১৯৩৬ সালের এ দিনের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামের মুল্লা বাড়িতে জন্ম নেয়া মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে অনন্য সংযোজিত একটি নাম। কবি হিসেবে একটি উজ্জ্বল তারকা।
বয়সের ভারে দৃষ্টিশক্তি হারালেও কবিত্বশক্তি তার রয়েছে অটল, যা তাকে দিয়েছে সম্মোহনী মর্যাদা।
‘আমাকে এ অদম্য চলার পথে নিয়ে এসেছে
তারা তো সবাই জানে আমার পা পাথর
দৃষ্টিশক্তি স্বপ্নের কুয়াশায় আচ্ছন্ন।
তবু মানুষের মন বলে একটা কথা আছে। আছে না কি?
হ্যাঁ, মন বলছে এখনও আমার দিগন্তে পৌঁছার
খানিকটা পথ বাকি।’
সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন ১৯৫৪ সালে। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন।
১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর(১৯৬৩) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস(১৯৬৬), সোনালি কাবিন(১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো(১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থ গুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোট গল্পগ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল। আল মাহমুদ সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকাত সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একবার জেল খাটেন । পরে তিনি শিল্পকলা একাডেমীতে যোগদান করেন এবং পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
এ কবির সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতে স্বতত বিচরণ। কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক কিংবা সম্পাদক হিসেবে তার সার্থক বিচরণ স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। সব কিছুর মধ্যে আমরা তাকে দেখি। কবির তকমা তার নামের সাথে একাকার হয়ে গেছে। যেখানেই হাত দিয়েছেন সুনামের সাথে খ্যাতি জুড়েছে তাতে। বাংলা সাহিত্যের গর্ব আল মাহমুদ।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন কবি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ভাষা আন্দোলন কমিটি’র একটি লিফলেটে তার চার লাইনের একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। তাতে তাকে পালিয়ে যেতে হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। কবিতার জন্য তাড়া খাওয়া আল মাহমুদকে পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজছিল। সেই পলায়ন বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী মর্যাদার আসনে তাকে অধীষ্ঠিত করেছিল। আজ তিনি হয়েছেন কবিতার সম্পদ। বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
আজ আল মাহমুদ বলতে সেই কালের কলস, লোক-লোকান্তর কিংবা সোনালি কাবিন আর কাবিলের বোন, উপমাহদেশ এর আল মাহমুদকেই সবাই এক নামে চেনে।
নিরবিচ্ছিন্ন কাব্যসত্তায় কবিতার বিষয়-আশয় তার অনিবার্য হয়ে উঠেছে বাংলার রূপ। বিষয় বৈচিত্র্যে ধরা পড়ে নদী, নারী, মাটি, মানুষ, প্রেম-প্রকৃতি। মাটি মানুষের টান এখানে অনেক গভীর, অনেক দৃঢ়।
তার কালজয়ী কবিতাগুলো তাকে অমর করে রাখবে। সোনালি কাবিনের কবি তিনি। কিন্তু তার কবিতাগুলো পড়ার টেবিল থেকে রাজপথের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে আছে। তিনি পুকুরে শরীরের ভিতর হারিয়ে যাওয়া ধনের জন্য উতলা। আবার পরম প্রভুর প্রতি সিজদায় তার দৃঢ়চিত্তের ঘোষণা দেন। তিনি রাজপথের উত্তাল দিনগুলোর সাথে প্রকৃতির ভিতর প্রেম খুঁজে নেন। প্রেম খোঁজেন একান্তে নদী, নারী, মানুষ, মৃত্তিকার ভিতর। নানা বৈচিত্র্যময় উত্থান পতনের মতো তার জীবন এই দিনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার জীবনের মতোই তার কবিতা হয়েছে বৈচিত্র্যময়।
জীবনের বৈচিত্র্যে তিনি ১৯৭২ সালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীদের মুখপাত্র এবং সরকারবিরোধী একমাত্র রেডিক্যাল পত্রিকা 'গণকণ্ঠ'র সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। পত্রিকাটি তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সাড়া ফেলে। হইচই হয় পত্রিকা নিয়ে। যার ফলে কবিকে তার খ্যাতির মূল্যও দিতে হয়। এক সময় তাকে জেল খাটতে হয়েছিল।
তিনি সাহিত্যকে একটি উচ্চমানের সৃষ্টিশৈলি দিয়ে ঋদ্ধ করেছেন। পাঠককে রুচিশীল পাঠের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। সুন্দর চেতনা সমৃদ্ধ নান্দনিকতায় পাঠককে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে তার এই ক্ষমতা শ্রদ্ধার। প্রথম দিকের কবিতা মূলত প্রেম, দেশপ্রেম, প্রকৃতি নিয়ে রচিত। দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতার মূল বক্তব্য সৌন্দর্যের আদি কারণ অনুসন্ধান ও আধ্যাত্মিকতা। তার গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় শতাধিক।
উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ হলো, কবিতা : লোক লোকান্তর; কালের কলস; সোনালি কাবিন; মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো; প্রহরান্তরের পাশ ফেরা; আরব্য রজনীর রাজহাঁস; মিথ্যেবাদী রাখাল; আমি, দূরগামী; বখতিয়ারের ঘোড়া; দ্বিতীয় ভাঙন; নদীর ভেতরে নদী; উড়াল কাব্য; বিরামপুরের যাত্রী; না কোন শূন্যতা মানি না প্রভৃতি। ছোটগল্প : পান কৌড়ির রক্ত; সৌরভের কাছে পরাজিত; গন্ধবনিক; ময়ূরীর মুখ প্রভৃতি। উপন্যাস : কাবিলের বোন; উপমহাদেশ; পুরুষ সুন্দর; চেহারার চতুরঙ্গ; আগুনের মেয়ে; নিশিন্দা নারী প্রভৃতি। শিশুতোষ : পাখির কাছে ফুলের কাছে; একটি পাখির লেজ ঝোলা। প্রবন্ধ : কবির আত্মবিশ্বাস; কবির সৃজন বেদন; আল মাহমুদের প্রবন্ধ সমগ্র। ভ্রমণ : কবিতার জন্য বহুদূর; কবিতার জন্য সাত সমুদ্র প্রভৃতি। এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে আল মাহমুদ রচনাবলী, কবিতা সমগ্র-১, ২ উপন্যাস সমগ্র-১, ২, ৩।
কালের কলস আর লোক-লোকান্তর, মাত্র দুটি কবিতা বই প্রকাশের পর কবিতার জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮)। পেয়েছেন জয়বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৪), জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরষ্কার (১৯৭৪), সুফী মোতাহার হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৭৬), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৭), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০), সমান্তরাল (ভারত) কর্তৃক ভানুসিংহ সম্মাননা পদক- ২০০৪, কবি গোলাম মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন পুরস্কার (২০০৬) সহ অনেক সম্মাননা।
আল মাহমুদ জীবনের প্রথম দিকে মার্কসবাদী জীবনাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। মার্কসবাদী চিন্তা- চেতনা বা শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন তার কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে জাসদ সমর্থিত ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’র সম্পাদক হলে তৎকালীন সরকারের নির্দেশে তিনি গ্রেফতার হন। জেলে থাকাকালে তার জীবনাদর্শের পরিবর্তন হয়। তিনি মার্কসবাদী চিন্তা- চেতনা বাদ দিয়ে ইসলামকেন্দ্রিক জীবনাদর্শে নিমগ্ন হন।
কবির ৮০তম জন্মদিনে আমাদের শুভেচ্ছা।
এএইচ





