সতের শতকের গোড়ার দিকের ঘটনা। সে সময় ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বণিকরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারত উপমহাদেশে আসত। এদের মধ্যে ওলন্দাজ, পর্তুগীজ ও ইংরেজদের সংখ্যা ছিল বেশি। মোগল শাসকের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যসহ কিছু বিশেষ সুবিধা পেয়ে ব্যবসায় সমৃদ্ধি লাভ করতে শুরু করে ইংরেজরা।
একসময় ওলন্দাজ ও পর্তুগীজদের ছাড়িয়ে অগ্রগামী হয়ে উঠে ইংরেজ বণিকরা। তখন বাংলার সুবাদার-দিওয়ানারাও ইংরেজদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে বাংলায় ইংরেজ এবং ফরাসীদের মধ্যে ব্যবসায়িক বিরোধ তৈরি হয়। এ সময় বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার নবাব ছিলেন আলীবর্দী খান। ১৬৭৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া এই নবাব স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। বাংলার শত্রু ও সুযোগ সন্ধানী ইংরেজদেরকে আলীবর্দী খান বাণিজ্য করার অনুমতি দিলেও দুর্গ স্থাপনের সুযোগ দেননি।
১৭২৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নবাব আলীবর্দী খানের কনিষ্ঠা কন্যা আমেনা বেগম ও জঈন উদ্দীন আহমদ খানের ঔরশে জন্ম হয় মীর্জা মুহাম্মদের। বাবা ছিলেন বিহারের গভর্নর। তার উপাধি ছিল হায়বাত জং। মীর্জা মুহাম্মদ শৈশব হতেই মানুষের হৃদয়গ্রাহী অমায়িক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছোট বড় সকলের সঙ্গে অকৃত্রিমভাবে মিশতেন।
নবাব আলীবর্দী খানের স্নেহের দৃষ্টিপড়ে মির্জা মুহম্মদের উপর। বাবা, মা ও নানার স্নেহের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ মীর্জা মুহাম্মাদ আলীবর্দী খানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়নে বড় হয়ে উঠেন। মীর্জা মুহাম্মদের চেয়ে তিনি সিরাজউদ্দৌলা নামেই বেশী খ্যাতি লাভ করেন।
নবাব আলিবর্দী খানের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। নাতিদের মধ্যে মীর্জা মোহম্মদ সিরাজউদ্দৌলাই যোগ্যতম ও দেশপ্রেমিক ছিলেন। তাই আলিবর্দী খান তাঁকেই পরবর্তি নবাব হিসেবে ঠিক করেছিলেন। সিরাজউদ্দৌলাও সবসময় নানার সাথে ছায়ার মতো লেগেছিলেন। তিনি আলিবর্দী খানের সাথে একাধিক যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন।
নানা আলীবর্দী খানের শাসন পরিচালনার নীতি ও কৌশল থেকে সিরাজউদ্দৌলা বুঝে নিয়ে ছিলেন যে, ইংরেজরা চায় এদেশকে তাদের শাসনাধীনে এনে বাংলার সরল সহজ মানুষকে তাদের দাসে পরিণত করতে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এ দেশকে শোষণ করতে।
সিরাজউদ্দৌলা তার নানা ইংরেজদের পিলে কাঁপানো কঠোর সুশাসক আলিবর্দী খানকে মৃত্যু শয্যায় কথা দিয়েছিলেন দেশকে তিনি সুশাসনে রাখবেন ও যেকোন মূল্যে রক্ষা করবেন। নানার মতো তিনিও দেশকে ভালোবাসতেন ও প্রজাহিতৈষী ছিলেন।
১৭৫৬ সালের ৯ এপ্রিল আলীবর্দী খানের মৃত্যু হয়। এর পর তার স্নেহধন্য নাতি সিরাজউদ্দৌলা বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করেন। কিন্তু আলীবর্দী খানের অপর কন্যা ঘষেটি বেগম স্বীয় পুত্র শওকত জঙ্গকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিলেন। তবে আলীবর্দী খানের সে অসিয়ত ঘষেটি বেগমের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। সিরাজউদ্দৌলা তার নানা আলীবর্দী খানের মত ইংরেজদের সাথে আপোষহীন নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ফলে অল্প দিনেই তিনি ইংরেজদের চক্ষুশূলে পরিণত হন।
