রমজান আসলেই সকলের মনে ভেসে উঠে চুরি-ছিনতাই, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি, ব্যাগটানা পার্টি ও গামছা পার্টির কথা।
প্রতি বছরই রমজান এলে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগ আর ভোগান্তির চিরচেনা দৃশ্যের মুখোমুখি হন। যানজট, বাজারে ভেজাল আর নকল পণ্যর সমাহার। রমজান ও ঈদ ঘিরে সমস্যা যেন নগরবাসীর জন্য প্রতিকারহীন এক নিয়তি।
তাইতো এ সকল অপকর্ম ও ভোগান্তিমূলক কর্মকান্ড থেকে ঢাকা মহানগরসহ সমগ্র দেশবাসিকে আশানুরুপ স্বস্তি দিতে বাংলাদেশ পুলিশ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ইতোমধ্যে বিভিন্ন সেবা এবং নিরাপত্তা মূলক কর্মকান্ড গ্রহণ করেছে।
পবিত্র মাহে রমজান ও ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সম্মানিত নগরবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নগদ অর্থ পরিবহনের জন্য “মানি এস্কট” সেবা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন, পরিবহন বা ব্যাংকে জমা প্রদান অথবা মহানগরীর ভিতরে বা মহানগরীর পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে নগদ অর্থ পরিবহনের জন্য ডিএমপির পক্ষ থেকে “মানি এস্কট” সেবা প্রদান করা হবে।
এক্ষেত্রে যদি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নগদ অর্থ ব্যাংকে উত্তোলন, জমা বা পরিবহনের জন্যে গাড়ি ব্যবহার করা হলেওে সেই গাড়িতে ডিএমপি’র পক্ষ থেকে “মানিএস্কট” সেবা প্রদান করা হবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, আসন্ন রমজান ও ঈদুল ফিতর উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশে বাংলাদেশ পুলিশ ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে। কোথাও কোন চাঁদাবাজীর ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য পুলিশ সতর্ক আবস্থানে থাকবে।
কোনো প্রকার চাঁদাবাজদেরকে ছাড় দেওয়া হবে না।নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পবিত্র রমজান ও ঈদ উদযাপন নির্বিঘ্ন করার জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, পবিত্র রমজান মাসের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা, ট্রেন, বাস ও লঞ্চের নিরাপদ চলাচল ও যাত্রীদের নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা, ঈদ জামায়াতের নিরাপত্তা, অজ্ঞান পার্টি এবং জাল টাকার অপব্যবহার রোধ করা হবে।
এছাড়া ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রোধে বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে স্টেশন, বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে পকেটমার ও অজ্ঞানপার্টির তৎপরতা প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন।
ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বড় বড় শহরে বিপণী বিতান ও শপিংমল যথাসম্ভব সিসিটিভির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
জনসাধারণের কেনা-কাটার সুবিধার্থে এবং তারাবির নামাজের সময় অপরাধমূলক তৎপরতা প্রতিরোধে গভীর রাত পর্যন্ত পর্যাপ্ত নৈশটহলের ব্যবস্থা থাকবে।
ব্যাংক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে পুলিশ জনসাধারণকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।আর্থিক লেনদেন করার সময় পুলিশের বিশেষ মানি এস্কট সুবিধাও থাকবে।
পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে বলা হয়েছে নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যাংকের ভেতরে বাইরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে। তাছাড়া রাজধানীর মার্কেটগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনতেও সংস্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।
এদিকেঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও রমজানে ডিবি পুলিশ কয়েকটি স্তরে সর্বসাধারণের জন্য নিরাপত্তা প্রদান করবে।
নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষে রাজধানীতে কয়েকটি স্তরে অভিযান চালাবে গোয়েন্দা পুলিশ। ইতোমধ্যে রমজান উপলক্ষে রাজধানীতে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ডিবি পুলিশের টিম কয়েকটি স্তরে নিরাপত্তা দিবে। রাজধানীতে ডিবি পুলিশের মোবাইল টিম সর্বক্ষন মাঠে থাকবে।
দশ থেকে পনের রোজা পযর্ন্ত যেহেতু অজ্ঞান পার্টি, ছিনতাই ও জাল টাকা চক্রের তৎপারতা থাকে সে জন্য এই সময়ে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে পনেরো রমযানের পর থেকে সাধারণত জাল টাকা উদ্ধার কাজে নিয়োজিত থাকবে ডিবি পুলিশ।
এছাড়া বিভিন্ন শপিংমল ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তার পাশাপাশি বাসাগুলোতেও নজরদারীসহ মাদকের বিরুদ্ধেও অভিযান চালাচ্ছে ডিবি।
বৃহস্পতিবার ডিএমপি সদর দপ্ততরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া বলেন, রমজানে ও ঈদে মানুষ যাতে নির্বিগ্নে চলাচল করতে শুধু পুলিশের একার পক্ষে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনগণের মাঝেও নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে মানুষ যাতে নির্বিগ্নে চলাচল এবং তাদের জান-মালের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য সব ধরণের ব্যবস্থাই গ্রহণ করেছে পুলিশ।
রমজান এলে প্রতিবারই বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সভাও হয়। লাভ ক্ষতির বিবেচনায় লাভের দিকটা ভারি না হলেও একটা স্বম্ভাবনার প্রত্যাশা কিন্তু সবাই করে।
তবে এবার রমযানে ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক যৌথ সভায় রমজান ও ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা, যানজট নিরসন, ভেজালমুক্ত খাবার বিক্রির নিশ্চয়তা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এবারের সভায় প্রথমবারের মতো কয়েকটি বিষয় কার্যকরের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এক. ঈদে বাড়ি ফেরার সময় মহাসড়কে যানজটের চাপ কমাতে পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি কয়েক দফায় কার্যকরের প্রস্তাব করেছে পুলিশ।
দুই. বাস মালিকরা রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে গাড়ি পার্কিংয়ের প্রস্তাব করেন। তিন. বাসের ভাড়া ও টিকিট কালোবাজারি মোকাবেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও মালিক-শ্রমিকদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত।
জাল নোটের কারবার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পুলিশের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন বিপণিবিতানে জাল নোট শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৈঠকে। রমজান ঘিরে ছিনতাই, অজ্ঞান ও মলম পার্টির দৌরাত্ম্য নিরসনে রাজধানীতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের যততত্র গাড়ি পার্কিং না করতে বাসমালিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাসমালিকদের পক্ষ থেকেও যানজট নিরসনে পুলিশের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে অধিকাংশ প্রধান প্রধান সড়ক রিকশামুক্ত রাখা।বৈঠকে রমজানের শুরু থেকেই রাজধানীতে ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদারের কথাও বলা হয়।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মার্কেটের নিরাপত্তা দেওয়া হবে।সেজন্য রমজানে রাত ১০টা পর্যন্ত মার্কেট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রতি রমযানের ন্যায় পুলিশের নিরাপত্তা প্রদানে এবারো কোন ধরনের ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি।তবে এ সকল উদ্যোগের যথারিতি প্রয়োগ এবং পূর্ণতা পেলেই উপকৃত হবে জনগণ সুনাম কুড়াবে পুলিশ।
এমআর/এসএইচ





