ফকির লালন জীবনভর সন্ধান করেছিলেন অজানা এক অচিন পাখিকে।আর সেই অচিন পাখির সন্ধানে গুরেছেন পাগল হয়ে।এই অচীন পাখি খুজতে লালন দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছিলেন সেই অচিন পাখির আশায়।

খাজার নামে পাগল হইয়া
ঘুরি আমি আজমীর গিয়া রে।
এত করে ডাকলাম তারে,
তবু দেখা পাইলাম না।
পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না,
মুর্শিদ আছে দেশে দেশে,
এই জগতে কত বেশে রে,
ধরতে পারলে পাবিরে তুই,
বেহেশতেরি নাজরানা,
পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না,
অচিন পাখির পাগল সেই মানুষটা একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন,
যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হরিশপুর গ্রামে জন্ম হয় এক নবজাতক শিশুর। এই শিশুটিই পরবর্তীকালে হয়ে উঠেন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, ছুটলেন সেই অচীন পাখীর সন্ধানে।হয়ে উঠলেন বাউল সাধক,
মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক এবং অসংখ্য অসাধারণ গানের গীতিকার,সুরকার ও গায়ক। যার নাম ফকির লালন শাহ (জন্ম ১৭৭৪- মৃত্যু ১৭,অক্টোবর ১৮৯০ সালে)
গবেষকদের একাংশ মনে করেন লালন মুসলিম পরিবারের সন্তান। পিতা দরিবুল্লাহ দেওয়ান, মাতার নাম আমিনা খাতুন। মূলত লালনকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করে গবেষকরা নানান সময়ে হিন্দু বা মুসলমান বানানোর চেষ্টা করেছেন। লালনের জন্ম সম্পর্কে আজো পর্যন্ত কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব হয়নি। এতদসত্বেও বিশ্বজুরে চলছে লালন বন্দনা।

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ বুঝাতে গিয়ে লালন সমগ্র মানুষকে অখন্ড জ্ঞান করেছেন। জাত -কুলের তোয়াক্কাহীন লালনের কাছে সব মানুষই সমান।

জন্মের কারণে কেঊ হিন্দু, কেউ মুসলমান সকলই একই স্রষ্টার জীব। নদীর জলের যেমন কোন আলাদা জাত নেই। ব্রাহ্মণ চন্ডাল চামার মুচি সকলেই তো এক জলেতেই শুচি হয়। জলতো কাউকে ভেদাভেদ করে না। এ  জাত নিয়ে লালনের জনপ্রিয় লেখা গান***

জাত গেলো জাত গেলো বলে
এ কি আজব কারখান !
সত্য কাজে কেউ নাই রাজি
সবই দেখি তা না না না,
আসবার কালে কি জাত ছিলে
এসে তুমি কি জাত নিলে
কি জাত হবা যাবার কালে
এ কথা ভেবে বল না,
ব্রাহ্মন চন্ডাল চামার মুচি
এক জলেতে সবাই শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি
যম তো কাকেও ছাড়বে না ।
এ কি আজব কারখান !

ফকির লালন জীবনভর সন্ধান করেছেন অচিন পাখিকে। এই অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি দার্শনিকের মতো পদে পদে প্রশ্ন করেছেন। এ পর্যন্ত সংগৃহীত গানগুলোকে সংখ্যাগত দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় গড়ে পাঁচ গানের মধ্যে কমপক্ষে একটি প্রশ্ন সংবলিত গান আছে।

কি-কেন-কোথায়-কে বোঝে-কি আইন-কিরূপ-কি আজব-কি কালাম, কে বোঝে-কি সন্ধান-কোন দেশে-কোন সাধনে-কোন ভাষায়-কোন রসে-কার ভাবে-কেমনে-কতদিন করি-কি বলিসগো তোরা-কোন কালে-ইত্যাদি নানা কায়দায় ঘুরে ঘুরে লালন সংখ্যাতীত প্রশ্ন তুলেছেন।

খুজে চলেছেন অচীন পাখির সন্দান, যার ফলে লালনের গানগুলো পড়তে গেলে এক ধরনের ধন্ধে পড়তে হয়।

