ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহাদৎ হোসেন হাজরার (৫৩) মৃত্যুর পর এ রোগটি নিয়ে আতঙ্ক বেড়েছে জনমনে। সম্প্রতি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে ডেঙ্গু মহামারি আকারে রূপ নিতে বাকি নেই বলে মন্তব্য করা হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
এরই মধ্যে এপ্রিল থেকে জুলাইয়ে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১২ জন। যদিও পাঁচ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে। গত বছর একই সময়ে মৃত্যু হয়েছিল সাতজনের। সরকার ডেঙ্গুতে আক্রান্তের যে সংখ্যা প্রচার করছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৬০৪৫ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী। সরকারি হিসেবে ডেঙ্গু জ্বরে মৃতের সংখ্যা ৫ জন হলেও বেসরকারি হিসেবে মারা গেছেন ২২ জন।
শুধু সোমবার (২২ জুলাই-২০১৯) দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৯০ জন।
তবে এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে একযোগে কাজ শুরু করেছে। বাড়ির পাশের আঙিনা ও নোংরা পানি পরিস্কারে কোনো বাড়ির মালিক বাধা হয়ে দাঁড়ালে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনারও ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডেঙ্গু আতঙ্কে জ্বর হলেই হাসপাতালে ছুটছেন রোগীরা। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ফিভার ক্লিনিকে প্রতিদিন শনাক্ত হচ্ছেন ৫০ থেকে ৬০ জন ডেঙ্গু রোগী। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশনকে তৎপর ও জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোস্তফা কামাল রউফ বলেন, ডেঙ্গুর প্রচলিত সংকেতগুলো প্রকাশের ধরণ পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে ডেঙ্গু রোগীর শারীরিক জটিলতা বাড়ছে।
স্থান সংকুলানের অভাবে অন্য ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেয়ার কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকিতে হাসপাতালের অন্য রোগীরা রয়েছেন বলে জানিয়েছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের প্রচুর তরল খাবার খাওয়ার পাশপাশি জটিলতা এড়াতে রোগীর বমি, পেট ব্যথা, শরীরে র্যাশ, বিভিন্ন স্থান দিয়ে রক্ত বের হওয়া ও প্রস্রাব কমে যাওয়া অথবা দীর্ঘ সময় প্রস্রাব না হওয়া জাতীয় উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
জানা গেছে, রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কাঁচাবাজার এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি। এতে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর আহমদ বাউয়ানি স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র মো. ফাহিম ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, এবার ডেঙ্গুর ব্যতিক্রমী চেহারা দেখা যাচ্ছে। আক্রান্তদের অধিকাংশের প্ল্যাটিলেট কমে যাচ্ছে। মস্তিষ্ক হূদযন্ত্র, যকৃত ও কিডনির মতো নানা অঙ্গ আক্রান্ত করছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বর হলে গাফিলতি না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশন ব্যর্থ হওয়ায় নগরবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রোববার রাত সোয়া ১০টার মারা যান হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহাদৎ হোসেন হাজরা। রাত ২টায় মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন সিভিল সার্জন অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ শাহ আলম। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
এদিকে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তীব্র সমালোচনা করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে আদেশ দেওয়ার পরও সিটি করপোরেশন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। প্রতিবছর জনগণের করের টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে কিন্তু মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। মশা নিয়ন্ত্রণে এর আগে প্লেন থেকে ওষুধ ছিটানো হলেও এখন সেরকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন আদালত।
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ
এ জ্বরে শরীরে তীব্র তাপমাত্রা থাকে। হাত-পা-মাথা ও পিঠে প্রচন্ড ব্যথা হয়। শরীরের জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা এবং রেশ উঠে। এবার মানুষজন বেশি আতঙ্কিত হচ্ছে এ কারণে যে, একাধিকবার আক্রান্ত ব্যক্তিরাও এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ডেঙ্গু হেমোরেজিকের সংখ্যাই বেশি। সঠিক চিকিৎসা না হলে এ ধরনের রোগীদের মৃত্যু হতে পারে। এ বছরের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ হলো- জ্বরে তাপমাত্রা বেশি না হওয়া, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, ৪-৬ ঘণ্টা প্রস্রাব না হওয়া বা কম হওয়া, খুব বেশি দুর্বল হয়ে পড়া, নিদ্রাহীনতা ও আচরণের আকস্মিক পরিবর্তন।
প্রতিরোধ
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশার উপদ্রব থাকে বেশি। এই সময়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজনন বাড়ে। ফলে রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু রোগ।
বাড়িঘর বা বাড়ির আঙ্গিনার কোথাও যেন পানি জমে না থাকে- এটুকু সচেতন হলেই সহজে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব। কিন্তু এই সচেতনতা সৃষ্টিতেও সিটি করপোরেশন ব্যর্থ হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন।
নাসির সোয়েব/জেড





