বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে ২৫ বৈশাখে বর্ণাঢ্য আয়োজনে জন্ম-জয়ন্তি পালিত হলেও ২২ শ্রাবণ তার প্রয়াণ দিবস পালনে নেই কোনো আয়োজন।

অন্যান্য আর দশটা দিনের মতোই বর্ণহীন নিস্প্রাণ সাদামাঠাভাবে কেটে যাচ্ছে দিনটি। এতে অনেকটাই ক্ষুব্ধ রবীন্দ্র প্রেমী ও ভক্তরা।

রবীন্দ্রপ্রেমী গৌতম কুমার রায় জানান, ছয়টি ঋতুর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্য কর্মের সিংহভাগ জুড়ে বর্ষাকে আলিঙ্গন করেছেন। এমনকি তিনি সর্বশেষ তার জীবনের শেষ প্রয়াণ সমর্পণ করেছেন এই বর্ষা ঋতুর ২২ শে শ্রাবন।

তাহলে রবীন্দ্রনাথকে কেবলমাত্র ২৫ শে বৈশাখ জন্ম-জয়ন্তিতে স্মরণ করলেই যথার্থ মূল্যায়ন হয় কি? তার প্রয়াণ দিবসকে খাটো করে দেখা হবে এটা নির্মম পরিতাপের বিষয়।

দর্শনার্থী শাখাওয়ার হোসেন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানান, কবি গুরুর সাহিত্য কর্মকে আজকের প্রজন্মের মাঝে আরো বেশী করে তুলে ধরার জন্য তার প্রয়াণ দিবসের গুরুত্ব কম নয়।

রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ কুষ্টিয়ার সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার সাহা বলেন, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু দিবসটি সরকারি বা জাতীয়ভাবে কুঠিবাড়িতে কেন পালিত হয় না সে বিষয়ে কোনো সদুত্তোর আমাদের জানা নেই।

দিবসটি ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহল পালনের আয়োজন না করায় জেলার রবীন্দ্র ভক্তরা মিলে প্রতি বছর ছোট পরিসরে কুষ্টিয়া পৌরসভার উদ্যোগে শহরের টেগর লজে পালন করে থাকেন। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যাশা প্রতি বছর কবির প্রয়াণ দিবসটিও পালনে সংশ্লিষ্ট মহল গুরুত্বসহ বিবেচনা করবেন বলে আমি আশা করি।

কুষ্টিয়ার পৌর মেয়র ও টেগর লজের সভাপতি আনোয়ার আলী জানান, সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত কুষ্টিয়ার মাটিকে ঐতিহ্যমণ্ডিত করার অন্যতম আধার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরণধন্য কাব্যতীর্থ শিলাইদহের কুঠিবাড়ি।

সেখানে আড়ম্বর আয়োজনে জন্ম দিবসটি পালিত হলেও প্রয়াণ দিবসে কোনো আয়োজন না থাকায় কুষ্টিয়া পৌরসভার উদ্যোগে প্রতিবছর ঘরোয়াভাবে শহরের টেগর লজে পালিত হয়।

তিনি বলেন, আমি মনে করি শিলাইদহ কুঠিবাড়ি প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দারুণভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে চলেছে। সবকিছুর ঊর্দ্ধে উঠে কবির প্রয়াণ এদিবসটিও সমগুরুত্বসহ বিবেচনা করার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান করছি।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও রবীন্দ্র গবেষক ড. সারোয়ার মুর্শেদ বলেন, রবীন্দ্রনাথের কাছে আমরা নানাভাবে ঋণী। তেমনিভাবে রবীন্দ্রনাথ নিজেও পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের কাছে সমানভাবে ঋণী।

কুষ্টিয়ার শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্য কর্মের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র বাউলে পরিণত হয়েছিলেন। শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে জন্ম দিবসটি যেভাবে আড়ম্বর পূর্ণ আয়োজনে পালিত হয়।

কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি যে, ২২ শে শ্রাবণ মৃত্যু দিবসকে ঘিরে প্রশাসনিক বা জাতীয়ভাবে বিশেষ করে শিলাইদহে কোনো অনুষ্ঠান হয় না।

তিনি আরো বলেন, এ দিনটিতে শহরে কিছু বিচ্ছিন্ন আয়োজনে ছোট খাটো আকারে ঘরোয়াভাবে টেগর লজে পালিত হয়। কিন্তু আমরা আশা করে থাকি, যেখানে রবীন্দ্রনাথ 'সোনার তরী' থেকে 'গীতাঞ্জলী' লিখেছেন। লিখেছেন অসংখ্য ছোট গল্প, পদ্মা এবং শিলাইদহের পটভূমিতে অনেক কাব্যও লিখেছেন।

নাটকও লিখেছেন, 'অচলায়তন' থেকে শুরু করে আরো অনেক রচনা রয়েছে যেগুলি শিলাইদহে থেকেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন। অথচ সেই শিলাইদহ ২২ শে শ্রাবণে বড় বেশি অবহেলিত থাকে। এটা আমাদের জন্য খুব পরিতাপের বিষয়। এটা আমাদের দুঃখের বিষয়।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী জানান, আমার জানামতে শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে ১৯৬৬ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে একবারই মাত্র মৃত্যু দিবসটি পালন করা হয়েছে। ঐ অনুষ্ঠানে দেশের তৎকালীন খ্যাতনামা কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পুরোধাবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

সেই ধারাবাহিকতায় শিলাইদহে যথাযোগ্য মর্যাদায় রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবসটিও পালিত হওয়া উচিৎ ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন বলেন, শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস পালন না করার বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

অতীতে কখনও কুঠিবাড়িতে এই দিবসটি পালিত হয়েছে কি না সেটাও ফাইলপত্র দেখে বলতে হবে।

এমকে