প্রায় পাঁচ মাস আগে উত্তর নাইজেরিয়ার সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠী নামে পরিচিত বোকো হারাম বোর্ণো রাজ্যের চিবুক থেকে দুইশ'র উপর স্কুলছাত্রী অপহরণ করে। তারা এপ্রিলের ১৪ তারিখে অপহৃত হওয়া সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি। বোকো হারামের বিদ্রোহ ঠেকাতে এবং সাববাসিয়া বনে জিম্মি করে রাখা চিবুক বালিকাদের উদ্ধার করতে নাইজেরিয়ার সাথে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইসরায়েলের প্রচেষ্টায় যেনও কোনো কাজ হচ্ছে না।

অধিকন্তু নাইজেরিয়ার একত্রীকরণ এবং স্থানীয় সার্বভৌমত্বের ভয় দেখিয়ে সহিংস প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে বোকো হারাম।

জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে দেখে মনে হচ্ছে প্রয়োজনীয় অস্ত্র-সস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং সঠিক প্রেরণার অভাবে এই দলের সাথে জয়লাভ করতে পারবে না।

সম্প্রতি বোকো হারাম বোর্ণো রাজ্যের গোজায় রাজত্বের ঘোষণা দিয়েছে। দলটি বিভিন্ন স্থানে তাদের কালো-সাদা পতাকা উড়িয়ে সংক্ষিপ্ত মৃত্যুদণ্ড কর্যকর করে পুরো গোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া এক ভিডিও বার্তায় বোকো হারামের প্রধান আবু বকর শিকাও বলেছেন, "গোজায় আমাদের ভাইদের বিজয় দেওয়ার জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ, এটা এখন ইসলামিক খলিফার একটি অংশ। গোজা এখন নাইজেরিয়ার কিছুই না।"

এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে গোজা অনেক আগেই বোকো হারামের নিয়ন্ত্রণে গেছে। এছাড়া দামবোয়াও তাদের অধীনে ছিল। কিন্তু নাইজেরিয়ার মিলিটারি এটা ফিরিয়ে নিয়েছে। দক্ষিণ বোর্ণোর গোজার আশপাশ জয় করেছে এই গোষ্ঠী।দক্ষিণের মতো উত্তর বোর্ণোর বড় একটা অংশ এবং বুনি আদির এক অংশ তারা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে।

রাজত্ব ঘোষণার মাধ্যমে আফ্রিকায় এই প্রথম কোনো ইসলামিক সংগঠন যা ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। বোকো হারাম পূর্ব সিরিয়া এবং উত্তর ইরাকেরও বিশাল অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

বোকো হারামের আক্রমণের ফলে উত্তর নাইজেরিয়ায় চার রাজ্যের পনের স্থানীয় সরকার দুইবার করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে। এই অবস্থা সত্ত্বেও বোকো হারাম তাদের দলকে নাইজেরিয়া, তার জনগণ এবং পশ্চিমা মিশনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী করছে।

গোষ্ঠীর উদ্ভব

একটি অপ্রকাশিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-নাইজেরিয়ার উদ্বিগ্ন যুবকরা ছোরা এবং লাঠির মতো বিভিন্ন অস্ত্র হাতে এই বিদ্রোহী দলকে দমনের উদ্দেশ্যে জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর পরিপূরক হিসেবে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে সংগঠিত হচ্ছে।

এটা উত্তর নাইজেরিয়ার প্রতিটি রাজ্যে বিস্তৃতি লাভ করেছে। কিন্তু বিশেষ করে বোর্ণো রাজ্যের সবচেয়ে বড় শহর মাইদুগুরিতে পাঁচশ'র মতো যুবক প্রহরীর ন্যায় কাজ করছে। তারা "সিভিলিয়ান জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স" অথবা "ইয়ান গোরা" নামে পরিচিত। তারা বোকো হারাম সদস্যদের সম্প্রদায়ের মধ্যে নিয়ে আসছে।তারপর হত্যা করছে অথবা জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করছে। বোর্ণো রাজ্যে এই দলের প্রায় প্রত্যেক সদস্য প্রতি মাসে ১১৩ ডলার সরকারি সহায়তা লাভ করে।

যুদ্ধে বোকো হারামের কাছে হারছে নাইজেরিয়া?

"সিভিলিয়ান জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স" এবং জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সবসময় ভালো সম্পর্ক থাকে না কারণ পুলিশ প্রায়ই এই যুবকদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়। সম্প্রতি একটি আন্দোলনে অনেক যুবক সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। তারা বলে-"বোকো হারামই প্রকৃত সৈনিক, তারাই সৈনিকদের কর্তা"।এই আন্দোলনে অন্তত দুই যুবক নিহত এবং অনেকে আহত হয়।

বোকো হারামের বিরুদ্ধে কিছু সাফল্যের দলিল দেখিয়েছে 'সিজেটিএফ'।২০১৪ সালের মার্চে তারা অন্তত ২০৭ বোকো হারাম সদস্যকে হত্যা করেছে। এদিকে বোকো হারামের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে এই দল। ২০১৩ সালে অন্তত ১০০ যুবকে হত্যা করেছে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী।

রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতার এবং স্থানীয় জনগণ এই যুবকদের চেষ্টাকে প্রশংসা করছে। এদিকে দেশটির রাষ্ট্রপতি তাদেরকে "জাতির নতুন নায়ক" বলে ঘোষণা দিয়েছে।

সাথে সাথে তিনি বলেন, এই দল বিভিন্ন সমস্যাও সৃষ্টি করছে, রাষ্ট্র তাদের কাজ আইনের আত্ততায় না আনলে নতুন সেনাবাহিনী হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। যুবকদের এই কাজে বোকো হারাম সাধারণ মানুষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে ভেবে তারা উদ্বিগ্ন হচ্ছে।

সার্বিক দিক থেকে বোকো হারামের এই হুমকির বিরুদ্ধে নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা সংস্থার ভেতর বুদ্ধিমত্তার উন্নতি করা উচিত।আক্রমণের জন্য যে পরিকল্পনা তারা করে এটা ফলপ্রসূ হওয়ার পূর্বেই বিনষ্ট করার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে অনেক বেশি সক্রিয় হতে হবে।

শুধু এই বাহিনী দিয়েই যু্দ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব হবে না। যুবকদের বেকারত্ব এবং নিরাশার মতো জরুরি বিষয়কে চিহ্নিত করতে হবে। সহজেই রাজনৈতিক বিষয়ে তারা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হতে না পারে এটা প্রতিরোধ করতে হবে।

অধিকন্তু, মিলিটারি অভিযানের পাশাপাশি বোকো হারামের বিরুদ্ধে কোনো মতাদর্শগত প্রতিরোধ নেই। আহমেদ সালকিদা যুক্তি দিয়ে বলেন, বোকো হারাম একটা যুক্তিগত সমস্যা এটাকে মোকাবিলা করতে হলে গভীর যুক্তিসংগত পাল্টা যুক্তি দিতে হবে।

এই মুহূর্তে নাইজেরিয়ার জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে।"ইবলো'র" কারণে এই অবস্থা আরও তীব্র হয়েছে। এই সমস্যাগুলোর কারণে বর্তমান সময় একজন নাইজেরিয়ানের নিকট অত্যন্ত খারাপ।

লেখক: ডেনিয়েল এজিগবা এগবিবোয়া, আন্তর্জাতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেম্ব্রিজ এবং অক্সফোর্ডের পণ্ডিত। এছাড়া আফ্রিকান ইউনিয়নের পরামর্শক ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনালের প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা প্রোগ্রামে কাজ করছেন।