নবাবের সাথে তার খালা ঘষেটি বেগমের বৈরী সম্পর্ককে ইংরেজরা সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী রাজবল্লভ ও ঘষেটি বেগমকে নবাবের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলল। ইংরেজরা কৌশলে সিরাজউদ্দৌলার সেনাপতি মীর জাফরকে নিজেদের দলে ভিড়ানোর চেষ্টা শুরু করে। আলীবর্দী খানের সময় হতেই মীর জাফর অবিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত ছিল। নবারের ঘনিষ্ঠজনরা নবাবকে মীর জাফর সম্পর্কে সর্তক করেন কিন্তু সরলমনা নবাব মীর জাফরকে এ পথ থেকে সরিয়ে অনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
এদিকে নবাবের রাজত্বকালের শুরুতেই ইংরেজরা বিনা অনুমতিতে বিভিন্ন স্থানে দূর্গ নির্মাণ করে এবং ফোর্ট উইলিয়াম দূগর্কে অস্ত্র গুদামে পরিণত করে। সিংহাসনে আরোহণের পর নিয়মানুসারে ইংরেজরা নবাবকে কোন উপঢৌকন প্রেরণ করেনি। নাবাব দূতের মাধ্যমে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিযুক্ত কলকাতার গভর্নর রজার ড্রেককে তলব করেন। রজার ড্রেক নবাবের দূতকে অপমান করেন। নবাব তাদের সমূচিত শাস্তি দিতে পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন।
১৭৫৬ সালের ৪ জুন কাশিমবাজার কুঠি এবং ২০ জুন ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ ইংরেজদের হাত থেকে মুক্ত করেন। এসময় কয়েকজন আহত ইংরেজ সৈন্য নবাব বাহিনীর হাতে ধৃত হয়। এদের মধ্যে ৩৯ জনকে ১৮১৫বর্গ ফুট একটি কক্ষে রাখা হয়। এ কক্ষে আহতদের ১৮ জন মারা যায়।
আহত সৈন্যদের মৃত্যুতে নবাবের কোনো ভূমিকা না থাকলেও ইংরেজ লেখক হলওয়েল নবাবের চরিত্রকে কলঙ্কিত করতে এ মর্মে গুজব ছড়ায় যে, ১৮১৫ বর্গফুট একটি কক্ষে ১৪৬ জন ইংরেজ সৈন্য বন্দি রাখা হয়েছে এবং শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ২৩ জন বাদে সকলের মৃত্যু হয়েছে। এ মিথ্যা কাহিনী ইতিহাসে ‘ব্লাক হোল ট্রাজেডি’নামে খ্যাত। এ সুযোগে ১৭৫৭ সালের ২ জানুয়ারি ইংরেজরা লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বে কলকাতা ও হুগলি দখল করে নেয়।
সিরাজউদ্দৌলা তাদের দমনে অগ্রসর হন কিন্তু চারদিকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কথা বুঝতে পেরে ১৭৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ইংরেজদের সাথে আলীনগরের সন্ধিতে আবদ্ধ হন।
এক মাসের মধ্যেই ইংরেজরা সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে নবাবকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এ ষড়যন্ত্রে যোগ দেয় মীর জাফর, জগৎ শেঠ, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, রায় দূর্লভ, উমিচাঁদ, রাজা রাজবল্লভ, মীর কাসেম, ইয়ার লতিফ খান, মহারাজা নন্দকুমার, মিরন, ঘষেটি বেগম, মুহাম্মদী বেগ, দানিশ শাহ বা দানা শাহ।
