আজ ঐতিহাসিক ৭ জুন। ৬ দফা দিবস। ১৯৬৬ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে হরতাল পালন করা হয়। হরতাল চলাকালে পুলিশ ও তৎকালীন ইপিআর-এর গুলিতে তেজগাঁর শ্রমিক মনু মিঞা, নারায়ণগঞ্জের শফিক, শামসুলসহ অন্তত ১০ জন শহীদ হন। সেই দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে আজও দিবসটি পালন করা হয়।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত ৬ দফা আন্দোলনই ছিল তদানীন্তন দেশের রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তাসখন্দ চুক্তিকে কেন্দ্র করে লাহোরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের সাবজেক্ট কমিটিতে ৬ দফা উত্থাপন করেন এবং পরের দিন সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানান। কিন্তু এই সম্মেলন যেহেতু তাসখন্দ চুক্তিকে কেন্দ্র করে বসেছিল সেজন্য বঙ্গবন্ধুর এ দাবি আয়োজক পক্ষ প্রত্যাখ্যান করে।

তবে শেখ মুজিবুর রহমান সম্মেলনে যোগ না দিয়ে লাহোরে অবস্থানকালেই ৬ দফা উত্থাপন করেন। তার এই ৬ দফা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন খবরের কাগজে তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চিহ্নিত করা হয়। পরে ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধু ১৩ মার্চ ৬ দফা এবং এ ব্যাপারে দলের অন্যান্য কর্মসূচি আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদে পাশ করিয়ে নেন।

৬ দফায় মূল বক্তব্য ছিল: ১. পাকিস্তানকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেখানে সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকার ও প্রাপ্ত বয়স্কদের সরাসরি ভোটে সংসদ গঠিত হবে, ২. প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় ছাড়া আর সব ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকবে, ৩. পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে দু’টি পৃথক ও সহজ বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে, ৪. সব ধরনের কর ও শুল্ক ধার্য ও আদায় করার দায়িত্বে থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে, ৫. দুই অঞ্চলের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার আলাদা হিসাব থাকবে এবং ৬. পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ঝুঁকি কমানোর জন্য এখানে আধা-সামরিক বাহিনী গঠন ও নৌবাহিনীর সদর দফতর স্থাপনের দাবি জানানো হয়।

বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফা দাবির মুখে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ৬ দফা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে অস্ত্রের ভাষায় উত্তর দেয়া হবে।

এদিকে ৬ দফা কর্মসূচি জনগণের মাঝে পৌঁছে দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা সমগ্র পূর্ববাংলা সফর করেন এবং ৬ দফাকে বাঙালির বাঁচার দাবি হিসেবে অভিহিত করেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান চৌধুরী, জহুর আহমদ চৌধুরী প্রমুখ গণসংযোগে অংশ নেন। যশোর, ময়মনসিংহ এবং সিলেটসহ অন্য কয়েকটি স্থানে ৬ দফার পক্ষে প্রচারকালে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হন।

১৯৬৬ সালের ১৩ মে আওয়ামী লীগ আয়োজিত পল্টনের এক জনসভায় ৭ জুন হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। জুন মাসব্যাপী ৬ দফা প্রচারে বিপুল কর্মসূচি নেয়া হয়। ৭ জুন তেজগাঁওয়ে বেঙ্গল ব্যাভারেজের শ্রমিক সিলেটের মনু মিয়া গুলিতে শহীদ হন। এতে বিক্ষোভের প্রচণ্ডতা আরো বেড়ে যায়। আজাদ এনামেল অ্যালুমিনিয়াম কারখানার শ্রমিক আবুল হোসেন ইপিআরের গুলিতে শহীদ হন।

একই দিন নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনের কাছে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ৬ জন শ্রমিক। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সন্ধ্যায় কারফিউ জারি করা হয়। হাজার হাজার আন্দোলনকারী মানুষ গ্রেপ্তার হয়। বহু জায়গায় জনতা গ্রেপ্তারকৃতদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। ৬ দফাভিত্তিক আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। শহীদের রক্তে আন্দোলনের নতুন মাত্রা গড়ে ওঠে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের আন্দোলন।

দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন সামাজিক- সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করবে।

জেডআই