আদিবাসী জনগণকে শুরুতে প্রথম জাতি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, আদিম মানুষ, উপজাতি প্রভৃতি নামে চিহ্নিত করা হত। আদিবাসী শব্দটির প্রকৃত সংজ্ঞা ও তাদের অধিকার নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার পরেও আদিবাসীদের ব্যাপারে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য কোন সংজ্ঞায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি।
সাধারণত কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অনুপ্রবেশকারী বা দখলদার জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বে যারা বসবাস করত এবং এখনও করে; যাদের নিজস্ব আলাদা সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ রয়েছে; যারা নিজেদের আলাদা সামষ্টিক সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা সমাজে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত, তারাই আদিবাসী।
আমেরিকার প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ লুইজ মর্গান যাকে আমেরিকার নৃবিজ্ঞানের জনক বলা হয়, তার সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী, যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।
মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial ….. They are the true Sons of the soil…. (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972) ।
অপরদিকে নৃতত্ত্ববিদ T.H Lewin-এর মতে, ‘A great portion of the Hill tribes, at present living in the Chittagong Hills, undoubtedly came about two generations ago from Arakan. This is asserted both by their own traditions and by records in the Chittagong Collectroate (1869, P. 28)„
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর ড, আবদুর রব বলেছেন, আদিবাসী বলতে ইংরেজিতে Aboriginals বা indigenous people-ও বলে। উপজাতি হলো Tribe এটা উপনিবেশিক শব্দ।
আমাদের দেশে বাঙালি মূলধারার বাইরে যারা আছেন তারা আদিবাসী নয়। তাদের আমরা উপজাতি বলতেও নারাজ। বরং তাদেরকে বলা যেতে পারে ethnic বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ।
বাংলাদেশে আদিবাসী:
বাংলাদেশ একটি বহুজাতিক, বহুমাত্রিক, বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর বাসস্থল; বৈচিত্র্যময় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অধিকারী একটি দেশ। এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বহুসংখ্যক জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করে আসছেন।
সর্বশেষ তথ্যমতে বাংলাদেশে ২৭ ধরণের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠি রয়েছে। দেশের পাহাড়ি অঞ্চল তথা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেই তাদের বসবাস বেশি। বাঙালিদের সাথে একই ভৌগলিকসীমারেখার মধ্যে বসবাস করলেও এই সব জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদাআলাদা ভাষা, ঐতিহ্য, সাহিত্য, লোকগাথা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও স্থানীয় জ্ঞান। তাদেরকেই বর্তমানে 'আদিবাসী' হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা চলছে।

মূলত ভারত ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব উপজাতি বসবাস করে তারা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এ জনপদে তাদের স্থায়ী আবাসভূমি গড়ে তুলেছে। তারা কেউই এখানকার আদি বা স্থায়ী বাসিন্দা বা ভূমিজ সন্তান নয়। এ কারণে উপজাতিরা বাংলাদেশের আদিবাসী নয়। তাদের এ দাবির কোনো গ্রহণযোগ্যতাও নেই। বাঙালিরাই এ দেশের মূল বাসিন্দা বা আদিবাসী।
বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী উপজাতি বা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠিকে আদিবাসী বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সরকার। এমনকি শুরু থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে এর বিরোধীতাও করা হচ্ছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকায় পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তিতে পার্বত্যবাসীদের উপজাতি বলা হয়েছে, আদিবাসী নয়।[The Chittagong Hill Tracts (CHT) peace accord was signed on December 2, 1997 ... The term ‘Upajati’ shall be in force.(উপজাতি কথাটি ব্যবহার করা হবে)]
আদিবাসী ইস্যু নিয়ে ২০১১ সালের ২৫ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কূটনীতিক এবং দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম কম্বোডিয়া থেকে ১৭০০ সালের দিকে এসেছিল কুকিরা। চাকমারা আসে আরাকান থেকে আরও ১০০ বছর পর।
১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ব্রিটিশ আইনে এদের উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তিতেও তাদের উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান সংবিধানে তাদের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এখানে আদিবাসী নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতেও বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের কোন আদিবাসী নাই।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রানালয় একটি পরিপত্র জারি করে জানিয়ে দেয় যে “উপজাতি” শব্দের পরিবর্তে “আদিবাসী” শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না।
সর্বশেষ ৭ আগস্ট, ২০১৪ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের দু’দিন আগে সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়।
বিভিন্ন পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের উপজাতি:
