বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০১০ সাল। তখনও সিরিয়াবাসীদের কাছে ঈদ মানে ছিল খুশি আর আনন্দ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো। নতুন জামা-কাপড় পরা। শিশুদেরকে উপহার ও সালামি দেয়া। আল্লাহ'র সন্তুষ্টির আশায় গরীব, মিসকিনদের মাঝে খাদ্য বিতরণ করা। কোরবানির গোশত বিতরণ করা। কিন্তু কয়েকটি বছরের ব্যবধানে সেই মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ মানুষের কাছে এখন ঈদ মানে 'কান্না, হতাশা আর হাহাকার'। আজ তারা শুধু খাবারই নয়, একটু আশ্রয়ের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। আর ঈদের দিন তাদের কান্না আর হতাশা যেন কয়েক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অনেকে গোলার আঘাতে স্বজন হারিয়ে কাঁদছেন। অনেকের আদরের সন্তান আয়লানের মতো ভেসে যাওয়ায় নিজেই নিথর হয়ে গেছেন। কেউ সন্তানের খোঁজ খবরই জানেন না। সন্তান বেঁচে আছে না কি মারা গেছে, তাও জানা নেই অনেকের।

ইউরোপে পাড়ি দেয়ার পর বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন শরণার্থীরা। সমুদ্রের লোনা জল, উত্তাল ঢেউ, পুলিশের টিয়ার গ্যাস, রাবার গুলি, লাঠিপেটা, সাংবাদিকের লাথি, নো ম্যান্স ল্যান্ডে বৃষ্টির মধ্যে সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকা, এক দেশের সীমান্ত থেকে অন্য সীমান্তে পায়ে হেঁটে পাড়ি দেয়া, আশ্রয় শিবিরে এক রুমের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে জীবন পার করা, অনিশ্চিত ভবিষ্যত- এগুলোই এখন শরণার্থীদের জীবন সঙ্গী।
অথচ কয়েক বছর আগে অনেকের নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। কেউ বা চাকুরি করতেন। সব মিলিয়ে শান্তিতেই জীবনটা কাটাতেন। কিন্তু আরব বসন্তের নামে মধ্যপ্রাচ্যে যে আলোড়ন শুরু হয়, তা একে একে অনেক দেশের উপর দিয়ে বয়ে যায়। আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত আন্দোলনের বাতাস বয়ে যায়। তবে অনেক দেশ শান্ত হলেও সিরিয়া অশান্তই থেকে যায়। আসাদ সরকারের বিরোধীরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আসাদও তা প্রতিহত করছেন। ফলাফল শুধু কামান আর গোলা, সঙ্গে সাধারণ মানুষের লাশের সারি।

এর মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে যোগ হয়েছে ইসলামিক স্টেট (আইএস) নামের এক দল জঙ্গি গোষ্ঠীর কুকর্ম। যারা ইরাক আর সিরিয়ার ভূমি দখল করে নিচ্ছেন। তাদেরকে প্রতিহত করার নামে বিভিন্ন শক্তি চালাচ্ছে বিমান হামলা। এই হামলায় ছারখার হয়ে যাচ্ছে একেক জন সাধারণ মানুষের স্বপ্ন। মা-বাবা হচ্ছেন সন্তানহারা। শিশুরা হচ্ছেন এতিম। নারীরা হচ্ছেন বিধবা। স্বামী হারাচ্ছেন প্রিয় স্ত্রীকে। কিন্তু লড়াই থামছে না। ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়া এখন মানুষ মরার কারখানার নাম।
এমন নানামুখী সমস্যায় পড়ে প্রাণের জন্মভূমি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। আশ্রয়ের খোঁজে যে যার মতো বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
সিরিয়ার বিধ্বস্ত ইদলিব শহর থেকে লেবাননে আশ্রয় নেয়া এক নারীর তাঁবুতে ঢুকতেই দেখা গেল তার তিন সন্তানের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোর ধারায় চোখের পানি ফেলছেন।
ঈদের দিনের দুঃখের কথা সম্পর্কে দামেস্ক থেকে আসা আমাল আল রিফি নামের ৫৫ বছর বয়সী এক নারী বলেছেন, "এই নিয়ে পঞ্চমবার ক্ষুধা আর দারিদ্র্য নিয়ে ঈদ-উল-আজহা পালন করছি। কিন্তু এবার সময়টি আরো খারাপ হয়েছে। আমি এখানে একাই আছি। আমার সন্তান ইউরোপের কোনো এক অজানা জায়গায় চলে গেছেন।"

