নিজেদের যোগ্যতা ও মেধার বলে নারীরা স্থান করে নিয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তারপরও শহুরে নারীরা বর্তমানে কিছু কিছু সুযোগ-সুবিধার দেখা পেলেও গ্রামীণ নারীরা সেগুলো থেকেও বঞ্চিত। তাদের অবদানকে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দান এবং তাদের ভিতর আরও উদ্দীপনা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর পালন করা হয় বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস।

নারী দিবস বলতে আমরা ৮ই মার্চকে জানি। কারণ আমাদের দেশের স্বাধীনতা পূর্ব থেকে দিবসটি পালন হলেও স্বাধীনতা উত্তর দিবসটি বিষদভাবে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু ২০০০ সাল থেকে গ্রামীণ নারীদের বাস্তবতাকে তুলে ধরে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে সুসংহত করা এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়ন ও ক্ষমতায়নে সচেতন করার লক্ষ্যে পালিত হচ্ছে বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস।

গ্রামীণ নারী দিবসের ইতিহাসের দিকে তাকালে প্রথমেই ১৯৯৫ সালে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব নারী সম্মেলনটির কথা চলে আসে। কেননা ঐ বিশ্ব নারী সম্মেলনে ব্যাপকভাবে আলোচনা হয় নারীদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে। আলোচনায় উঠে আসে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নারীর বৈষম্যের বিষয়গুলো। অবশ্য আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে কিছু সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়।

আলোচনায় দেখা যায় সমস্ত দরিদ্র দেশের বড় অংশের নারীরা বসবাস করেন গ্রামে। নানামুখী সমস্যায় তারা জর্জরিত এবং প্রতিনিয়ত একের পর এক সমস্যার আঘাত তাদের সহ্য করতে হয়। কোন রকম আত্মরক্ষা করে তারা কাল অতিবাহিত করেন। কিন্তু বছরের এমন কোন দিন নেই যে সেই সকল গ্রামের নারীদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই ৮ই মার্চ নারীদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করাসহ বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হলেও সেটি থাকে শহরের নারী ও শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যে কারণেই গ্রামীণ নারীরে অধিকার নিশ্চিত করতে ১৫ই অক্টোবর বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস পালন করার জন্য নতুন আরেকটি দিবস উদ্যাপনের পরিকল্পনা করা হয়।

প্রথম বছর অর্থাৎ ২০০০ সালের বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবসে প্রতিপাদ্য ছিল “প্রাণবৈচিত্র ও পরিবেশ রক্ষায় গ্রামীণ নারীর ভুমিকা”। প্রাণবৈচিত্র ও পরিবেশ রক্ষায় গ্রামীণ নারীর ভুমিকা অপরিসীম একথা কারও অস্বীকার করার উপায় নাই। কিন্তু দেখা গিয়েছে পরিবেশের দূষণ ও বিপর্যয় সকলকে স্পর্শ করলেও নারীদের এর ধকল পোহাতে হয় অনেক অনেক বেশি। বন জঙ্গল উজাড়, মরুকরণ এবং পরিবেশের ভারসম্যহীনতার ফলে নারীরা খাদ্য ও জ্বালানী এবং বিশুদ্ধ পানীয় জল সংগ্রহে আরো বেশিসময় ও শ্রম ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। রান্না ঘরের দৈনিক গড়ে পাঁচ ঘন্টা করে কর্মরত নারীরা অভ্যান্তরীণ বায়ু দূষণের স্বীকার। প্রকৃতির ঘনিষ্ঠতা ও মানব প্রজাতির সৃজনের ঐতিহ্যের কারণে নারীরা হন পরিবেশের সহজাত শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থাপক। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, ভোগ এবং নিয়ন্ত্রণে নারীর অধিকার খুবই সীমিত।

বাংলাদেশের সংবিধান নারীর অধিকারের প্রতি এক অসাধারণ স্বীকৃতি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নারী-পুরুষে বৈষম্য করার কোনও সুযোগ নেই। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আছে, ‘ সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’।

২৮ (১) অনুচ্ছেদে আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না’। ২৮ (২) অনুচ্ছেদে আছে, ‘ রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন’। ২৮ (৩) অনুচ্ছেদে আছে, ‘ কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী- পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাবে না’। ২৯ (১) অনুচ্ছেদে আছে, ‘ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের সমতা থাকবে’।

অর্থাৎ সংবিধানের প্রতি পূর্ণরূপে বিশ্বস্ত থাকলে বাংলাদেশের কোনও ক্ষেত্রে নারীর প্রতি কোনও রকম বৈষম্য থাকার বা বৈষম্যমূলক কোনও আচরণ করার সুযোগ নেই। এমনকি, নারী উন্নয়নের স্বার্থে বিশেষ বিবেচনায় কোনও উদ্যোগ নিলেও তা সংবিধান সমর্থন করে, সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে যে, ‘নারী ও শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যেকোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না’।          

বলতে দ্বিধা নেই যে, নারী অধিকারের সুদীর্ঘ আন্দোলন এবং নানা ধরনের অধিপরামর্শমূলক কার্যক্রমের ফলস্বরূপ বাংলাদেশের নারী অধিকার আদায় এবং নারীর জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির প্রতি বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কার্যক্রমে নারীর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, নারীর অনুকূলে বিভিন্ন আইন কার্যকর হয়েছে, শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এতকিছুর পরেও নারীর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়নি। আর পূরণ হয়নি ভূমির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের বিষয়টি। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে ভুমি ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

প্রথমদিকে হাতে গোনা কয়েকটি দেশে দিবসটি পালিত হলেও বছর বছর দিবস পালনকারী দেশের সংখ্যা ক্রমাগত ভাবে বেড়েই চলেছে। আমাদের দেশেও এর প্রচার ও প্রসার ঘটেছে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি।

কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য দুরীকরণের ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীদের ভূমিকার প্রতি স্বীকৃতি স্বরূপ সাধারণ পরিষদ তার রেজুলেশন নম্বর ৬২/১৩৬-এর মাধ্যমে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। নভেম্বর ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে ১৫ই অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীন নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। সত্যিই এটা একটা প্রকৃত অগ্রগতি এবং জাতিসংঘের এ ধরনের সময়োপযোগী পদক্ষেপ। কারণসেই থেকে জাতিসংঘ ভূক্ত সকল সদস্য রাষ্ট্রসমূহ এখন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ দিবস পালন করছে।

শুধু দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সকলে মিলে গ্রামীণ নারীদের কাজের স্বীকৃতি দিয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

কেএইচ