১০ ডিসেম্বর ১৯৭১। চূরান্ত বিজয়ের দারপ্রান্তে বাংলাদেশ। একাত্তরের এইদিনে পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা নির্বিচারে হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করে। বিজয়ের কাছাকাছি এসে দেশের মাটিতে এদিন রচিত হয়  ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত গণহত্যার ইতিহাস। এদিন থেকেই দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী নিধন শুরু করে।

রাজধানী ঢাকা ছাড়া দেশের অধিকাংশ জেলা শত্রুমুক্ত। ঢাকায় পরিকল্পিত চূড়ান্ত হামলা চালিয়ে শত্রুদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে যৌথবাহিনী। কিন্তু হানাদার বাহীনির নৃশংসতার শিকার হয়ে ১০ ডিসেম্বর শহীদ হন প্রখ্যাত সাংবাদিক দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী ও বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দিন হোসেন।

একাত্তরের এদিনে শত্রুমুক্ত হয় ময়মনসিংহ, ভোলা, মাদারীপুর ও নড়াইল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঘটে কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ভারতীয় বোমারু বিমান ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে ক্রমাগত বোমা হামলা শুরু করে। এদিনে পূর্ব সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতীয় সৈন্যদের তৎপরতায় নাখোশ পাকিস্তানের অন্যতম মিত্র চীন সেনা চালান করে সিকিম-ভুটান সীমান্তে। আর মার্কিন সপ্তম নৌবহর অবস্থান নেয় মালাক্কা প্রণালীর পূর্বদিকে।

যুদ্ধে পরাজয়ের আশঙ্কায় পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি পালানোর পাঁয়তারা করে। তার এই গোপন অভিসন্ধি বিবিসি ফাঁস করে দেয়। নিয়াজি স্বীয় দুর্বলতা ঢাকার জন্য ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে দম্ভভরে বলেন, কোথায় বিদেশি সাংবাদিকরা, আমি তাদের জানাতে চাই, আমি কখনো আমার সেনাবাহিনীকে ছেড়ে যাব না।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লীতে এক জনসভায় ভাষণ দানকালে বলেন, যুদ্ধবিরতিসংক্রান্ত জাতিসংঘের আহ্বান ভারত প্রত্যাখ্যান করেনি বা গ্রহণও করেনি। প্রস্তাবটি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজয় শুধু তখনই সম্ভব হবে, যখন বাংলাদেশ সরকার কায়েম হবে এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত এক কোটি শরণার্থী তাদের বাস্তুভিটায় ফিরে যেতে পারবে।

অন্যদিকে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে একটি যৌথ সামরিক কমান্ড গঠন ও রণকৌশল গ্রহণ করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ। আর ভারতের পক্ষে সই করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

একাত্তরের এদিন গভর্নর মালিকের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও মুখ্যসচিব পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার মুজাফফর হোসেন ক্যান্টনমেন্টে জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধির কাছে 'আত্মসমর্পণের' আবেদন হস্তান্তর করেন।

এতে অবশ্য কৌশলে আত্মসমর্পণ শব্দটি বাদ দিয়ে অস্ত্রসংবরণ কথাটি ব্যবহার করা হয়। এই আবেদনে আরো লেখা ছিল, যেহেতু সঙ্কটের উদ্ভব হয়েছে রাজনৈতিক কারণে, তাই রাজনৈতিক সমাধান দ্বারা এর নিরসন হতে হবে। আমি তাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট দ্বারা অধিকারপ্রাপ্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ঢাকায় সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাই। আমি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানাই।

এই আবেদন ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধি পলমার্ক হেনরির হাতে দেয়া হয়। পাকিস্তানি মহলে বার্তাটি মালিক-ফরমান আলী বার্তা হিসেবে পরিচিতি পায়। পরদিন তা আবার প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। বস্তুত রাও ফরমান আলীর প্রস্তাবের সংবাদ ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সরকার এই প্রস্তাব রদ করার পরামর্শসহ ইয়াহিয়াকে জানান যে, পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য সপ্তম নৌবহর ইতোমধ্যেই বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হয়েছে। এর ফলে ইয়াহিয়ার মত পরিবর্তিত হয়।

অন্যদিকে, নিক্সনের পূর্ববর্তী সতর্কবাণীর জবাবে ৯ ডিসেম্বরে ব্রেজনেভ নিক্সনকে জানান, উপমহাদেশের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন পূর্বাঞ্চল থেকে পাকিস্তানি সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য ইয়াহিয়াকে সম্মত করানো। রণাঙ্গনের বাস্তব চাপে ১০ ডিসেম্বরে পাকিস্তান নিজেই যখন 'সম্মানজনক'ভাবে সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য উদ্যোগী হয়ে ওঠে, তখন সেই উদ্যোগকে সমর্থন না করে মার্কিন সরকার বরং তা রদ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অধিকন্তু ভারতকে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মত করানোর তাগিদ দিয়ে ৯ ও ১০ ডিসেম্বরে নিক্সন ব্রেজনেভকে দুই দফা বার্তা পাঠান।

এভাবে বাংলাদেশের বিজয় যত নিকটবর্তী হয় দেশী-বিদেশী তৎপরতা তত জোরদার হতে থাকে। সবকিছু পেছনে ফেলে মুক্তিপাগল বাঙালী এগিয়ে যায় বিজয়ের দিকে।

এমআর/ইআর