ঈদ একটি বিস্ময়কর শব্দ। একটি ইতিহাস একটি আদর্শ সংস্কৃতির বোধের উৎসব। মুসলিম-মিল্লাতের অবিস্মরণীয় আনন্দগাঁথা সম্বলিত জাতির বৈষম্যহীন ধারার ঐতিহাসিক মিলনমেলা। সেখানে উচু-নীচু সাদা কালো আর ছোট-বড় সবাই সমান। ঈদ মানে আনন্দ ঈদ মানে উচ্ছ্বাস, যা বার বার আমাদের দ্বারে হাজির হয়। স্মরণ করে দেয় মানবতার অমলিন নৈতিকতাবোধ, সত্যের দর্পণে আপনারে স্রষ্টার মহিমায় প্রতিভাত করা এবং মহান রাব্বুল আলামিনের সান্নিধ্যের মাধ্যমে ঈদের উচ্ছ্বাস বিকশিত করা।

প্রত্যেক বছর মানবতার ইতিহাসে ঈদের আগমন ঘটলেও সময়ের ব্যবধানে দিনবদলের পালায় ঈদের ধারা আবহমান বাংলার মানুষের কাছে ভিন্নতা ও বৈচিত্রতা লক্ষ্য করা যায়। গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে ঈদের আনন্দ ও উচ্ছ্বাস এক রকম, আর শহরে পোশাদার ও সভ্যতার অন্তিম দিগন্তে অবস্থানকারী মানুষের ঈদ-আনন্দ সমপর্যায়ের নয়। বিশেষ করে বর্তমান সভ্যতার উন্মেষ ঘটার আগে ঈদের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে একজন মুসলমান যে আবেগভরা হৃদয় নিয়ে ঈদের পরিবেশ তথা আবহকে আলিঙ্গন করত ও আনন্দে উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হতো। বর্তমান আধুনিক কালে ব্যস্ততার করাল-গ্রাসে এবং পেশাদারী মানসিকতায় মানুষে হৃদয় স্বার্থসিদ্ধি করা আর হাজার কাজের মাঝে পূর্বের ন্যায় আনন্দ উচ্ছ্বাস ও সামাজিক পবিত্র বন্ধনের সে ভালোবাসা দেখানোর মতো কোন সুযোগ পায় না।

মূলত: আগের দিন বা সেকালে আবহমান বাংলার মানুষের ঈদ-আনন্দের তেমন নামি দামি পোশাক অথবা আপ্যায়নের জন্য উন্নতমানের ব্যবস্থা ছিল না। ছিল মমতা মাখানো আনন্দের চাদরে মোড়ানো ঐকান্তিক নান্দনিক ও যারপরনাই উচ্ছ্বাসের অমীয় ধারা।

আগের দিন রমজানের অমীয় বার্তা রুটির দিন অর্থাৎ শবে বরাতের দিন হতে গ্রাম-বাংলার মেহনতি মানুষ ঈদের আনন্দের দিন গোনা শুরু করতো। যেহেতু শবে বরাতের ২ সপ্তাহ পরই মাহে রমজানের আগমন বার্তা আমাদের দ্বারে ঘটে। এ লক্ষে বাংলার সচেতন ধর্মপ্রাণ মুসলিম রমনীরা ইফতারের আয়োজনে শবে বরাতের পরেই গোছগাছ শুরু হয়। যেমন আগের দিন মানুষ সাধারণত ইফতারে চিড়া, মুড়ি নারকেল-কুরা, খেজুরের দানাওয়ালা মজার গুড় দিয়েই ইফতার করত। এর পাশাপাশি নারকেল, খই, গুড় খুব তৃপ্তির সাথে ইফতারের আয়োজনে থাকত। আর এগুলো ঈদের আমেজ হিসেবে মাহে রমজানের প্রস্তুতিতে গ্রামের প্রায় বাড়িতে ঢেকির পাড় শোনা যেত। আমাদের মা, চাচি, দাদি, ফুফুরা এ সমস্ত রশদ তৈরিতে ভীষণ ব্যস্ত হতেন। কারণ সবাই মুড়ি ও খই ভাজবে। অথবা ঢেকিতে দেশীয় বিভিন্ন সুগন্ধি ধানের মজাদার চিড়া কুটবে। মূলত: রমজানের সকল আয়োজন ও প্রস্তুতির মধ্যে ঈদের সকল আনন্দ নিহিত থাকে। এভাবে মাহে রমজানের আগমন ও বরকতময় মানবতার জীবনে আসে। দেখা গেছে গ্রামে কারো বাড়ি চিড়া, মুড়ি বা নারকেল, খইও জুটত না। শুধু পুকুর বা চাপ কলের পানি দিয়ে ইফতার সারতে হয়েছে। এর মধ্যে আবার কারো বাড়িতে রুটি বা চালের জাউ রান্না করে খুব তৃপ্তি সহকারে ইফতার করার প্রবণতা ছিল। যা তখন গল্প ও ইতিহাস মাত্র। সময়ের ব্যবধানে এভাবে মানুষের ঈদের আমেজ আসতে থাকে। তবে মজার ব্যাপার হলো ইফতার ও সেহেরির সময় নিয়ে। তখন রেডিও, মাইক অথবা টিভি কিছুই ছিল না। কোন কোন এলাকায় প্রাইমারি স্কুলের ঘণ্টার বেল পিটিয়ে অথবা হুইসেল দিয়ে সেহরি বা ইফতারের সময় জানান দিত।

