সরকারের আয় কমে গেছে। ভাটা পড়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। রাজস্ব আয় ও বৈদেশিক সাহায্য আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাজেটে কাঁটছাঁট ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিকল্প পথে টাকা আহরণে ব্যাংকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সরকার। এতে করে ব্যপক তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, রাজনৈতিক সঙ্কট দূর না হলে কিছুতেই অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন আসবে না। বিনিয়োগ বাঁধাগ্রস্ত হবে। প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে না। দেখা দেবে চরম আর্থিক বিশৃঙ্খলা।  
দশম জাতীয় সংসদের বিতর্কিত নির্বাচনের পরে ক্ষমতাসীন সরকার দেশ ও বিদেশে নানা চাপে রয়েছে। এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হচ্ছে সরকারকে। অপরদিকে ভোটারবিহীন নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে মধ্যেবর্তী নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে বিরোধীদল। আন্তজার্তিক মহলেরও একই পরামর্শ। এই পরিস্থিতিতে দেশ পরিচালনার জন্য অর্থের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি এক বৈঠকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়া ও বৈদেশিক সাহায্যে ভাটা পড়ায় চাহিদার তুলনায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সম্পদের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা।  
তারা অর্থমন্ত্রীকে বলেছেন, এতে করে কাঙ্খিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনও বাধার মুখে পড়বে। আর্থিক পরিস্থিতির সার্বিক দুর্বলতা কাটাতে অর্থবছরের বাকি দিনগুলোতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য নতুন করে পরিকল্পনা নিতে বলেছেন তারা।
এছাড়া অর্থবছরের মাঝামাঝিতে রাজস্ব সংকটে পড়ায় ব্যয়ের হিসাব টেনে ধরতে হবে বলে বৈঠকে মত দেন নীতিনির্ধারকরা। এরপর সিদ্ধান্ত হয় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহার করার। সেই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনার পথ খুঁজতেও বলা হয়।
খোদ অর্থমন্ত্রীও এ নিয়ে চিন্তিত। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতিতে ঊর্ধ্বমুখী ভাব দেখা দিয়েছে; যা অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। বাজেটের অর্থায়ন স্বাভাবিক রাখতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দ্রুত বৈঠকের ব্যাপারে তাগিদ আসে ওই বৈঠকে।
এদিকে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কমেছে সরকারের রাজস্ব আহরণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ৫৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৪৯ হাজার ৯ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথমার্ধেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য থেকে পিছু হটছে অর্থ মন্ত্রণালয়। লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ কমিয়ে তা ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা। এর পরের বছর তা আরো বাড়িয়ে ১৯ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা আরো বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা।
এদিকে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকগুলোর মোট উদ্বৃত্ত তারল্যের মধ্যে ৭৯ হাজার কোটি টাকাই এখন সরকারের দখলে। স্বাধীনতার পর ৩৭ বছরে সরকারগুলো ব্যাংকিং খাত থেকে যা ঋণ নিয়েছে গত ৫ বছরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ঋণ নিয়েছে তার চেয়েও বেশি। আগের ৩৭ বছরে সরকারগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৫২ হাজার ৮২৪ দশমিক শূন্য ৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৬৬ দশমিক ১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই ৫ বছরে মহাজোট সরকার একাই ঋণ নিয়েছে ৬০ হাজার ৯৪২ দশমিক ১২ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্থবির দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। তার উপর উচ্চ সুদ ও ব্যাংক ঋণের উপর সরকারের নির্ভরশীলতা বেসরকারি বিনিয়োগে  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । যার কারণে সরকারের রাজস্ব আহরণে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এতে করে একদিকে যেমন সরকারের আয় কমেছে অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির উপর পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।
সরকারের অনেক মন্ত্রী এসব কথা উড়িয়ে দিয়ে অর্থনীতির ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে বলে দাবি করলেও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্নকথা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো কথা বলে জানা গেছে, শুধু রাজনীতি নয়; অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব বিশেষ করে আয় কমে যাওয়ায়, স্বস্তিতে নেই সরকার। এর থেকে কিভাবে বের হওয়া যায়-তা নিয়ে চলছে নানা পরিকল্পনা।
তবে এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা স্পষ্ট করেই বার বার বলে আসছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর না হলে দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কটে পড়বে দেশের অর্থনীতি। সরকারের উচিত সব রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত করে দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা।
[b]ঢাকা, এমআর, ১১ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর[/b]