ইংরেজরা নবাবকে উৎখাত করে মীর জাফরকে মসনদে বসানোর লোভ দেখায়। ফলে ক্ষমতালোভী মীর জাফর যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ ইংরেজদেরকে দুই কোটি টাকা প্রদান এবং এদেশে অবাধ বাণিজ্যের সুযোগ দানের শর্তে ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়।
১৭৫৭ সালের ২২ জুনের ঘটনা। দিনটি ছিল বুধবার। সেদিন ইংরেজরা ১,০০০ ইউরোপীয় সৈন্য, ২,১০০ ভারতীয় সিপাহি, ১০০ বন্দুকবাজসহ ৯টি কামান (আটটি ৬ পাউন্ডার ও একটি হাওইটজার) নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে অগ্রসর হয়। মধ্যরাতে রবার্ট ক্লাইভ তার বাহিনী নিয়ে পলাশী মৌজার লক্ষ্মবাগ নামে আম্রকাননে এসে তাঁবু গাড়েন। বাগানের উত্তর-পশ্চিম দিকে গঙ্গা নদী। এর উত্তর-পূর্ব দিকে দুই বর্গমাইলব্যাপী আম্রকানন।
অন্যদিকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা যুদ্ধ অনিবার্য জেনে প্রাথমিকভাবে ৩৫,০০০ পদাতিক সৈন্য ও ১৫,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য ও ৫৩টি কামান নিয়ে অগ্রসর হন। যাদের মধ্যে ৪৫,০০০ সৈন্য ছিল মীরজাফরের অধীনস্থ। আর অবশিষ্ট ৫,০০০ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। নবাব তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে মাত্র ৬০ মাইল দক্ষিণে ভাগিরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে শিবির স্থাপন করেন।
পরদিন ২৩ জুন সকাল থেকেই পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজরা মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। বেলা ৮টার সময় হঠাৎ করেই মিরমদন ইংরেজবাহিনীকে আক্রমণ করেন। তাঁর প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মিরমদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন।
দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজউদ্দৌলার গোলা বারুদ ভিজে যায়। তবুও নবাব সিরাজউদ্দৌলার দুই সাহসী ও বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহন লাল ও মীর মদন মাত্র ৫,০০০ সৈন্য নিয়ে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে ইংরেজ বাহিনীকে পলায়নে বাধ্য করেন। কিন্তু হঠাৎ করেই গোলার আঘাতে মিরমদন মৃত্যুবরণ করেন।
গোলান্দাজ বাহিনীর প্রধান নিহত হওয়ার পর সিরাজউদ্দৌলা মীরজাফর ও রায় দুর্লভকে তাদের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে তীব্র বেগে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন। কিন্তু উভয় সেনাপতি তার নির্দেশ অমান্য করলেন। তাদের যুক্তি হলো গোলন্দাজ বাহিনীর আশ্রয় ছাড়া অগ্রসর হওয়া আত্মঘাতী ব্যাপার। কিন্তু কোম্পানি ও নবাবের বাহিনীর মধ্যে তখন দূরত্ব মাত্র কয়েক শ' গজ।
এ সময় নবাব সিরাজউদ্দৌলা মোহন লালকে যুদ্ধবিরতির আহবান জানালে তিনি মীর জাফরের ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে প্রথমে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে অসম্মত হন। কিন্তু মীর জাফরের পুনঃ পুনঃ অনুরোধের ফলে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এ সুযোগে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ পালিয়ে থাকা ইংরেজ সৈন্যদের নিয়ে নবাব বাহিনীর উপর আক্রমণ করে।
