১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। পাক হানাদার বাহীনি তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে একাত্তরের এ দিন মেতে ওঠে বাংলার বুদ্ধিজীবী হত্যায়। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাঙালি জাতি যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পাক বাহীনি এ পরিকল্পনা করে। এ পরিকল্পনাকে সামনে রেখে এ দেশের রাজাকার ও আল বদর বাহিনী আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।

কারফিউ দেয়া ঢাকায় রাতের আঁধারে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও নীলনকশা অনুযায়ী দেশের মেধা ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কবি, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ তথা বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্বিচারে হত্যা করা হয়।

এদিকে যুদ্ধবিরতি করে আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া না দেয়ায় ভারতীয় বোমারু বিমান আবার ঢাকায় পাক বাহীনি উপর বোম্বিং শুরু করে। গভর্নর হাউস বর্তমানের বঙ্গভবনে বোমা ফেলা হলে ভূগর্ভস্থ কুঠরিতে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বেঁচে যাওয়া গভর্নর আবদুল মালেক এ দিন পদত্যাগ করে আশ্রয় নিরাপদ জোন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমান রুপসী বাংলা)। মন্ত্রিসভার আরও কয়েকজন পদত্যাগ করে এই হোটেলেই আশ্রয় নেন। তখনও ঢাকায় কারফিউ চলছিল।

অন্যদিকে মিত্রবাহিনীর ভারতীয় জেনারেল মানেকশ পূর্বাঞ্চলের পাকিস্তানি কমান্ডার জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পণের জন্য শেষবারের মতো নির্দেশ দেন। তার এই নির্দেশ আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতারে ঘন ঘন প্রচার করা হয়। ভারতীয় বোমারু বিমান ঢাকার আকাশে চক্কর দিয়ে বোমা নিক্ষেপ করলেও স্বাধীনতা উন্মুখ বাংলার অকুতোভয় সন্তানরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঘর ছেড়ে রাস্তায় এসে বিমানকে অভিনন্দন জানাতে থাকে। অবরুদ্ধ পাক বাহিনী যাতে ঢাকা থেকে পালাতে না পারে তার জন্য মুক্তি ও মিত্রবাহিনী চারদিক থেকে নিশ্ছিদ্র বেষ্টনি তৈরি করে রাখে। তখনও খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলতে থাকে টঙ্গীর অদূরে তুরাগ নদীর ওপারে, ডেমরার কাছে, মানিকগঞ্জে, চট্টগ্রামে ও বগুড়ায়।

হেলিকপ্টারের সাহায্যে গোমতী নদী পার হয়ে মেঘনার তীর বৈদ্যেরবাজারে অবস্থান নেয় যৌথবাহিনী। যুদ্ধে টিকতে না পেরে ময়নামতিতে ১৬৩৪ জন সেনা ও অফিসার আত্মসমর্পণ করে। জয় বাংলা স্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে বিজয়ীর বেশে মুক্তিবাহিনীর বিশাল বহর অগ্রসর হতে থাকে ঢাকার দিকে।

একাত্তরের এ দিন জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো। নিরাপত্তা পরিষদের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সোভিয়েত রাশিয়া তৃতীয়বারের মতো ভেটো দেয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ক্ষুব্ধ হয়ে রুশ-মার্কিন বৈঠক বর্জনের হুমকি দেন। ভারতও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের আগে যুদ্ধ বন্ধ না করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। মুক্তিবাহীনি ও মিত্রবাহীনি যৌথভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যান।

এমআর/ এএইচ