এ ক্ষেত্রে একটি মজার ব্যাপারে না বললেই নয়। আধুনিক কিছুই যখন ছিল না, তখন দেখেছি আমার দাদা-দাদী রোজা রাখতো আকাশের তারা দেখে। আর ইফতার করতো মুরগি ঘরে উঠলে। একবার ঐ রকম সমস্যা হলো, আকাশে ভীষণ মেঘ; মুরগিও ঘরে ওঠে না। ওদিকে আজানতো শোনা যাচ্ছে না, তখন কি দেখে ইফতার করবে। দেখা গেলো ইফতারের অনেক আগেই ইফতার করলেন। আবার আরেকদিন দীর্ঘসময় পর ইফতার করলেন আমান দাদা-দাদী। যাহোক দিনবদলের পালায় মানুষের জীবনে সাধারণ গ্রাম-বাংলার মেহনতি সরল-সোজা মানুষগুলো এভাবে জীবনের বাক গতিশীল রেখেছে বলেই সভ্যতা আজকে উজ্জলতা ফিরে পেয়েছে। যে মানুষগুলো মাহে রমজানের সে কষ্ট ও ধৈর্য্যরে পরিচয় দিয়ে দিনের পর দিন না খেয়েও অর্থাৎ শুধুই পানি পান করে রোজা পালন করেছে এবং ঈদের সে মহামহিন আনন্দ অনুভবের অলিন্দে জিইর রেখেছে এবং ঈদের স মহামহিন আনন্দ অনুভবের অলিন্দে জিইয়ে রেখেছে সেটাই আসল আনন্দ। কবি নজরুল যথার্থই বলেছেন-

‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা, ক্ষুধায় আসেনি নিঁদ

মুমূর্ষ সে কৃষকের ঘরে, এসেছে কি আজ ঈদ’

ঈদের আগমন উপলক্ষ্যে গ্রামের ধর্মপ্রাণ রমণীরা আরেকটি সাড়া ফেলে দিত সপ্তাহ আগ থেকে। সেটা হলো বাড়ির সব কাপড়-কাচা ও ঘর-দোর লেপা। কারণ আগের দিনে বেশির ভাগ মানুষের মাটির ঘর ছিল। মাটি কাঁদা গুলিয়ে লেপলে আরো আকর্ষণীয় হতো। আর বাড়ির পুরনো, জামা-কাপড় পরিষ্কার করা হতো। সারা গ্রামের পুকুর, খাল ও নদীর কিনারায় একটা নতুন আমেজ লক্ষ্য করা যেত। সেই আনন্দ যে কত মধুর ও দৃষ্টি নন্দন তা অনুভবে বোঝানো কঠিন। রাস্তায় গরুর গাড়িতে করে বড় বোনকে শ^শুর বাড়ি হতে আনা, গরুর গাড়ীর ক্যাকুচ শব্দ আর কাপড়-কাঁচার পাটের জোরে জোরে আঘাতের সে শব্দ ছন্দ এখনও কানে বেজে ওঠে। তবে ঈদের আনন্দের বিশেষ যে বিষয়; পোশাক। আগে নতুন পোশাকের এ প্রবণতা গ্রাম বাংলায় এতো ছিল না। পুরাতনটিই পরিষ্কার করা হতো বেশির ভাগ।

