আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীর বাঙালি। দীর্ঘ নয় মাস বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা। জাতি পেয়েছিল একটি দেশ, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত।
ঐতিহাসিক দিনটিতে স্বাধীনতা উত্সবের আমেজে গোটা দেশ আজ মেতে উঠবে। আজ সরকারি সাধারণ ছুটি। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা দেশবাসীকে স্বাধীনতার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
বাঙালি জাতীর হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন এ স্বাধীনতা। তবে সময়ের আবর্তে চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আমরা স্বাধীনতা দিবসটি পালন করছি যখন শাসকদল আওয়ামী লীগ দেশি-বিদেশি সব মহলকে উপেক্ষা করে ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়েছেন। নির্লিপ্ত ও ব্যর্থ নির্বাচন কমিশনের অধীনে কয়েক দফায় উপজেলা নির্বাচনের নামে নজিরবিহীন ভোট জালিয়াতির উত্সব চলছে দেশজুড়ে।
জননিরাপত্তার নামে পুলিশ প্রশাসন নির্বিচারে গণহত্যায় লিপ্ত। ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়ে এবং প্রশ্রয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর নগ্নভাবে আঘাত হানা হচ্ছে। রাষ্ট্রের সব শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর চালানো হচ্ছে চরম নির্যাতন। প্রতিনিয়ত বিরোধী দল-মতের মানুষদের ওপর ঘটছে হামলা-মামলার ঘটনা।
আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে দেশের আইনকে ব্যবহার করা হচ্ছে ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে। সত্য বলার অপরাধে টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে গণমাধ্যমের। আইন উপেক্ষা করে শাস্তি দেয়া হচ্ছে সাংবাদিকদের। সারাদেশের চলছে লাগামহীন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের মানুষ দিশেহারা। সব মিলিয়ে এক সীমাহীন নৈরাজ্য এবং চরম অনিশ্চয়তা গ্রাস করেছে সব ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণী-পেশার মানুষকে। তবুও প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস আমাদের জীবনে আসে নতুন প্রেরণা নিয়ে।
স্বাধীনতার পটভূমি: দীর্ঘকালের পরাধীনতার শৃঙ্খল, শোষণ-বঞ্চনা, অত্যাচার-অনাচারের নাগপাশ ছিন্ন করতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এ জনপদে জ্বলে উঠেছিল স্বাধীনতার অনির্বাণ শিখা। একাত্তরের মার্চ মাস শুরু হতেই স্বাধীনতাকামী জাতি শুরু করে আন্দোলন সংগ্রাম। ৭১-এর মার্চ দেশজুড়ে বিক্ষোভ, উত্তাল রাজপথ, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সংলাপ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে একেকটি দিন।
মুক্তিকামী মানুষ মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজনৈতিক নেতাদের আহবানে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন। সারাদেশে বেজে ওঠে রণদামামা। সবাই চাচ্ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৫ মার্চে অপারেশন সার্চ লাইটের পৈশাচিক গণহত্যার পর সেই দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। এরকম এক শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তে চট্টগ্রামের ষোলশহরে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলে বাংলাদেশি সৈনিকদের নিয়ে বিদ্রোহ করেন তত্কালীন মেজর জিয়াউর রহমান। এরপর কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়।
স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ পথপরিক্রমা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ, ’৫৬-এর সংবিধান প্রণয়নের আন্দোলন ’৫৮-এর মার্শাল ’ল বিরোধী আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-এর বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফার আন্দোলন, ’৬৯-এর রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থানের পথ পেরিয়ে ’৭০-এর ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সবই বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের মাইলফলক।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এদেশের মানুষ সরকারবিরোধী সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও তত্কালীন স্বৈরাচারী সরকার আওয়ামী লীগের সরকার গঠনে টালবাহানা শুরু করে। ছলচাতুরী ও কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান একাত্তরের ৩ মার্চ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। রেডিওতে এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা জাতি। শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তার পাশে এসে দাঁড়ান মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশের স্কুল-কলেজ, মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, কল-কারখানা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অচল হয়ে পড়ে দেশ। স্বাধীনতা আদায়ের ইস্পাতকঠিন দৃঢ় সংকল্পে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দিন দিন তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ভাষণের পর স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ জাতি চূড়ান্ত সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে।
পাকিস্তানি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষকসহ সর্বস্তরের মানুষ। এদেশের মানুষের স্বাধীনতার আন্দোলন দমন করতে একাত্তরের ২৫ মার্চ দখলদার বাহিনী ঢাকাসহ সমগ্র দেশে মানব ইতিহাসের বর্বরতম হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ওইদিন সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। তার নির্দেশে ২৫ মার্চ মধ্য রাতে নিরস্ত্র ছাত্র, জনতা, পুলিশ ও ইপিআর সদস্যদের ওপর দখলদার বাহিনী নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। গুলির গগনবিদারি শব্দ ও চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখায় কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়।
এরপর বাংলার মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সর্বস্তরের জনগণ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী গৌরবোজ্জ্বল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে বাংলার জনগণ অর্জন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। সশস্ত্র বাহিনী, রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল থেকে সরকারি-বেসরকারি সব ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় স্মৃতিসৌধে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীসহ সর্বস্তরের জনগণের পুষ্পস্তবক অর্পণ, সেমিনার, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর সড়ক ও সড়ক দ্বীপগুলো জাতীয় পতাকাসহ রঙ-বেরঙের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে। রাতে ভবনগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়। এছাড়া এ দিবস উপলক্ষে জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশনসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো স্বাধীনতা দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে। এছাড়াও নৌকাবাইচ, নির্দিষ্ট স্থানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেল, আনসার ও ভিডিপির বাদক দল বাধ্য বাজাবে। দেশের সব জাদুঘর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এমআর/ এআর





