বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহ জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো ২৩ এপ্রিলকে 'বিশ্ব গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস' ঘোষণা করে।

এই দিনটিকে গ্রন্থ দিবস হিসেবে নির্বাচনের অন্তরালে মূল কারণ হচ্ছে, এ দিনেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের দুই মহান ব্যক্তি শেক্সপিয়র ও সারভান্তেস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশেও যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশে ২০০০ সাল থেকে পালিত হচ্ছে এ দিবসটি।

জ্ঞান, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ বইয়ের সমাহার হলো পাঠাগার। যার ইংরেজি শব্দ হলো লাইব্রেরি। খ্রিস্টের জন্মের দুই হাজার বছর পূর্বে আসিরীর রাজ্যে পৃথিবীর সর্বপ্রথম লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সে সময় আজকের মতো ছাপার অক্ষরে বই আকারে বাঁধাই পুস্তক ছিল না। তখন মাটি ও কাঠ উৎকীর্ণ করে জ্ঞান অবিজ্ঞান, তত্ত্ব ও তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। আগের দিন উৎসাহী রাজা জ্ঞানী-গুণীদের পুস্তক এবং নিজেদের বংশীয় ইতিহাস রচনা করে সংগ্রহে রাখত। নিয়মতান্ত্রিভাবে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৪৪৭ সালে যার নাম ভ্যাটিকান লাইব্রেরি, ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের 'স্যার টমাস বডলি লাইব্রেরি', ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের রাজা-বাদশা ও সামন্ত বিদ্যোৎসাহিতার জন্য গ্রন্থের সংগ্রহশালা গড়ে তুলতেন। মধ্যযুগে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও বিদ্যালয়ের সঙ্গে গড়ে তোলা হতো গ্রন্থের সংগ্রহশালা। পৃথিবীতে প্রথম লাইব্রেরি হয় প্রাচীন রোম দেশে। তারপর মিসর, ব্যাবিলন, চীন তিব্বত ও ভারতে গ্রন্থাগার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সারা পৃথিবীতে ইসলামের বিস্তারে সময়ও লাইব্রেরি গড়ে ওঠে। আধুনিক বিশ্বে বড় বড় গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছে। লন্ডনে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, মস্কোর লেনিন গ্রন্থাগার ইত্যাদি এ লাইব্রেরিগুলোতে লাইব্রেরি বিজ্ঞানে ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ দিয়ে যুগোপযোগী ও আকর্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশেও বিখ্যাত অনেক গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটি গ্রন্থাগার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি গ্রন্থাগার, বাংলা একাডেমি লাইব্রেরি, বরেন্দ্র মিউজিয়াম লাইব্রেরি ইত্যাদি বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থাগার।

গ্রন্থ ব্যবস্থাপনা ও বই পড়াকে জনপ্রিয় করতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে আলোকিত মানুষ তৈরির লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন।পাঠাগারকে জ্ঞানের রাজ্য বলা হয়। জ্ঞানের আলোতে বিকশিত এবং সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের জন্য সখ্য গড়ে তুলতে হয় পাঠাগারের সঙ্গে। পাঠাগার থাকে হাজার হাজার বছরের অতীত হওয়া জ্ঞানী-গুণী লেখকদের মেধা ও জ্ঞানসংবলিত বই। যা পড়ে আমরা হাজার বছর পেছনে অনায়াসে যেতে পারি।জানতে পারি তখনকার সময়ের মানব সভ্যতার ইতিহাস, সমাজ সংস্কৃতি, সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা সম্পর্কে।জানতে পারি তখনকার গল্প কবিতা, উপন্যাস, নাটক, গান, পুঁথিসহ তাদের সাহিত্য চর্চার ধরন। শুধু অতীত নয় বর্তমানের লেখকদেরও নানা প্রকাশিত বইয়ের সমাহার থাকে পাঠাগার। পাঠাগার হলো অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- 'মানুষ বই দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে।মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমনি করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত তবে সে নীরব মহাশব্দের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মহাসমুদ্রের মানবাত্মার অপর আলোকে কালো অক্ষরের শৃঙ্খলা কাগজের কারাগারেব বাধা পড়িয়া আছে।'

পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বলেছেন- 'বই জ্ঞানের, বই আনন্দের প্রতীক। সৃষ্টির আদিকাল হইতে মানুষ আসিয়াছে আর চলিয়া গিয়াছে। খ্যাতিমান, অর্থ শক্তি কিছু কেহ রাখিয়া যাইতে পারে নাই। কিন্তু বইয়ের পাতা ভরিয়া তাহারা তাহাদের তপস্যা, তাহাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, তাহাদের নৈরাজ্য, কি হইতে চাহিয়া কি তাহারা হইতে পারে, সবকিছু তাহারা লিখিয়া গিয়াছে।'

বর্তমানে আমাদের দেশে বাণিজ্যিক হারে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গাণিতিক হারে শিক্ষার্থী-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।চাহিদা বাড়ছে বইয়ের। এই চাহিদা পূরণে রাজধানী শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রতিদিন প্রতিষ্ঠা হচ্ছে লাইব্রেরি। এসব লাইব্রেরি যারা পরিচালনা করছেন তাদের লাইব্রেরি বিজ্ঞানে নূ্নতম শিক্ষা প্রশিক্ষণ নেই।

সব শ্রেণি পেশার মানুষসহ শিক্ষার্থীর পাঠের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ও শিক্ষা অর্জনের পথ সুগম করতে গণগ্রন্থাগার হলো জনগণের বিদ্যালয়।একজন সৃজনশীল পাঠক গণগ্রন্থাগার থেকে সহজ শর্তে প্রয়োজনীয় বই-উপকরণ সংগ্রহ করে তার শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেন। যুগ পরিবর্তন হচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও রুচিবোধ। বিকাশ ঘটছে জ্ঞান ও গুণের। যতই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের উন্নত করছে এর পেছনে যার বিশেষ অবদান তার নাম গ্রন্থাগার। এটি চিরকাল ছিল, আছে এবং থাকবে।সরকারি পরিচালনায় জেলাভিত্তিক নড়বড়ে মানদণ্ডে লাইব্রেরির কার্যক্রম পরিলক্ষিত হলেও তৃণমূল বা ইউনিয়ন পর্যায়ে এর উপস্থিতি চোখে পড়ে না।থানাভিত্তিক পাঠাগার অতীব জরুরি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য।লাইব্রেরি শিক্ষার ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠেনি।আজ লাইব্রেরি বিজ্ঞান ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অপর্যাপ্ততার কারণে দেশে ট্রেনিংপ্রাপ্ত জনবলের জোগান সম্ভব হয় না। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরিয়ান নিয়োগে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কম খরচে নিজ এলাকা থেকে প্রশিক্ষণার্থীরা লাইব্রেরি বিজ্ঞানের ওপর জেলাভিত্তিক ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের জীবনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সহযোগিতা পেতে পারে। জেলা পর্যায়ে লাইব্রেরি ইনস্টিটিউট স্থাপনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন হোক গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য।

কেএইচ