বিশ্বের আন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও আজ ৩১ মে পালিত হচ্ছে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'সাদামাটা মোড়ক-তামাক নিয়ন্ত্রণে আগামী দিন'।
ধূমপানের কারণে আমাদের সমাজের মধ্যধেকে আকালেই ঝরে পড়ছে তাজা প্রাণ। যেকোনো নেশা শুরু হয় ধূমপান দিয়ে, শেষ হয় মাদকতায়। অনেকে বলে এটি নাকি তাদের দুশ্চিন্তা কমায়। আসুন জেনে নেই ধূমপানের কারনে আমাদের কি কি সমস্য হতে পারে।
ধূমপান ও ক্যানসার: চিকিৎসকদের বইয়ের প্রতিটি রোগের কারণ হিসেবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধূমপানের কথা লেখা আছে। কাজেই বোঝা যায় কেমন মারাত্মক এটি। তবে ক্যানসারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে ধূমপান জড়িত। সিগারেট-বিড়িতে ৬৫ রকমের বেশি ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৩ ভাগ ক্যানসারের কারণ ধূমপান। ধূমপানের ফলে সবচেয়ে বেশি হয় ফুসফুসের ক্যানসার। প্রতিবছর বিশ্বে ১৩ লাখ লোক মারা যায় ফুসফুসের ক্যানসারে। এ ক্যানসারের শতকরা ৯০ ভাগ কারণ ধূমপান।
এ কারণে হতে পারে মুখ, গলা, গলবিল, খাদ্যনালি, অগ্ন্যাশয়, পাকস্থলী, যকৃত, মূত্রথলি, বৃহদান্ত্র ও মলাশয়, স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসার। গবেষণায় দেখা গেছে, অধূমপায়ীদের চেয়ে ধূমপায়ীদের ফুসফুসে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা ১০ গুণ এবং মুখ, গলা, অন্ননালি, অগ্ন্যাশয়, কিডনি, মূত্রথলি, জরায়ুমুখ ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বেশ কয়েক গুণ বেশি।

ধূমপান ও হৃদরোগ: ধূমপান করলে রক্তে মোট কোলেস্টেরল ও খারাপ কোলেস্টেরলের (এলডিএল) মাত্রা বেড়ে যায় এবং কমে যায় ভালো কোলেস্টেরল এইচডিএলের মাত্রা। এতে করে রক্তনালিতে চর্বি জমে গিয়ে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপায়ীদের ৪০ বছরের পর হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা পাঁচ গুণ বাড়ে। হৃদরোগ হওয়ার আশঙ্কা অধূমপায়ীদের চেয়ে দ্বিগুণ।
ধূমপান ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ: ধূমপায়ীরা ২০-৩০ বছর পর শ্বাসকষ্টের রোগে আক্রান্ত হন। মারাত্মক ধরনের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এমনকি হাসপাতালে ভর্তিও থাকতে হয়। শ্বাসকষ্টের এ রোগটির নাম সিওপিডি।
শ্বাসনালির সংক্রমণও বাড়ায় ধূমপান। গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপায়ীদের যক্ষ্মা হওয়ার আশঙ্কা দুই থেকে চার গুণ বেশি। প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণে বেশি আক্রান্ত হয় এরা। এ ছাড়া ঘন ঘন ফুসফুসের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়।

ধূমপান ও গর্ভস্থ শিশু: ধূমপানের ফলে মায়ের পেটের শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গর্ভাবস্থায় ধূমপান করলে অ্যাবরশন হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। বাচ্চার ওজন কম হতে পারে, আক্রান্ত হতে পারে অ্যাজমায়। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু মা-বাবার ধূমপানে আমেরিকার দুই থেকে তিন লাখ শিশু শ্বাসনালির প্রদাহে আক্রান্ত হয়ে ১৫ হাজার হাসপাতালে ভর্তি হয়। এ ছাড়া কোনো কারণ ছাড়াই মারা যেতে পারে শিশু।
সেকেন্ডহ্যান্ড বা পরোক্ষ ধূমপান বেশি ক্ষতিকর: আশপাশের ধূমপায়ীদের ধোঁয়া ক্ষতি করে চলেছে আপনার অগোচরে। একে বলে সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোকিং। গবেষণায় দেখা গেছে, ফুসফুসের ক্যানসারের ১০ শতাংশ রোগী কখনই ধূমপান করেননি। এরা আক্রান্ত হয়েছেন সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোকিং থেকে। এ ছাড়া এদের ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকি ২০-৩০ ভাগ, হৃদরোগের ঝুঁকি ২০-৩০ ভাগ। তাই আপনার আশপাশের ধূমপায়ী হতে সাবধান হোন।
ধূমপান ও মাদক: যেকোনো নেশা শুরু হয় ধূমপান দিয়ে, শেষ হয় মাদকতায়। এটা গবেষণা করেই বলেছেন বিজ্ঞানীরা। ধূমপায়ীরা খুব সহজেই অধূমপায়ীদের চেয়ে দ্রুত মাদক নিতে শুরু করে। আমরা বর্তমানে মাদক নিয়ে বেশ সচেতন। কিন্তু এর প্রবেশদ্বার বন্ধ করতে রাজি নই। অনেকে কৌতূহলের বশে বন্ধুদের সঙ্গে মেশার সময় সিগারেটে এক-দুই টান দেয়। বন্ধুরাও জোরাজুরি করে। কৌতূহলের বশে এক টানই কিন্তু আপনাকে নিয়ে যাবে মাদকের জগতে। তাই সাবধান! যারা সিগারেট টানতে বলে, তারা কিন্তু ভালো বন্ধু নয়।
সিগারেট ও দুশ্চিন্তা মুক্তি: ধূমপায়ীরা কেন ধূমপান করেন জানতে চাইলে বলেন, এটি নাকি তাদের দুশ্চিন্তা কমায়। এটি ধূমপান জায়েজ করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। দুশ্চিন্তা কমে ধূমপানে, এমন কোনো গবেষণালব্ধ ফল জানা যায় না। উল্টো ধূমপানে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়িয়ে দেয়। এটি টেনশন বা অবসাদ আরো বাড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তামাকের ব্যবহার কমাতে প্লেইন প্যাকেজিং বা সাদামাটা মোড়ক অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। যাতে সব তামাক পণ্যের মোড়কের রং একই রকম হয়, কম্পানির লোগো, রং কিংবা ব্র্যান্ডের ছবি এবং কোনো প্রকার প্রচারণামূলক তথ্য থাকে না। এতে করে তামাকের প্যাকেট অত্যন্ত অনাকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিগারেটের একটা টানে ৩ হাজারের অধিক রকম রাসায়নিক পদার্থ ঢুকে যায় ধূমপায়ীর শরীরে। এর মধ্যে প্রধান হলো নিকোটিন। এই নিকোটিনই ধূমপান ছাড়তে দেয় না।
বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের আড়াই কোটিই ধূমপায়ী। জর্দা, সাদা পাতা, গুল হিসাবে আনলে এ সংখ্যা ৪ কোটি ১৩ লাখ। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে তামাক সেবন কমছে, সেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাক সেবন ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হারে প্রতিবছর বাড়ছে। ধূমপানের কারণে আকালেই ঝরে পড়ছে তাজা প্রাণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,বিশ্বে প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন, প্রতিদিন ১৫ হাজারের অধিক এবং প্রতিবছর ৬০ লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
তামাকজনিত মৃত্যুর এ ধারা কমিয়ে আনতে বিশ্ববাসী একজোট হয়ে প্রণয়ন করেছে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি), যা জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে পৃথিবীতে প্রথম আন্তর্জাতিক চুক্তি হিসাবে স্বীকৃত।
এফসিটিসির কয়েকটি ধারার আংশিক অনুসরণে সরকার ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫’ পাস করে। ২০০৬ সালে এর বিধিমালা জারি করা হয়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের সুপারিশের প্রেক্ষিতে সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে টাস্কফোর্স গঠন করে। পাশাপাশি সারাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন করে।
বাংলাদেশে ২০০৯ সালে পরিচালিত গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) অনুযায়ী, ৪৩.৩% (প্রায় সোয়া ৪ কোটি) মানুষ বিভিন্নরকম তামাক ব্যবহার করে। তামাকজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। বর্তমানে লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে মারা যাচ্ছে।
ধীরগতিতে হলেও সরকার ২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল আইনের সংশোধনী পাস করে। কিন্তু বিধিমালা পাস করতে দু’বছর বিলম্বিত হয়। অবশেষে ২০১৫ সালের ১৫ মার্চ সরকার বিধিমালা পাস করে।
বিশ্বের অন্যান্য ৭৭টি দেশের মতো বাংলাদেশেও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধি অনুসারে ১৯ মার্চ ২০১৬ তারিখ থেকে সব তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট ও কৌটার উভয় পাশে ৫০ ভাগজুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী মুদ্রণ কার্যকর হয়েছে।
পৃথিবীতে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জোরালো করতে১৯৮৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে প্রতিবছরের একটি দিনকে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস হিসাবে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিলেও ১৯৮৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ৩১ মে তারিখকে প্রতিবছর বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস হিসাবে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্যভূক্ত দেশসমূহের প্রতিনিধিদের সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর আলাদা আলাদা প্রতিপাদ্য বিষয়ে ৩১ মে সমগ্র পৃথিবীতে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। দিবসটি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিবছরই উদযাপিত হয়।
রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী প্রদান করেছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রকৃতপক্ষে, প্রতিটি তামাক পণ্যের মোড়কই, তামাকের একটি চলমান বিজ্ঞাপন। তামাকপণ্যের বাহারি রঙিন মোড়ক, তামাক পণ্যকে আরো আকর্ষণীয় ও লোভনীয় করে তোলে। তামাকের প্রতি বিজ্ঞাপনের এই আকর্ষণ কমাতে পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও সাদামাটা মোড়কের প্রচলন জরুরি।
প্রদত্ত বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, উন্নত জাতি ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমাদের প্রয়োজন একটি সুস্থ সবল জনগোষ্ঠী। কেননা তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার দেশের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি।
বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সারাদেশে জোটের সহযোগী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বিশ্ব তামাকমুক্ত উদযাপন করে আসছে। বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাসমূহ এ বছরও দেশের ৬৫জেলায়ই র্যালি, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উদযাপন করবে।
এমবি