তাছাড়া প্রশ্ন করার পাশাপাশি তিনি নিজেও সে প্রশ্নের উত্তর করেননি বা কি করতে হবে তাঁর বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা নির্দেশনা দেননি। লালনের গানের এই প্রশ্ন বিষয়ে ফকির সারাফাত শাহের বক্তব্য হলো- ‘লালনের গানতো গান নয়, এটা হলো জ্ঞান-আদ্যকথা।

আর আদ্যকথা মানে অর্ধেক কথা-সব বোঝা যাবে না, বুঝে নিতি হবি’। শর্টহ্যান্ড না জানলে শর্টকথা বোঝা যাবে না’।

ফলে লালনের গানকে একনাগাড়ে বিশ্লেষণ করতে গেলে বহুমাত্রিক মনোভাব নেমে আসে। নানাবিধ ধর্মমত, প্রেম প্রার্থনা এবং বিশ্বাস বৈচিত্র্যের সিঁড়ি বেয়ে তাঁর গান নেমে এসেছে মানবতার ধারায়।

বহুবিধ গানে অন্তত এর প্রমাণ মেলে।লালন তার অচীন পাখির খোজ করেছিলেন ধর্মের মাঝেও। যেমন ইসলামি ভাবাদর্শের গানের কথাই ধরা যাক,

এলাহি আল মিনগো আল্লাহ বাদশা আলামপানা তুমি
তুমি ডুবাইয়ে ভাসাইতে পারো, ভাসাইয়ে কিনার দাও কারো
তাইতে তোমায় ডাকি আমি, বাদশা আলমপানা তুমি।

আল্লাহ বিশ্বাসের গানগুলোর পাশাপাশি নবীতত্ত্বের গানগুলোকে বিচার করলে লালনকে প্রাথমিকভাবে একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ বলেই মনে হয়।

রাসূল রাসূল বলে ডাকি
রাসূল নাম নিলে বড় সুখে থাকি।

কোথাও আবার স্রষ্টার দয়া পেতে তিনি নুহুনবী এবং নিজাম আউলিয়ার উপমা এনে মিনতি করেছেন ‘আমায় দয়া করো স্বামী’। তারপর পরপারের অনিশ্চিত জীবন নিয়ে ভাবতে গিয়ে তিনি আতংকিত হয়ে পড়েছেন।

নবী না মানে যারা, মোয়াহেদ কাফের তারা
আবার তারা খালাস পাবে, লালন বলে মোর কি হয় জানি।

ইসলাম ধর্মের পাশাপাশি লালন সনাতন হিন্দুধর্মের বিভিন্ন চরিত্র ও গুণাগুণ বিশ্লেষণ করেও নানাবিধ গান রচনা করেছেন। তাঁর গানে উঠে এসেছে নিমাই কানাই গৌরচাঁদ গৌরপ্রেম রাধাকৃষ্ণ ভারতি গোসাইসহ নানাজন। বৈষ্ণব সহজিয়া তথা চৈতন্যদেবের সাধনার পথ ধরে তিনি বেঁধেছেন

অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণনিধি
তার কি আছে কভু গোষ্ঠখেলা

কলিজীবের মুক্তির জন্য তিনি দয়াল নিতাইয়ের করুণা পেতে চেয়েছেন এবং সেই দয়ালচাঁদকে স্মরণে রেখে হরিনাম তরণি নিয়ে ভবতুফান পাড়ি দিতে বলেছেন।

হরিনাম তরণি লয়ে
ফিরছে নিতাই নেয়ে হয়ে
এমন দয়ালচাঁদকে পেয়ে
স্মরণ কেনে নিলেনা।

লালন তার মনের ভাষাকে গানে,আর গানকে বিনোদনের খোরাক হিসেবে তৈরি করলেও তার গানে ছিল আধ্যাত্বিকতার পরশ।লালন তার গানে জাত,ধর্ম,বর্ণ,ও আধ্যাত্বিকতার বিষয়গুলো এভাবেই ফুটিয়েঁ তুলতেন, এবং যার মধ্যে খুজতেছিলেন অচীন পাখির পরশ,

‘খাচার ভিতর অচীন পাখি
ক্যামনে আসে যায়
ধরতে পারলে মনো-বেড়ি
দিতাম পাখির পায়।’
কিন্তু আজও পাওয়া হলোনা লালনের সেই অচীন পাখির সন্দান। এভাবেই ইতি ঘটলো এক বাউল সাধকের।গাইতে গাইতে ঘটলো একটি চন্দময় জীবনের সমাধি।

এসএম