তখন বাজে দুপুর বারোটা; মাইকে একটি মেয়ের কন্ঠে ‘আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা জামালপুর কমিউটার ট্রেন ৪নং প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াবে।’ তখন ১০/১২ টি অল্প বয়স্ক ছেলে ৪নং প্লাটফমের পাশে এসে দাঁড়ালো। প্রায় ১০ মিনিট পর ট্রেনটি এসে প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ালে ছেলেগুলো ট্রেনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাগওয়ালা মানুষ দেখেই বলছে ‘আঙ্কেল লাগবে, ভাই লাগবে’?

বলছিলাম কমলাপুর রেলস্টেশনের শুক্রবারের কথা কিন্তু এটি এখানকার প্রতিদিনকার কথা। ওদের (ছেলেগুলোর) বয়স কতই হবে সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ বছর।

শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র, ওখানে যে শিশুদের দেখা যায় তাদের মধ্যে সবুজ ওরফে ভান্ডারী সবুজ (১২), ইউনুছ (৮), আরাফাত (৭) ও আলিফ (৮) এদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে তারা কেউ তাদের বাড়ি থেকে রাগ করে এসেছে কেউবা বন্ধুবান্ধবের চক্রে পড়ে এসেছে।

সবুজের সাথে কথা হয়, তুমি এখানে কি করো? দেখছেন না আমি এখানে মাল টানি? তুমি আর কি করো? উত্তর- আর কিছু করি না। তোমার কাছে কি মাল আছে? কি মাল বাবা/রাজা না এগুলো আমি বিক্রি করি না। কেন একজন তোমাকে দেখিয়ে দিলো যে, ভাই এগুলো নিতে হলে সন্ধ্যায় আসতে হবে। বলতে বলতে একটি ঝাল মুড়ির দোকানে এসে দু’জনে ঝালমুড়ি খাওয়া হলো, তারপর প্রতিবেদকের প্রশ্ন তুমি কারওয়ান বাজারের খালাকে চেন, হ্যাঁ চেনবোনা মানে?

এভাবেই তার সাথে কাথা হয়া আধা ঘণ্টা, ভান্ডারী সবুজ জানায় এখানে সে প্রায় ৫ বছর যাবৎ আছে। তাকে দিয়ে এখানকার বড় ভাইয়েরা মাদকের ব্যবসা করায়। তার নাম ভান্ডারী হলো কীভাবে জানতে চাইলে সে জানায় যে, সে পীর ভক্ত তাই সে থেকে তাকে সবাই ভান্ডারী বলে চেনে। সে আরো বলে এ যাবত ভান্ডারী প্রায় ৫/৬ বার জেলে গিয়েছে। প্রতি বারই সে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার কারণে জেলে গিয়ে ৩ থেকে ৬ মাস করে জেলে থেকেছে প্রতিবারই বড় ভাইয়েরা তাকে জেল থেকে ছেড়ে এনেছে।

একইভাবে প্রতিবেদকের সাথে ইউনুছ ও আরাফাতের সাথে কথা হয় তারা জানায় তারা টঙ্গি স্টেশন থেকে মাদক এনে বড় ভাইদের দেয় আর বড় ভাইয়েরা তা আন্যদের দিয়ে তা বিক্রি করায়। তারা এগুলো সেবন করে কি না তা জানতে চাইলে তারা প্রথমে স্বীকার করতে না চাইলেও পরে বলে যে তারা অল্প অল্প সেবন করছে। কিন্তু তারা বেশি সেবন করতে পারে না।

আলিফের বাড়ি খুলনায়, তার বাবা তার মাকে প্রতিদিনই মারধর করে। তার বাবাকে সে নিষেধ করলে তার বাবা তাকেও মার দেয়। তাই সে রাগ করে প্রায় ৭ মাস আগে টঙ্গিতে আসে। পরে তার এক বন্ধুর সাথে সে কমলাপুর স্টেশনে আসে। আলিফ জানায়, সে কোন মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত নয়, তবে সে মাদক সেবন করে।

আলিফ জানায় এখানে তারা ছাড়াও মেয়েদের দিয়ে মাদক দ্রব্য বিক্রি ও আনা নেওয়ার কাজ চলে। তবে সে ছোট এবং এখানে সে অল্পদিন হলে এসেছে তাই তাকে দিয়ে মাদক আনা নেওয়ার কাজ করায় না। তার সাথে বড় ভাইদের কথা হয়েছে; তারা তাকে আর কিছুদিন পর থেকে কাজ করাবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।

এভাবেই শিশুদের দিয়ে চলছে কমলাপুর এলাকার মাদক ব্যবসা। এ বিষয়ে জিআরপি পুলিশ কমলাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মজিদের সাথে কথা হলে তিনি জানান এ বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ঢাকার মাদক আনা নেয়া এখন রেল পথেই বেশি হয়, কারণ এখানে ঝুঁকি কম।

এআই, এমএ