহাম্মদপুর আসাদ গেইটের জন্ম।

ওই সময় আসাদের শার্ট হাতে নিয়ে জনতাদীর্ঘ মিছিল দেখে কবি শামসুর রাহমানও লেখেন তার বিখ্যাত কবিতা “আসাদের শার্ট” গুচ্ছ গুচ্ছ রক্ত কবরীর মতো কিংবা সূর্যোস্তের জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট-উড়ছে হাওয়ায়-নীলিমায়।

এমই