এখানে একটি বিষয় আলোকপাত করা দরকার যে সে সময় এখন উন্নত সাবান ডিটারজেন পাউডার পাওয়া যেতো না। সোডা ছাড়া ছিল সাধারণ ১/২ টা কাপড়-ধোয়া সাবান। আর গ্রামের মানুষ ঈদ উপলক্ষেও সে আবহমান অভ্যাস কাজে লাগাতো তাহলে কলাগাছের শুকনা ও আলগা কভার পুড়িয়ে ছাই বানাতো। যা সারা বছরের জন্য বড় মাটির পাত্রে সংক্ষণ করতো, যাকে খার বলে চালাতো। খার দিয়ে সারাবছরই কাপড় পরিস্কার করত মানুষ।

যা হোক গ্রামের মানুষের সে অভ্যাস ও সংস্কৃতি হতে ফিরে আসতে অনেক সময় লেগেছে। কিন্তু সেটা ছিল প্রকৃত আনন্দ ও মমত্ব বোধের এক ভিন্নধারা। কিন্তু কাপড় ধোয়া ও ঘর লেপা এর পর নতুন পুরাতন যে কাপড়ই হোক না কেন, সেটা ঈদের জন্যই নির্ধারিত। তবে এখন কার মতো কাপড় শোকানোর পরই সেটা ঈদে জন্যই নির্ধারিত। তবে তখনকার মতো কাপড় শোকানোর পরই সেটা সুন্দরভাবে ইস্ত্রি করে ভাজ করে সাজিয়ে রাখার মতা পরিবেশ ছিল না। দেখেছি ভীষণ আগ্রহের সাথে ঈদের ২/৩ দিন আগে ধোপা বাড়িতে ভীড় জমতো। কিন্তু কাপড় ইস্ত্রি করবে কীভাবে। বিদ্যুৎ না থাকলে তো যা হবার হবেই। আগের দিনে গনগনে উত্তপ্ত আগুন (কয়লা) রেখেই গরম করে কাপড় ইস্ত্রি করা হতো। যাদের এ পদ্ধতি ছিল না, তারা আবার প্লেট গরম করে তার উপর ওজন ওয়ালা কিছু রেখে কাপড় ভাজ করতো আর সেটা শুরু হতো ঈদের ২/১ দিন আগে। আর সে কষ্টের মাঝেই ছিল ঈদের প্রকৃত আনন্দ। সাধারণ মানুষ সেই আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে থাকতো। সেই ব্যস্ততা ও বৈচিত্রময় পাগলামো সব কাজের আনন্দ আজও অতীতে ফিরে যায় বার বার।

এভাবে ঠিক একদিন এসে যায় ঈদের আগের চাঁদ দেখার মহাসমারোহ। মনে হয় যে আর যেন সয় না। কীভাবে চাঁদ দেখার পর রাতটুকু কাটাবো। আগামীকাল ঈদ চাঁদ দেখার ব্যাপারে এখন যেমন আধুনিক মিডিয়া ও পদ্ধতি রয়েছে তখন তো কিছুই ছিল না। এমনকি মসজিদের আজান ও সবাইকে দেয়ার রেওয়াজ গ্রাম এলাকায় হয়নি। রেডিও ছিল গ্রামে ২/১ টি। কোন বিশেষ অনুষ্ঠান থাকলে মানুষ জড়ো হতো সব রেডিওর কাছে । তেমনিভাবে ঈদের আগের দিন চাঁদ দেখার ব্যাপারটি ছিল আরো বৈচিত্রময় ও আনন্দঘন পরিবেশ। একদিকে যেমন সবাই জড়ো হতো মাঠে কোন ফাঁকা জায়গায় যেখানে বসে দাঁড়িয়ে আকাশে ভালোভাবে চাঁদ দেখা যায়। যদি একবার হালকা দেখা গেছে, দে ছুট; দুটি মিছিল নিয়ে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় রটে যেতোআগামী কাল ঈদ! তার পাশাপাশি রেডিওর কাছে বসে চাঁদ দেখা বা আগামি কাল ঈদ হবে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে থাকাটাও ছিল আনন্দ উচ্ছ্বাসের আরেক অধ্যায়।