বিকাল ৫টায় সিরাজউদ্দৌলা বাহিনী নির্দেশনার অভাবে এবং ইংরেজ বাহিনীর গোলন্দাজি অগ্রসরতার মুখে পরাজয় স্বীকার করে। নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে।
এই যুদ্ধে ইংরেজদের ২২ জন সৈন্য নিহত হয়। যাদের মধ্যে ৭ জন ইউরোপীয় এবং ১৫ জন দেশীয়। এছাড়াও ১৩ জন ইউরোপীয় ও ৩৬ জন দেশীয় সৈন্যসহ মোট ৫৩ জন আহত হয়। অপরদিকে নবাবের ৫০০ জন স্বাধীনতাকামী সৈন্য শাহাদত বরণ করেন।
অবস্থা বেগতিক দেখে নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য তার দেহরক্ষীর সহযোগিতায় মুর্শিদাবাদে পৌঁছেন। এবং তিনি তার সৈন্য বাহিনীকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন।কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যেও কেউ তাকে সাহায্য করেনি।
এদিকে লর্ড ক্লাইভ ও মীর জাফরের মুশির্দাবাদে আগমনের খবর পেয়ে নবাব তার স্ত্রী লুৎফুন্নেসা (জন্ম:১৯ সেপ্টেম্বর, ১৭৩৪; মৃত্যু: ১০ নভেম্বর, ১৭৮৬) ও চার বছর বয়সী কন্যা উম্মে জহুরাসহ মুর্শিদাবাদ থেকে নৌকাযোগে রাজমহলের উদ্দ্যেশে যাত্রা করেন।
২৭ জুন তিনি মীর জাফরের জামাতা মীর কাশেমের হাতে ধরা পড়েন। মহানন্দা নদীর পাড় থেকে আটকের পর নবাবকে তার স্ত্রী ও কন্যাসহ মুশির্দাবাদে নিয়ে আসা হয়।
১৭৫৭ সালের ২ জুলাই মীর জাফরের পুত্র মীর মীরনের নেতৃত্বে তিনি মুহাম্মদী বেগের অস্ত্রের আঘাতে নবাব সিরাজউদ্দৌলা শাহাদাত বরণ করেন। মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাব আলিবর্দী খানের কবরের কাছে তাকে কবর দেয়া হয়। তার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। সূচনা হয় বিট্রিশ দুঃশাসনের এক কলো অধ্যায়ের।
পলাশীর যুদ্ধে পরাজয় শুধু নবাব সিরাজউদ্দৌলার হয়নি, হয়েছে স্বাধীন বাংলা ও বাঙালিদের। তবে স্বাধীন বাংলার সাথে যারা গাদ্দারি করেছিল, তারা কিন্তু সুখ বা শান্তি কোনটাই খুঁজে পায়নি। তাদের মৃত্যুও স্বাভাবিকভাবে হয়নি।
পলাশীর ষড়যন্ত্রকারী বিশ্বাসঘাতকদের করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল। প্রায় সকলেরই মৃত্যু হয়েছিল মর্মান্তিকভাবে। কাউকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, কেউ দীর্ঘদিন কুষ্ঠ রোগে ভুগে মারা গিয়েছে, কাউকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হয়েছে, কাউকে নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়েছে, কেউ নিজের গলায় নিজেই ছুরি বসিয়েছে।
পলাশীর যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকদের সর্দার মীর জাফর নবাবের সামনে পবিত্র কুরআন শরীফ মাথায় রেখে বিপদে তার পাশে থাকার অঙ্গীকার করার পরেই বেঈমানী করেছিল। এর করুণ পরিণতিও তাকে ভোগ করতে হয়েছে। তার জামাতা মীর কাসেম তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। পরবর্তীতে তিনি দুরারোগ্য কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
জগৎ শেঠ ও মহারাজা স্বরূপচাঁদের মৃত্যুও করুণ। মীর কাসেম তাদের হত্যা করেন। এদের মধ্যে জগৎ শেঠকে দূর্গের চূড়া থেকে গঙ্গায় নিক্ষেপ করা হয়। পলাশীর আরেক গাদ্দার রায় দূর্লভকে যুদ্ধের পর কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। যুদ্ধের পর রবার্ট ক্লাইভ কর্তৃক প্রতারিত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন উমিচাঁদ। উন্মাদ অবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে তার মৃত্যু হয়েছে।
