৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। সারাদেশে মুক্তির লড়াই চলছে। বিজয়ের নেশায় মেতে ওঠেছে বীর বাঙালী। পাকিস্তানি বাহিনীকে একের পর এক ধ্বংস করছে। বিভিন্ন এলাকা হনাদার মুক্ত করে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী।

একাত্তরের এই দিনে বিধ্বস্ত হয় পাকিস্তানি বাহিনীর বেশিরভাগ বিমান। ধ্বংস হয় পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্য বোঝাই কয়েকটি লঞ্চ ও স্টিমার। বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ডের আক্রমণে ধ্বংস হয় পাকিস্তানি সাবমেরিন 'গাজী', যা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর জন্য বড় একটি আঘাত।

এই দিনে লাকসাম ও কোটচাঁদপুরে ২টি বড় লড়াই হয়। লড়াইয়ে পাক বাহিনী ব্যাপকভাবে পরাজিত হয়। এর ফলে বিধ্বস্ত অবস্থায় পাকিস্তানিরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ভারতের ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন এ দিন আখাউড়ার যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী আখাউড়ার দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশ দিয়ে অবরোধ করে।

ফলে পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাক বাহিনী মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এতে আখাউড়া সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয়। এই যুদ্ধে সুবেদার আশরাফ আলী খান, সিপাহি আমীর হোসেন, লেফটেন্যান্ট বদিউজ্জামানসহ কয়েকজন শহীদ হন। ১৬০ জন পাকিস্তানি সৈন্য মিত্র বাহিনীর হাতে নিহত হয়।

এদিন নিরাপত্তা পরিষদের পুনরায় যে অধিবেশন বসে, তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক প্রস্তাবে বলা হয়- পূর্ব পাকিস্তানে এমন এক 'রাজনৈতিক নিষ্পত্তি' প্রয়োজন, যার ফলে বর্তমান সংঘর্ষের অবসান ঘটবে। একমাত্র পোল্যান্ড প্রস্তাবটি সমর্থন করে। চীন ভোট দেয় বিপক্ষে। অন্যসব সদস্য ভোটদানে বিরত থাকে।

ওইদিন আরো ৮টি দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে আরেকটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এবার সোভিয়েত ইউনিয়ন তার দ্বিতীয় ভেটো প্রয়োগ করে। একই সময় 'তাস' মারফত এক বিবৃতিতে সোভিয়েত সরকার 'পূর্ব বাংলার জনগণের আইনসঙ্গত অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে' সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানায়।

এদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের উত্তপ্ত অবস্থা চিন্তিত করে তোলে প্রবাসী সরকারকে। কারণ এদিনও ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব শ্রী কে বি লাল 'বাংলাদেশ একটি বাস্তবতা' বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া শুধু সময়ের ব্যাপার বলে সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করেন। রাজনৈতিক এই পরিস্থিতি মুক্তিযোদ্ধাদের যাতে দুর্বল না করে তোলে, সেজন্য মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণ দেন।

এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের ভর্নর ডা. মালিক দেশবাসীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। তিনি বলেন, দেশ আক্রান্ত। ভারতীয়দের সহযোগিতায় কিছু বিশ্বাসঘাতক দেশ আক্রমণ করেছে। এ দেশের সেনাবাহিনী তাদের প্রতিরোধ করছে। তাদের সাহায্য করার জন্য প্রতিরক্ষা তহবিল করা হয়েছে। সেই তহবিলে মুক্ত হস্তে সাহায্য করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান। তবে তার আহবানে কেউ সাড়া দেয়নি।

এমআর/ এআর