নিজের দুঃখের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে এই মা আরো বলেন, "মনে হয়নি, অতি শ্রীঘ্রই আমার সন্তান সিরিয়ায় আবার বসবাস করতে পারবে। তাই এমন শোচনীয় অবস্থা থেকে নিজেকে ও আমাকে রক্ষা করার জন্য অনেক কষ্ট হলেও তারা ইউরোপে পাড়ি জমায়।"
ঈদের কথা উঠতেই তিনি বলেন, "বিশ্বাস করেন, আমরা ঈদ পালন করিনি। আমাদের সবচেয়ে সেরা তরুণরা সিরিয়ায় যুদ্ধে মারা যাচ্ছে। তাকরিফিদের গোলায় তিন বছর আগে আমার এক সন্তান মারা যায়। তার মাত্র ২০ বছর বয়সী আরেক ভাই জার্মানি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। লেবাননে আর কোনোভাবেই টিকে থাকা সম্ভব নয় ভেবে সে এই সিদ্ধান্ত নেয়।"
ছেলের সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, "তিন মাস আগে সাগর পাড়ি দিয়ে এক দল বন্ধুর সঙ্গে ও (ছেলে) তুরস্কে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন পর্যন্ত আমি কিছুই জানতে পারিনি। আমি জানি না, আল্লাহ না করুক ও পানিতে ডুবে গেছে, না কি এর চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে, না পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেলে আছে। আমি শুধু দোয়া করতে পারি, ও যেন ঠিক মতো জার্মানি যেতে পারে।"
ছেলের লেখাপড়া সম্পর্কে জানিয়েছেন যে সে কম্পিউটার বিজ্ঞানে অ্যাডভান্স ডিগ্রি নিয়েছে। কিন্তু লেবাননে এসে প্রতি মাসে মাত্র ২০০ মার্কিন ডলারে পোল্ট্রি ফার্মে কাজ করত।
তিনি এ জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করে বলেন, "আমাদের করুণ অবস্থার আসল কারণ যুক্তরাষ্ট্র। যারা গণতন্ত্র ও শান্তির নামে আমাদের উপর হামলা চালায়। এটি একটি আগ্রাসী ও অন্যায়ের দেশ।"
এদিকে ঈদের দিনে সন্তানের জন্য সামান্যতম খাদ্য আর কাপড়ই চাওয়া ছিল সিরিয়া থেকে আসা আরেক নারী ফারেস আল ওমারির। তিনি বলেন, "ঈদের সময়, (এর পরে বা আগে) আমাদের মূল চিন্তাই হচ্ছে, সন্তানের জন্য সামান্যতম খাদ্য ও কাপড় জোগাড় করা।"
তিনি আরো বলেন, "ঈদ শীতের যেনই পূর্বাভাস দিচ্ছে। তখন আগুন জ্বালানোর জন্য ও তাঁবু মজবুত রাখার বিষয়টি এখনই বিবেচনা করা উচিত।
আল ওমারি নামের একজন বলেন, "সিরিয়া সমস্যা সমাধান ছাড়া ঈদ আমাদের কাছে অর্থহীন। বিশ্বের কাছে আমাদের মূল দাবি হচ্ছে, দয়া করে আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বন্ধ করুন। আপনাদের মতো আমাদেরও নিরাপদে থাকার অধিকার আছে।"
এদিকে আব্দুল গফুর নামের এক ব্যক্তি অতি রাগান্বিত হয়ে বলেছেন, "কোথায় আরবদের তেলের টাকা। তারা আমাদের পরিত্যাগ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও এর বন্ধুদের কাছে আমাদেরকে বিক্রি করে দিয়েছে।"
তুরস্কেও লাখ লাখ সিরিয়ান আশ্রয় নিয়েছেন। তবে সবার ভাগ্যই সমান। সিরিয়ার আলেপ্পো থেকে আসা বায়ান আলেভাট নামের একজন বলেন, "সিরিয়াতে ঈদ ছিল আমাদের কাছে এক মহা আনন্দ উৎসব। সেগুলো এখন খুব মিস করছি।" আলেভাট তার অন্য সাত বোনের সঙ্গে এক রুমে এখন জীবন পার করছেন।
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০১১ সাল থেকে দেশটি ২০ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে।
মুসলিম প্রধনা রাষ্ট্র তুরস্কের সিভিল সোসাইটি ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে শরণার্থীদের মাঝে গোশত বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হয়।
মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে বিভিন্ন সংগঠন ঈদের দিন শরণার্থীদের মাঝে গোশত বিতরণের সিদ্ধান্ত নিলেও ইউরোপে শরণার্থীদের আশ্রয় নিয়ে চলছে একের পর এক বৈঠক। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ শরণার্থীদেরকে আশ্রয় দেয়ার পক্ষেই নয়।
স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী কড়া ভাষায় বলেছেন যে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে তার দেশ একজন শরণার্থীকেও আশ্রয় দিবে না। যদিও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের সভায় কোটা ব্যবস্থা পাস হয়েছে।
হাঙ্গেরি তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। কঠিন আইন করেছে। গত কয়েক দিন আগে ১০ হাজার শরণার্থীকে অনুপ্রবেশের দায়ে আটক করেছে। আইন পরিবর্তন করে সেনা সদস্যদেরকে অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
দোগান বার্তাস সংস্থা জানিয়েছে, সংঘাত আর গোলাগুলির মধ্যেও তুরস্ক থেকে ৫ হাজার শরণার্থী পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে সিরিয়ায় ফিরে গেছেন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার শরণার্থী ইউরোপে পাড়ি দিয়েছেন। আর সাগর পার হতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ২ হাজার ৬০০ জন মারা গেছেন।
জেডআই