চাঁদ যদি দেখা পাওয়া গেল; এরপর শুরু হলো ঈদের মূলকাজ। কখন কীভাবে কি করা যায়? বিশেষ করে দেখা যেত মেহেদির পাতার পাটায় ঘষাঘষি সব বাড়িতে। যাদের মেহেদি গাছ থাকত তাদের কদরই আলাদা। পাড়ার সব মানুষ এসে মেহেদী পাতার জন্য ধর্না দিত। এ ব্যাপারে সবাইকে সুযোগ দিতে গিয়ে মেহেদী গাছটি আবার ন্যাড়া হয়ে যেত পাড়ার মেয়ে ছোকড়াদের হাত লাল করতে। আসতো হাত লাল করার মতো এখনকার মতো রেডি মেহেদী সেনি। বঅন, চুন সুপারি দিয়ে তখন মেহেদী পাতা বাটা হতো যাতো বেশি লাল হয়। ভালো করে বেটে হাতের মধ্যে নিয়ে মুঠ করে বসে থাকতাম কখন মেহেদী লাল হবে। এইতো মেহেদী ও ঈদ আনন্দের আরেক উপাখ্যান। চলতো রাতভর। এরপর বিভিন্ন গজল-গান ও গীত নিয়ে সময় পার করা হতো।

এরপর গ্রাম্য রমণীদের আরেক বিশেষ কাজে ব্যস্ত হয়ে যেতে দেখা যেতো। সেটা হলো ঈদে চাঁদ দেখার পাশাপাশি ঈদের সকালে সেমাই রান্নার যাবতীয় বন্দোবস্তও তো করতে হবে। সেজন্য প্রায় বাড়িতে হাতে কাটা সেমাই পিঠা তৈরিতে ভীষণ ব্যস্ত থাকলে দেখা যেতো। ধানের চালগুড়া করে আটা; এরপর হাতে বানানো ‘সরই পিঠা’ (গ্রামে বলা হয়)। এ ছাড়া আর কোন উপায় ঈদে থাকতো না। কারণ, সে সময় মানুষের কাছে সবছে প্রিয় ছিল খাঁটি গরুর দুধ মিশিয়ে খেজুর গুড়সহ রস-পিঠার পায়েশ। আজও সে স্বাদের রেশ পাওয়া, দেখা গেছে যারা খেজুর গুড় বেশি উৎপাদন করতো তাদের বাড়িতে ঈদের আগের দিন হতে গুড় সংগ্রহের জন্য মানুষ লাইন দিয়ে থাকতো। আমাদের বাড়িতে ৫ টি গাভীতে দুধ দিত। ও ঈদের দিন সকালে ঘোষ আসার আগেই আমাদের বাড়ীতে দাদির কাছে অনেককেই পাত্র হাতে অপেক্ষা করতে দেখেছি। যাদের গাভী ছিল না, তাদেরও ঈদ পালন হবে ঐ হাতে কাটা ‘সরই পিঠা’ আর খেজুরের গুড় ও দুধ দিয়ে।

যে কথা বলতে গিয়ে অন্যদিকে এসে গেছি, সেটা হলো, গ্রামের রমনীর হাতে তৈরি পিঠা। ঈদের আগের দিন অনেক বাড়িতে আমরা ছেলে ছোকড়া আগামী কাল ঈদ হবে সে আনন্দ জানাতে যত বাড়ি গিয়েছি, দেখেছি ল্যাম্প, কুপি, হারিকেন জ্বালিয়ে গ্রামের বধু চাচা, দাদীরা গুনগুনিয়ে গান গেয়ে দুলে দুলে সে হাতে কাঁচা সেমাই তৈরি করছে। অনেক সময় আমরা কাছে গেলেই প্রতিবেশী দাদী বা নানী মুখে চালের গুড়া মাখিয়ে সাদা বানিয়ে দিয়ে মজা করেছে। সে আনন্দ অম্লান, কোনদিনই ভুলে থাকা যাবে না।

অনেক ধৈর্য্য ও আনন্দ পরিকল্পনার রাত গেলেও ঘুম আসতো না। কীভাবে ঈদের দিন কোথায় গিয়ে শেষ হবে। কাদের বাড়ি যাব, আর কোথায় যাব না। কী খাবো, আর কী খাব না এ চিন্তায় রাত শেষ হতে চাইতো না। সারারাত জাগাভাব নিয়ে খুবই ভোরে উঠে মাকে ডেকে দিলাম খির পায়েশ রান্না করার জন্য।