বাংলাদেশের প্রথম আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ওই আদমশুমারিতে বিভিন্ন উপজাতিকে স্বতন্ত্রভাবে গণনা করা হয়নি। তবে বিবিএস ১৯৮৪ সালের রিপোর্টে ২৪টি উপজাতি এবং মোট জনসংখ্যা ৮,৯৭,৮২৮ জন বলা হয়েছে। উপজাতিগুলো হলো সাঁওতাল, ওঁরাও, পাহাড়িয়া, মুন্ডা, রাজবংশী, কোঁচ, খাসিয়া, মনিপুরী, টিপরা, প্যাংখো, গারো, হাজং, মার্মা, চাকমা, তংচঙ্গা, চাক, সেন্দুজ, ম্রো, খিয়াং, বোম (বনজোগী), খামি, লুসাই (খুমি)।
পক্ষান্তরে ১৯৯১ সালের রিপোর্টে ২৯টি উপজাতির মোট ১২,০৫,৯৭৮ জন মানুষের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়েছে। উপজাতিগুলো হলো বংশী, বোম, বুনা, চাক, চাকমা, কোঁচ, গারো, হাজং, হরিজন, খাসিয়া, খিয়াং, খুমি, লুসাই, মাহাতো, মারমা, মণিপুরি, মুন্ডা, মুরুং, ম্রো, পাহাড়ি, প্যাংখো, রাজবংশী, রাখাইন, সাঁওতাল, তংচঙ্গা, টিপরা, ত্রিপুরা, ওঁরাও, উরুয়া।

রিপোর্ট দু'টিতে লক্ষণীয় বিষয় হলো- এতে প্রচুর তথ্যবিভ্রাট রয়েছে। যেমন টিপরা ও ত্রিপুরা, ম্রো ও মুরুং, ওঁরাও ও উরুয়া একটি উপজাতির নাম হলেও রিপোর্টে এদের আলাদা উপজাতি বলা হয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্টে প্রচলিত ইংরেজি বানানে ভিন্ন রীতির কারণে এমনটি হয়েছে বলে মনে হয়।
সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ২৭ ধরণের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে চাকমা, যাদের সংখ্যা হচ্ছে ৪৪৪৭৪৮ জন। আর দ্বিতীয় বৃহৎ গোষ্ঠি হচ্ছে মারমা। এদের জনসংখ্যা হচ্ছে ২০২৯৭৪ জন।
বাংলাদেশ বিভাগের পূর্বে অর্থাৎ ১৯৩১ ও ১৯৪১ সালের সেন্সাস রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, এর মধ্যে যথেষ্ট তারতম্য রয়েছে। যেমন ১৯৩১ সালের সেন্সাস রিপোর্টে চাকমা, সাঁওতাল, ওঁরাও, ম্রো, মুন্ডার নাম না থাকলেও ১৯৪১ সালের সেন্সাস রিপোর্টে তা উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ১৯৩১ এবং ১৯৪১ সালের দুটো রিপোর্টেই উপজাতিদের মধ্যে ভূঁইয়া, মারমা, কুর্মি, লোধা, টোডা, শবর, কোঁচ, পালিয়া, কোল, ভীল, পাহাড়ী, কোঁচ, রাজবংশী, মাহালি, মালো, রাখাইন, খাসিয়া ইত্যাদি অনেক উপজাতির নাম উল্লেখ নেই।
এ থেকে সহজেই অনুমিত হয় যে, ভারত ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব উপজাতি বসবাস করে তারা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এ জনপদে তাদের স্থায়ী আবাসভূমি গড়ে তুলেছে। তারা কেউই এখানকার আদি বা স্থায়ী বাসিন্দা বা ভূমিজ সন্তান নয়।
আদিবাসী দিবস:
নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ায় যুগে যুগে আদিবাসীদের অনেকে প্রান্তিকায়িত, শোষিত, বাধ্যতামূলকভাবে একীভূত হয়েছে। যখন তারা এসবের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকারের স্বপক্ষে কথা বলেছে তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা দমন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ বিষয়টি জাতিসংঘের আলোচনায় বেশ গুরুত্বের সাথে নেয়া হয়েছে।
এরই প্রেক্ষিতে ১৯৯৩ সালকে 'আন্তর্জাতিক বিশ্ব আদিবাসী জনগোষ্ঠী বর্ষ' ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত 'আন্তর্জাতিক বিশ্ব আদিবাসী জনগোষ্ঠী দশক' ঘোষণা করা হয় যার উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদের উদ্বেগের প্রতি দৃষ্টি দেয়া। এছাড়া ১৯৯৫ সালের ৯ আগস্টকে 'বিশ্ব আদিবাসী দিবস' ঘোষণা করা হয়। জাতিসংঘ ১৯৮২ সালে সর্বপ্রথম আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়। এভাবেই আদিবাসী দিবসটির গোড়াপত্তন হয়।
'বিশ্ব আদিবাসী দিবস' রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবি:
সরকার 'আদিবাসী' শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও 'বিশ্ব আদিবাসী দিবস' রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।
গত ৫ আগস্ট রাজধানীতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০১৪ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আদিবাসী ফোরামের সভাপতি সন্তু লারমা এ দাবি উত্থাপন করেন। একইসঙ্গে তিনি সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার ফেরৎ দেয়ার দাবি জানান।
সন্তু লারমা বলেন, ৯ আগস্ট, ২০১৪ ২০তম আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ ২০ বছর ধরে এ দিবসটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করে আসছে। অথচ বাংলাদেশ সরকার আদিবাসীদের প্রাণের এ দিবসটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করছে না।
আদিবাসীরা যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনে নানাভাবে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার তা তুলে ধরার জন্য তিনি ৯ আগস্ট আদিবাসী দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবি জানান।
সন্তু লারমা বলেন, ‘২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসীদের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আদিবাসীদের তাদের ভূমির অধিকার থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এজন্য সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদের ভূমি ও সংস্কৃতির অধিকার ফেরৎ দেয়া দরকার।
'আদিবাসী' শব্দ ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা:
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের দু’দিন আগে গত ৭ আগস্ট, ২০১৪ ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য নির্দেশনা জারি করে সরকার।
সরকারি ওই তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের কোন অস্তিত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সময় বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়ে থাকে।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও টকশোতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
‘এ সকল আলোচনা ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য পূর্বেই সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।’
ঢাকা, এ আর, ৯ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি





