বয়স তো অনেক হয়েছে, এখন ৭৫ বছর। এই বয়স পর্যন্ত তো মানুষ বাঁচেই না। আমি তো বেঁচে আছি, এতো আল্লাহর শুকরিয়া। এখন আল্লাহর কাছে একটা দোয়াই করি, আল্লাহ যেন মিথ্যা অপরাধের অভিযোগ থেকে মুক্ত করেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামীর এই কথাগুলো স্মরণ করছিলেন আতিক হাসান নামে শিবিরের এক স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। টাইমনিউজবিডির সাথে সাক্ষাত হলে আতিক হাসান এসব কথা স্বরণ করেন। আতিক হাসান কয়েক মাস জেল হাজতে থেকে কয়েকদিন আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

আতিক হাসান বলেন, আমি গ্রেফতার হওয়ার পর কিছুদিন ঢাকা কারাগারে থেকে কাশিমপুর-২ কারাগারে যাই চালানে। অসুস্থ্য থাকার কারণে আমি কারা হাসপাতালে ছিলাম। সেখানেই নিজামী হুজুরের সাথে কয়েকবার সাক্ষাত হয়েছে আমার।

“স্বাস্থ্যের চেক-আপ করার জন্য নিয়মিত কারা হাসপাতালে আসতেন নিজামী হুজুর। নিজামী হুজুর আসার সময়ের অপেক্ষা করতাম আমরা। বেশির ভাগ সময় বুধবার হাসপাতালে আসতেন নিজামী হুজুর। তাই আমাদের সংগঠনের অন্য যারা কারাগারের বিভিন্ন বিল্ডিংয়ে ছিল তারা বিল্ডিং কারারক্ষী জমাদারের কাছ থেকে অসুস্থ্যতার কথা বলে কারা হাসপাতালে আসার অনুমতি নিত। জমাদারের অনুমতি ছাড়া কারা হাসপাতালে আসতে পারে না কেউ” জানাচ্ছিলেন আতিক হাসান।

আতিক হাসান আরো বলেন, “নিজামী হুজুরের সাথে দেখা হলে আমরা সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট কথা বলতে পারতাম। হুজুরকে দেখলে অনেকেই এসে তার সাথে সালাম দিয়ে কথা বলতো। তখন আমরা সংগঠনের কর্মী বলে পরিচয় দিলে সুন্দর করে আমাদের জড়িয়ে ধরতো। আমরা তার খোঁজ খবর নিতাম। তার কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা? কি খেতে মন চায়? জামায়াত এবং শিবিরের কর্মীদের আপনি কি করতে বলেন? আমরা কি দোয়া করবো? এসব জিজ্ঞাসা করতাম।

তখন তিনি বলেছিলেন, “আমার বয়স এখন ৭৫ বছর। এই হায়াত তো মানুষ এখন পায়ই না। খাবার দাবার তেমন কিছু খাওয়ার ইচ্ছা জাগে না, নামাজ আর কুরআন পড়েই সময় কাটাই। তোমরা আমার জন্য দোয়া করবা, যাতে আমাকে এই মিথ্যা জঘন্য অভিযোগ থেকে আল্লাহ হেফাজত করেন।” আর আমাদের শিবিরের কর্মী শুনলে তিনি খুব আদর করতেন।

একদিন আমার সাথে একা সাক্ষাত হলে তিনি আমাকে বলেন, হতাশ হবা না, আর কিছুদিন, তোমরা তো বের হয়ে যাবা। তখন আমার খুব কান্না পেয়েছিল কারণ আমি তো বের হবে পারবো কিন্তু তিনি তো আর বের হতে পারবে না।

আমাদের মধ্যে নিজামী হুজুরের সাথে সবচেয়ে বেশি খাতির হল জয়নাল আবেদিনের সাথে। জয়নালের বাড়ি মেহেরপুর। জয়নাল হুজুরের সাথে দেখা করলে জড়িয়ে ধরে খুব কান্না করতো। আর জয়নালের সাথে হুজুরও কান্না করে দিত। তাদের ভালবাসা অন্য রকম। আমার সাথে দেখা হলে হুজুর জয়নালের কথা জিজ্ঞাসা করতেন।

আতিক বলেন, নিজামী হুজুর খিচুরী খেতে খুব পছন্দ করতেন, তাই আমরা সাপ্তাহে দুই দিন সোমবার ও বৃহস্পতিবার তার জন্য খিচুরী পাঠানোর ব্যবস্থা করতাম সেবকের মাধ্যমে। আর হুজুরের সেবকের সাথে আমার বিশেষ খাতির ছিল, কারণ সেবকের বাড়ি ময়মনসিংহ আর আমার বাড়িও ময়মনসিংহ। তাই হুজুরের খোঁজ-খবর নিয়মিতই সেবকের মাধ্যমে আমি পেতাম।

আতিক আরো বলেন, কারাগারে ঢুকতে হাতের বামে ফাঁসির সেল যাকে ৪০ সেল বলে, আর হাতের ডানে কারা হাসপাতাল। এছাড়া বাদ বাকি বিল্ডিং পেছনের দিকে। ফাঁসির সেল এবং হাসপাতালের দিকে কারো আসা নিষেধ, সেজন্য অন্য কোন বন্দী চাইলেও তার সাথে দেখা করতে পারতো না।

আতিক বলেন, সেবকের মাধ্যমে নিজামী হুজুর আমাদের জন্য মাঝে মাঝে নিডো গুঁড়া দুধ, কেক, পিঠা, চকলেট ও নানা ধরনের ফল পাঠাতেন। আমরা সবাই তার জন্য দোয়া করতাম এবং প্রতি সোমবার এবং বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখার নিয়ম ছিল আমাদের।

"কারাগারের প্রত্যেক জন বন্দী এবং কারারক্ষী নিজামী হুজুরকে খুব সম্মান করতো। দিনের বেলায় নামাজের সময় ডিউটিরত কারারক্ষীদের নিয়ে তিনি তার সেলের বারান্দায় নামাজ আদায় করতেন" জানায় আতিক হাসান। এছাড়া কারারক্ষীদের পরিবারে কারো সন্তান হলে হুজুরের কাছে এসে দোয়া চাইতেন এবং সন্তানের জন্য নাম রেখে দিতে বলতেন।

এদিকে খুলনার শিবিরের সাবেক নেতা মোহাম্মাদ উল্লাহ রেজোয়ান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ২০১১ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা হয়েছিল আমিরে জামায়াতের সাথে। তার কথাগুলো কানে বাজছে এখনো। আমার ব্যক্তিগত অনেক প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, আর আমার বাম কাঁধে হাত রেখে হাটছিলেন। আমি বল্লাম হুজুর আপনাদের নিয়ে আমরা আনেক চিন্তা করি।

তিনি সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আমার পিঠে আলতো করে একটা থাপ্পড় দিয়ে বল্লেন আমরা বুড়া হয়ে গেছি, কয় দিন পর আল্লাহ এমনিই আমাদেরকে তুলে নিবেন! আমরা তোমাদেরকে নিয়ে চিন্তা করি! এরা যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে না পারে! তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখতে না পারে! কুরআন সুন্নাহ থেকে দূরে সরাতে নাপারে!

"তোমরা তরুন প্রজন্ম, তোমরা সাহসিকতার সাথে হাল ধরবে! তাহাজ্জুদ গুজার হবে, আল্লাহ সব সমস্যার সমাধান করে দিবেন ইনশাআল্লাহ। দোয়া চাওয়ার মাধ্যমে সেদিন বিদায় নিলাম। এখন কিছুই লিখতে পারছিনা। আল্লাহ যেন আমাদের সকল দায়িত্বশীলদের শাহাদাত কবুল করেন।"

ইআর/কেবি