চাঁদ দেখায় সাথে সাথে আগের দিন সন্ধ্যায় সারা গ্রামব্যাপী দলবেধে ‘স্কুলের কাসার বেল’ ও জের পিটিয়ে সকর মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে আগামীকাল সকাল ৯টায় ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। যেহেতু মাইক ছিল না। একটি সরগোল করেই সকল মানুষকে অবহিত ও অবগতির একমাত্র উপায়। সকালে ইমাম সাহেবে আলোচনার মাধ্যমে ঈদগাহ ময়দান গরম হয়ে উঠতো। অল্প সময়ের ব্যবধানে মানুষের ঢল নামতো জীবনের কাঙ্ক্ষিত সে মহামহিম ঈদের জামায়াতে শামিল হবার জন্য। সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের মিলনমেলা আর আনন্দ আর মমতাঘেরা প্রকৃতি ও যেন নেচে উঠতে উচ্ছ্বাস আনন্দে। আমাদের ঈদগাহ’র বাহিরে বিরাট বড় আম গাছ। এবং সামনে ছিল বিরাট বাঁশের ঝাঁড়। নামাজের সময় অর্থাৎ ঈদের জামায়াত শুরুর মুহূর্তে বাঁশের ঝড়ে যেন এক ধরনের রহমতের বাতাস অনুভর করা যেত। শুধু শো-শো শব্দে আর বাঁশের এলে দুলে নড়াচড়া করাটাও ছিল আমদের ঈদ আনন্দ।

যথাসময়ে ঈদের নামাজ ও খুতবা শেষে মোনাজাত এরপর সর্বস্তরের মানুষের সাথে কুলাকুলি আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যদিয়ে আস্তে আস্তে ঈদগাহ ত্যাগের ধারা চলতে থাকতো। ঈদগাহ ছাড়লেও বাসা বাড়িতে যাওয়ার প্রবণতা ছিল না। তারপর যেতাম পাশের রাস্তার ধারে সাময়িক গড়ে ওঠা মিষ্টি মিঠাইয়ের দোকানে। সারি-সারি গরম-গরম জিলাপি ভাজা, পাপড় ভাজা, ঝুরিভাজা, চিনি ও গুড়ের বাতাসা, কদমা, লাচ্ছা লজেন্স ও নানা ধরনের আর্কষণীয় রসালো মিষ্টি এবং দানাদার থাকতো দোকানে।

সকালে ছালাম করার বদৌলতে পাওয়া পয়সা-কড়ি দিয়ে ইচ্ছেমতো মিষ্টি মিঠাই ও রংবেরংয়ের বেলুন ও অন্যান্য খেলনা কিনতে একটু দ্বিধা করিনি। তার সাথে আরার কাঁচের গুটি ডজনখানেক কিনতে ভুল হতো না। যা দিয়ে বন্ধুরা মিলে বাঁশ-বাগানের সরু পথে মজার গুলি খেলবে বলে।

তারপর ঘুরাঘুরি, মিষ্টি পায়েশ খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেয়াসহ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হওয়ার ও দৌড়-ঝাপ দিয়ে ঈদের আমেজ সবার মাঝে শরীক করানো হতো। তার পাশাপাশি কবরস্থানে গিয়ে গোরবাসীদের উদ্দেশ্যে দোয়া করতে কখনই ভুল হতো না। মায়ের আদর, বোনের স্নেহ ঈদ আনন্দ হতো আরেক বিশেষ আনন্দ। তারপর পর্যায়ক্রমে বলতো এর বাড়ি ওর বাড়ি দাওয়াত খাওয়া।

আগের দিন ঈদ আমেজে এখনকার মতো ফিরনি পায়েশ ভুনা খিচুড়ি, কাচ্চি কালিয়ার আয়োজন হতো না। গ্রামের মানুষের মাঝে নিজ পোষা খাশি, মোরগ, হাস-মুরগিই ছিল বিশেষ গোশত। বর্তমানে যে হারে গরু, খাশির গোশত খাই সে পরিমাণ গোশত খাওয়া হতো না। ঈদ পালনের জন্য ছয় মাস ১ বছর আগ থেকে বড় খাশি, মোরগ ও মুরগি পোষা হতো এবং ঈদ উৎসবে নিজ জামাই মেয়েকে দাওয়াত করে বিশাল আয়োজনে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন থাকতো। বাজার হতে কেনা গোশতের চেয়ে বাড়িতে পোষা মোরগ-মুরগির গোশতই ছিল সবার কাছে প্রিয়।

