ষড়ঋতুর এই দেশে প্রকৃতি এখন শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ফুলে ফুলে সুশোভিত। গাছে গাছে নতুন পাতা, ডালে ডালে পাখীর কলতান, মিষ্টি মধুর হাওয়া কতইনা সুন্দর মনোরম পরিবেশ। ধীর গতিতে বাতাসের বয়ে চলা জানান দিচ্ছে নতুন কিছুর। কালের পরিক্রমায় এখন আগমন হয়েছে ঋতুরাজ বসন্তের।

দু'মাস এই আবহাওয়া বিরাজমান থাকবে। তারপর আবার প্রকৃতির নতুন রূপ। নতুন ঋতু নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের মাঝে আগমন করবে। আবারও সবাই সেই ঋতুকে বরণ করে নেবে যার যার মত করে।

এই বসন্তঋতুকে নিয়ে কত গান, কত কবিতা, কত গল্প রচিত হয়েছে তার পরিমাপ করা কঠিন। কবি সাহিত্যিকগণ আমাদের সাহিত্যের ভাণ্ডার ভরে দিয়েছেন এই ঋতুকে নিয়ে লেখালেখি করে।

বসন্তের এই দিনে প্রকৃতিকে রাঙাতে ব্যস্ত থাকে পলাশ ,শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া। কচি সবুজ পাতা, লাল-হলদে ফুল বসন্তের রঙে রাঙিয়ে দেয় আমাদের প্রকৃতি। আর প্রকৃতির সেই রঙ দেখেই কোকিল গাইতে শুরু করে তার কুহু... কুহু.....চির চেনা সুরে।

বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রং ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তরঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির ওপরও রং ছড়ায়।

বায়ান্ন সালের আট ফাল্গুন বা একুশের পলাশরাঙা দিনে মাতৃভাষা ‘বাংলা' প্রতিষ্ঠার জন্য সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জববার প্রমুখ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন।

বারবার ফিরে আসে ফাল্গুন, আসে বসন্ত। শোক নয়, সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী মোকাবিলার দুর্বিনীত সাহস আর অপরিমেয় শক্তি নিয়ে। বীর সন্তানদের অমর গাঁথা নিয়ে।

ঋতুচক্র যেন এখন আর পঞ্জিকার অনুশাসন মানতে চায় না। কুয়াশার চাদরে মোড়া শীত জেঁকে বসতে না বসতেই বিদায়। প্রকৃতির দিকে তাকালে শীত-বর্ষার মতো বসন্তকেও অনেক সময় সহজে চেনা যায় না।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে ঋতুচক্রেও এসেছে নতুন ব্যঞ্জনা। সময় মতো শীত আসে না, বর্ষাও তা-ই। গ্রীষ্মের খরতাপও মানে না নিয়ম। এসবের মধ্যেও যেন অনেকটা সগৌরবে দীপ্যমান বসন্ত। প্রকৃতির এ আনন্দবার্তায় নাগরিক মনও তাই উচ্ছ্বসিত।

ষড়ঋতুর দেশে আবহমান গ্রামবাংলার প্রকৃতিতেই মূলত বসন্ত জানান দেয় তার আগমনীবার্তা। গ্রামের মেঠোপথ, নদীর পাড়, গাছ, মাঠভরা ফসলের ক্ষেত বসন্তের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। চোখ বুজলেও টের পাওয়া যায় এসব দৃশ্যপট।

তবে নগরজীবনেও বসন্তও ছন্দ তোলে মৃদু হিল্লোলে। কংক্রিটের নগরীতে কোকিলের কুহুস্বর ধ্বনিত হয় ফাগুনের আগমন সামনে রেখে। যানজট, কোলাহল ছাপিয়েও যেটুকু প্রকৃতি খুঁজে পাওয়া যায় নগরে, একেই অতি আপন করে নেন নগরের কর্মব্যস্ত মানুষ।

যতই নিষ্প্রাণ, হিসেবি, প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন হন না কেন, বসন্তের এ দিনে তারা গেয়ে ওঠেন ‘বসন্ত ছুঁয়েছে আমাকে/ ঘুমন্ত মন তাই জেগেছে...।’ নেচে ওঠে তাদের মন। যেন তাদের ‘হারিয়ে যেতে আজ নেই মানা।’

এআর