‘মানসিক স্বাস্থ্যে মর্যাদাবোধ- সবার জন্য প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা’। মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক রোগ ও এর চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় জনগণের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
অনেক সময় মানসিক রোগে আক্রান্তরা লোকলজ্জা ও অসম্মানের ভয়ে তা প্রকাশ করতে চান না এবং চিকিৎসা নিতে লজ্জাবোধ করেন, যা শারীরিক রোগের ক্ষেত্রে (হৃদরোগ, ডায়াবেটিস) দেখা যায় না।
এ জন্য জনসচেতনতার অংশ হিসেবে প্রতিবছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। মানসিক রোগ চিকিৎসা সম্পর্কে বিদ্যমান ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার দূর করতে পারলে মানসিক স্বাস্থ্য আরও মর্যাদার আসনে সমুন্নত হবে ও জনগণের চিকিৎসাপ্রাপ্তি সহজতর হবে।
২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৮৯ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪৫ জন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী দেশের পূর্ণবয়সী মানুষের শতকরা ১৬ দশমিক ১ ভাগ। অন্যদিকে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু কিশোরদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৪ ভাগ মানসিক রোগে আক্রান্ত। পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর এই পরিসংখ্যান সত্য ধরে নিলে এখন দেশে আনুমানিক ২ কোটি ৭২ লাখ ২ হাজার ১৯৭ জন মানসিক রোগী আছেন।
দেশে যত মানসিক রোগী আছে, তার থেকেও কয়েক গুণ বেশি আছেন, যাঁরা তীব্র মানসিক চাপে আছেন। তাঁরা যদিও অসুস্থ নন, তবে ভবিষ্যতে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। এ ছাড়া ঝড়-বন্যা-জলোচ্ছ্বাস এগুলোর কোনো অভাব নেই। যোগ হয়েছে ভূমিকম্পের বিপদ। আছে জিম্মি হওয়া বা সহিংসতার বিপদ।
মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যায়। বিভিন্ন ধরনের সংকটে যেমন-সড়ক দুর্ঘটনা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক এবং যৌন সহিংসতা, সহিংস আচরণের শিকার হওয়া। এ ধরনের প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিপদের সময় মানুষের মানসিক চাপ বাড়ে ও মানসিক রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
‘ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ’নামে একটি সংস্থা ‘সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইড’বা প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বলে একটি ধারণাকে ব্যবহারের প্রস্তাব করছে। কেউ হাত ভেঙে গেলে বা কেউ আহত হলে যেমন সচেতন মানুষ তার প্রাথমিক পরিচর্যা করে সম্ভাব্য স্বল্প সময়ে চিকিৎসকের কাছে নেন, তেমনি মানসিক চাপ ও অসুস্থতারও প্রাথমিক পরিচর্যা করা সম্ভব।
এ ধরনের পরিচর্যার জন্য দরকার ভালো মানুষ হওয়া, মানুষের জন্য মায়া থাকা ও ‘সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইডের’ওপর সীমিত প্রশিক্ষণ। এর জন্য মনোবিজ্ঞানী বা ডাক্তার কিছুই হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে কেউই সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইড দিতে পারেন।
পৃথিবীর অনেক যুদ্ধ, মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত দেশে এ ধরনের ফাস্ট এইড ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। আমরা এর সফল প্রয়োগ শুরু করতে পারি। এতে বিশেষজ্ঞ সেবার আগেই মানুষ একটা তাৎক্ষণিক প্রাথমিক সেবা পাবে। এতে তাঁর মধ্যে পুরোমাত্রায় মানসিক বিপর্যয় ঘটবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১১ সালের এ বিষয়ক গাইডের মতে ‘সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইডের’নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য রয়েছে :-
>>বিপর্যস্ত বা বিপন্ন মানুষের জন্য বাস্তব সমর্থন দেওয়া। তবে জোর করে কোনো সমর্থন দেওয়া চলবে না।
>>মানুষের কী প্রয়োজন এবং এই বিপন্ন মানুষগুলো নিজেদের কী প্রয়োজন মনে করছে, তা মূল্যায়ন করা।
>>মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার চেষ্টা করা, যেমন : খাবার, পানি, তথ্য, আশ্রয় ইত্যাদির ব্যবস্থা করা।
>>মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শোনা। তবে কথা বলার জন্য তাকে চাপ না দেওয়া।
>>সান্ত্বনা ও সমর্থন দেওয়া।
>>প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া, কী কী সাহায্য আছে তা জানানো।
>>অধিকতর যেন ক্ষতি না হয়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা, অর্থাৎ নিরাপত্তা ইত্যাদি নিশ্চিত করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যারা ‘সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইড’দেবে তাদের মানুষ কতটা বিপন্ন হয়েছে, বিপন্ন হওয়ার প্রকৃতিটি কী, এই মানুষগুলোর জন্য কী কী প্রয়োজন, বিপন্ন মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আছে কি না, যাদের কোনো বিশেষ প্রয়োজন আছে সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
‘সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইড’দেওয়ার সময় বৃদ্ধ, শিশু-কিশোর, যেই মানুষদের পঙ্গুত্ব আছে, যেমন: শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী, গর্ভবতী মা- এ ধরনের মানুষদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।
সেবাদাতাদের যাঁদের তাঁরা সেবা দিচ্ছেন, সেই মানুষের প্রতি, তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সেবাদাতাদের নিজেদের যত্ন গ্রহণ সম্পর্কেও যত্নশীল হতে হবে। কোনো বড় ধরনের দুর্যোগের পর ত্রাণ তৎপরতায় অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলে ‘সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইড’দেওয়া উত্তম। ‘সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইড’জটিল নয় মোটেও।
‘সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইডের’মতোই প্রায় একই ধরনের আরেকটি ধারণা হচ্ছে ‘মেন্টাল হেলথ ফাস্ট এইড’। বাংলাদেশে ‘ইনোভেশন ফর ওয়েলবিয়িং’বলে একটি সংগঠন এর ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। নেটে সার্চ দিলেই তাদের তথ্য পাওয়া যাবে।
আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস: বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও ১০ অক্টোবর জাতীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। ‘ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ’নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতৃত্বে ২০০৩ সাল থেকে নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ বছরে এই দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘মানসিক স্বাস্থ্যে মর্যাদাবোধ: সবার জন্য প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা’।
এই স্লোগানটি বাস্তবায়ন করলে সীমিত জনশক্তি নিয়েও আমরা মানসিকভাবে অসুস্থ ও মানসিক অসুখের ঝুঁকিতে থাকা মানসিক চাপগ্রস্ত মানুষদের সেবা নিশ্চিত করতে পারব।
দেশজুড়ে সকল বিভাগের অভিজ্ঞ ডাক্তারদের খোঁজ পেতে ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে ভিজিট করুন- www.doctorola.com
এমবি