অন্য দিকে বড় বড় রাজহাঁস ও এর তালিকায়। তবে গরুর গোশত থাকতো না ঠিক না। যদিও তখনকার সময় গোশতের মূল্য অনেক কম থাকলেও গ্রাম্য কালচারই ছিল মূল বিষয়। বিকাল হতেই এপাড়া ও পাড়া যাওয়া ও দৌড় ঝাঁপের মধ্যদিয়ে সময় অতিবাহিত হত এমনি করে।

বিকালে স্কুল মাঠে দাওয়াতে জামাই ও ঘর জামাইদের মধ্যে চলতো তুমুল প্রতিযোগিতামূলক খেলা হাডুডু, কাবাডি, দাড়িয়া বান্ধা, গাদনসহ গ্রাম্য আরো অন্যান্য খেলা। একবার তো ঈদের বিকেলে ‘চিকন বনাম মোটা’ ফুটবল খেলা হতো। আমি ছোট হবার কারণে অনেক লোকের ভিড়ের মাঝে দেখতে পারছিলাম না। পরে বাবার কাঁধে বসে সে খেলা দেখেছিলাম। ভীষণ মজা হয়েছিল সেবার।

চিকন খেলোয়ার দৌড়ে গোল করলে মোটারা পারেনি। তখনকার সময়ে গ্রামে সারি সারি ভাটিয়ালি গানেরও আসর বসতো। বিকালে খেলা শেষ করে আর কবিগান জারি-সারি ভাটিয়ালি নিয়ে গ্রামের আনন্দ-পিয়াসী মানুষ ভীষণ মেতে উঠতো। সেটা হলো দাওয়াতে নতুন পুরনো জামাইদের একেক দিন একেক জনের বাড়িতে এক সাথে খাওয়ার দাওয়াত চলতো ২ সপ্তাহ ব্যাপী। যারা শ্বশুর বাড়িতে জামাই হয়ে আসতো, তারা সত্যিই সেদিন ভাগ্যবান হয়েই আসতো। ঈদের আমেজ এভাবে আস্তে আস্তে শেষ হতো। কিন্তু অম্লান হয়ে থাকতো ইসলামী সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারা ও বাস্তবতা।

ঈদ আসলে কোনদিনই শেষ হবার না। প্রতি বছর ঈদ তার স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে মুসলিম-মিল্লাতের দ্বারে আগমন করে। সাথে নিয়ে আসে মহান রাব্বুল আলামীনের আপার রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের অমীয় সূধা। সে শুধু সবার জীবনে পান করার ভাগ্য হয় না। আগের কালে হোক আর বর্তমান হোক, ঈদের শিক্ষা আমাদের জীবনে গ্রহণ করা সবার জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।

সময়ের এই অত্যাধুনিক কালে দিন বদলের পালায় ঈদের আনন্দ ও মুসলিম-মিল্লাতের ঐতিহাসিক ধারা অনেকটা নয়, ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আগের দিন মানুষের মধ্যে ছিল নিখাদ ভালোবাসা। কোন কৃত্রিমতা পরিলক্ষিত হতো না। অথচ সময়ের বিবর্তনের সাথে মানুষের মধ্যে অনেক পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে। মানুষের মধ্যে স্বার্থ নিহিত রয়েছে। যা আগে কখনো ছিল না (পেশাদার) মনোভাব বেশি হওয়ার রহমত ও বরকত উঠে গেছে। মানুষ যদি ফরজ না নেন, তার পিছনে যেন এক বিরাট স্বার্থ রয়েছে। স্বার্থ ছাড়া মানুষ এক পা-ও সামনে যেতে চায় না এখন।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধনের কারণে মানুষ আরো ব্যস্ত হতে আরো ভীষণতর ব্যস্ততার অন্তিম দিগন্তে রয়েছে। আগে যেমন সামাজিক বন্ধনের নাগপাশে থেকে সকল কাজ সম্পাদন করেছে বা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাজটি কীভাবে করা যায়। অথবা তথ্য উপাত্তের জন্য ও একজন আরেক জনের কাছে যাওয়ার একটা প্রবণতা ছিল। এখন কিন্তু সেটা একদম নেই।