মীর জাফরকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজে ক্ষমতা দখল করেন মীর কাসেম। পরবর্তীতে ইংরেজদের সাথে তার বিরোধ বাধে ও বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হন। পরে ইংরেজদের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান এবং অজ্ঞাতনামা অবস্থায় দিল্লীতে তার করুণ মৃত্যু হয়। তার মাথার কাছে পড়ে থাকা একটা পোঁটলায় পাওয়া যায় নবাব মীর কাসেম হিসেবে ব্যবহৃত ‘চাপকান’। এ থেকেই জানা যায় মৃত ব্যক্তি বাংলার ভূতপূর্ব নবাব মীর কাসেম আলী খান।
আর রাজা রাজবল্লভ পদ্মায় ডুবে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ইয়ার লতিফ খান যুদ্ধের পর হঠাৎ করে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। ধারণা করা হয়, তাকে গোপনে হত্যা করা হয়েছিল। তহবিল তছরুপ ও অন্যান্য অভিযোগের বিচারে মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যু হয়েছিল।
মীর জাফরের বড় ছেলে মিরন। অসংখ্য কুকর্মের নায়ক এই মিরন। ইংরেজদের নির্দেশে এই মিরনকে হত্যা করে মেজর ওয়ালস। তার এই মৃত্যুর ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার জন্য ইংরেজরা বলে বেড়ায় যে বজ্রপাতে মিরনের মৃত্যু হয়েছে। ঘষেটি বেগমকে মিরনের নির্দেশে নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।
মুহাম্মদী বেগ নবাব সিরাজদৌল্লার হত্যাকারী। কথিত আছে মৃত্যুর সময় নবাব তার কাছ থেকে দুই রাকাত সালাত আদায় করার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু কুখ্যাত মুহাম্মদী বেগ সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে নবাব সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরবর্তী পর্যায়ে মুহাম্মদী বেগ মাথা খারাপ অবস্থায় বিনা কারণে কূপে ঝাঁপ দেয় এবং মৃত্যুবরণ করে।
দানিশ শাহ্ বা দানা শাহ্। অনেকের মতে, এই ফকির নবাব সিরাজকে ধরিয়ে দিয়েছিল। আসকার ইবনে শাইখ তার ‘মুসলিম আমলে বাংলার শাসনকর্তা’গ্রন্থে লিখেছেন, বিষাক্ত সাপের কামড়ে দানিশ শাহর মৃত্যু হয়েছিল।
এছাড়াও রবার্ট ক্লাইভ, যিনি পলাশী ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দিয়েকোটি টাকার মালিক হয়েছিলেন। ইংরেজরা তাকে ‘প্লাসি হিরো’হিসেবে আখ্যায়িত করে। এই রবার্ট ক্লাইভ দেশে ফিরে গিয়ে একদিন বিনা কারণে বাথরুমে ঢুকে নিজের গলায় নিজের হাতেই ক্ষুর চালিয়ে আত্মহত্যা করে।
পলাশী ষড়যন্ত্রের আরেক নায়ক ওয়াটসমনের দুঃখে ও অনুশোচনায় বিদেশের মাটিতেই হঠাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হন।
বাংলার বিপুল সম্পদ চুরি করে বিলেতে যাবার সময় জাহাজডুবে স্ক্রাফটনের অকাল মৃত্যু ঘটে। আর ক্রমাগত স্বাস্থ্যহানী হলে কোনো ওষুধেই ফল না পেয়ে কলকাতাতেই করুণ মৃত্যুর মুখোমুখি হনওয়াটসন।
পরিশেষে বলা যায় পলাশীর ঘটনা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম কখনোই শুভ নয়। এর পরিণাম করুন ও মর্মান্তিক। ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের স্থান ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।
এআর