কম্পিউটারকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কিং পরিবেশে মানুষ সহজে সব কাজ সিদ্ধি করছে। যার সামাজিক বন্ধনীটাও অনেকটা যায় যায় অবস্থা। আধুনিক সভ্যতার এ অঙ্গনে মাহে রমজানের রহমত বরকত ও মাগফিরাতের মহামহিম পরিবেশ তথা ঈদ আয়োজনটাও এখন প্রযুক্তির আয়ত্তে চলে গেছে। রসালো খাবার কিংবা দামী গহনা, পোশাক থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি জিনিস এখন অনলাইনে সংগ্রহ করা সম্ভব। যেখানে প্রযুক্তি সেখানেই রসহীন মানবতার বিকাশ। মোবাইলের মাধ্যমে মানুষের তথ্যের আদান প্রদান, ব্যাবসা বাণিজ্য অব্যাহত আছে। বাইরের তথ্যাদি নেয়া যোগাযোগ মাধ্যম কেন্দ্রিক সহজে সব কাজ সম্পাদন হচ্ছে। অর্থাৎ সামাজিক প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা আগের দিনের চেয়ে আকাশ-পাতাল ফারাক।

আধুনিক কালের ঈদ মানে মোবাইল ফোনে মতামত আদান প্রদান করা। মোবাইলের মাধ্যমে আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেয়া অথবা মেসেজ দিয়ে দায় শোধ করা হয়। এছাড়া ঈদের মূল বিষয় থাকে মানুষের মানুষে দেখা সাক্ষাৎ ও পারস্পারিক খোঁজ-খবর নেয়া। বাস্তবক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত কারণে সেটাও আজ সুদূর পরহিত। এরপর ঈদ-আনন্দের আরেকটা বিশেষ দিক হলো খাওয়া দাওয়া। কিন্তু আগের দিন যখন মানুষ আন্তরিকতার সাথে সমাজের সব ধরনের আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে বাসায় রান্না করা খাবার খাইয়ে আনন্দ বিনোদন করতেন। সেখানে ঈদের সৌহার্দ ফুটে উঠতো। সবার মাঝে আন্তরিকতা বৃদ্ধি পেতো। বর্তমান সেখানে হোটেল রেস্তরার খাবার বা চাইনিজ রেস্তরার খাবার দিয়েই সম্পাদিত হচ্ছে আপ্যায়নের পালা। যার ফলে আন্তরিকতা অনেকাংশ কমতে থাকে। মৌলিক সে আনন্দ থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়।

এছাড়া অন্যান্য দিক নিয়ে যদি চিন্তা করা হয় তাহলে বুঝতে হবে সবকিছু রেডিমেট বা মোবাইল হিসেবে পাওয়া যায়। আজকের দিনে রেডিমেট খাবার। রেডিমেট মেহদি সাজার জন্য বিউটি পার্লার আছে। অন্যদিকে রয়েছে বিত্ত-বিনোদনের জন্য বিভিন্ন টেলিভিশনের শত শত প্রোগ্রামে ভরা। মানুষের এখন আর ঘর হতে বের হতে হয় না। প্রয়োজনও নেই। কারণ পৃথিবীটা আপনার হাতের মুঠোয়। যেখানে খুশি ইচ্ছা করলেই যেতে পারেন। পৃথিবীর যে কোন দেশের যে কোন শিল্পীর গান ও চ্যানেলে উপভোগ করা আপনার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। আর যদি টেলিভিশন চ্যানেল না হয়ে একটি ভালো মোবাইল কাছে থাকে তাহলে পৃথিবী আপনার হতে। যা খুশি তাই পাবেন। ব্যবহার করতে পারেন। চিত্তবিনোদনসহ পৃথিবীর জানা-অজানা চাহিদার সব তথ্য আপনি পেতে পারেন। অর্থাৎ ঈদ আনন্দ-বিনোদনসহ সব কিছু অপনার আয়ত্তের মাঝে।

সর্বোপরি যে কথা বলা দরকার সেটা হলো আগের চেয়ে মানুষের চিন্তা-চেতনা, রুচি সবকিছুই উন্নত হয়েছে। কিন্তু মৌলিকভাবে নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ঘটেনি। ঈদ-আনন্দের আসল বিষয়’ই হলো মূল্যবোধের বিকাশ সাধন। সময়ের দাবী হলো মানুষে সে আসল উন্নয়ন ঘটানো। সত্যিকারে যেন আবার সে মুসলিম ঐতিহ্য ফিরে আসে। সমাজে যেন আবার সুস্থ পরিবেশ তৈরি হয়, সে প্রত্যাশা সবার।

লেখক: কলেজ অধ্যক্ষ, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।