আজ বিশ্ব দাস প্রথা দিবস। দাস প্রথাকে মানব ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় বলা যায়। এখন দাস প্রথাকে যত অদ্ভুতই মনে হোক না কেন, এক সময় এটিই ছিল স্বাভাবিক।বিত্তশালীদের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল দাস। শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর ঘরেও দাস থাকতো।

১৭৯১ সালের ২২ ও ২৩শে আগস্ট রাতে আজকের হাইতি এবং ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রে যে বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল তাই দাস প্রথা বিলুপ্তির পথে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে দেয়।

১৮০৭ সালে বৃটেনে দাস প্রথা নিষিদ্ধ হয়, রাশিয়ায় হয় ১৮৬১ সালে; আর এর চার বছর পর রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রেও দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়।

এছাড়া ইসলাম অনেক আগেই দাস প্রথাকে বিলুপ্ত করেছিল। দাসকে মুক্ত করার মাধ্যমেই ইসলামের ভিতরে প্রথম পূর্নজাগরনের সৃষ্টি হয়।দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেই দাস নামক সাধারন মানুষ। তাদেরকে আযাদ করার মাধ্যমেই দাস প্রথাকে বিলুপ্ত করেছিল মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সা)।

অবশ্য এখন সবাই দাস প্রথাকে অমানবিক মনে করেন। এই দাস প্রথাকে উচ্ছেদ করতে গিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। সে যুদ্ধে আব্রাহাম লিংকন জিতেছিলেন এবং দাস প্রথার বিলোপ ঘটাতে পেরেছিলেন।

দাস ছিল মুনিবের সম্পত্তি, বিনা পারিশ্রমিকে সে দাসকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারতো। সে সময় অনেকেই ঋণের দায় থেকে বাঁচতে দাসত্বকে বরণ করে নিতে বাধ্য হত। দাসের সন্তানও দাস বলে গণ্য হত। যুদ্ধে পরাজিত হয়েও অনেকসময় দাসত্ব বরণ করতে হত। অমানবিকভাবে সারা জীবন খেটে মরতে হত তাদের। এ চক্র থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না, যদি না তাদের মুনিব তাদের মুক্তি দেয়।
কোম্পানীশাসিত বাংলাসহ সারা বিশ্বেই দাস কেনা বেচার জন্য বাজার গড়ে উঠেছিল। এ বাজারে আফ্রিকার নিগ্রোদের চাহিদাই বেশি ছিল। তাদের জোর করে ধরে আনা হত। আর বিক্রি করা হত ইউরোপের বাজারে।

কৃষিকাজ এবং গৃহস্থলির কাজে জন্য দাসদের ব্যবহার করা হত। এছাড়া উচ্চবিত্ত শ্রেণী লালসা মেটানোর জন্যও দাসীদের ব্যবহার করেছে।দাস প্রথা অনেক মর্মান্তিক ঘাটনারও জন্ম দেয়। আটলান্টিকের এপার-ওপারে যখন দাস পরিবহন ব্যবসা জমজমাট, তখন দাসের মর্যাদা সাধারণ পণ্যের চেয়ে কিছু বেশি ছিল না। কখনো জাহাজে কোন দাস অসুস্থ হয়ে পড়লে মহামারির ভয়ে দ্রুত তাকে সমুদ্রে ফেলে দেয়া হত।

ধারণা করা হয় ৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন আফ্রিকান এই ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্যের বলি হয়েছিলেন। আরও বহু মানুষ পথেই মারা পড়েছিলেন। জাহাজে গাদাগাদি করে হাত-পা শেকলে বেঁধে তাদের পরিবহন করা হত। এখানেই খাওয়া ঘুমানোসহ সব কাজ সারতে হত তাদের। এমনকি প্রায় দু’মাসের এই সমুদ্রযাত্রায় সন্তানজন্মের ঘটনাও ঘটতো অস্বাস্থ্যকর কুঠরীতে।

অতীতে বিশ্বের প্রায় সব জায়গাতেই দাসের প্রচলন ছিল।খ্রিস্টান, ইহুদী এবং ইসলাম তিন ধর্মেই দাস প্রথার উল্লেখ রয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীন সভ্যতায়ও দাসের প্রচলন ছিল।সুমেরীয় এবং ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় দাসের প্রচলন ছিল।

মিশরীয়দেরও প্রচুর দাস ছিল, এদের মধ্যে ইহুদী, ইউরোপীয় এবং ইথিওপীয় দাসও ছিল।গ্রীক এবং রোমানরা ভৃত্য, সৈনিক এমনি সরকারি দাপ্তরিক কাজে দাস ব্যবহার করেছে।রোমানরা বৃটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানী থেকে দাস সংগ্রহ করেছে।অটোমান এবং মিশরীয়রা তাদের সৈন্যবাহিনীতে দাস ব্যবহার করেছে।ইউরোপীয়দের আগমনের পূর্বেই আফ্রিকার অনেক দেশে দাসের প্রচলন হয়।রাশিয়াতেও সার্ফ নামে দাস প্রথা চালু ছিল। ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে রাশিয়ার জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশই ছিল এ ধরনের দাস।

অবশ্য দাস প্রথা বিলুপ্তির ফলে অনেক জায়গায় পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভ্রান্ত কৃষকশ্রেণী দাস প্রথার বিলুপ্তি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি।

মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ঘোষণা প্রত্যেক মানুষের সমঅধিকারের পক্ষে কথা বলে, মানুষের মুক্তি আর স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে; যা দাস প্রথার সাথে বেমানান।আন্তর্জাতিক দাস বাণিজ্য স্মরণ ও রদ দিবসে দাস বাণিজ্যের শিকার সেইসব নিপীড়িতদের স্মরণ করা হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা) ছিলেন বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব এবং ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সফল সংস্কারক। তাঁর যুগে দাস-দাসীরা ছিলো চরম ঘৃণীত নিন্দিত, লাঞ্ছিত-বঞ্চিত এবং আরাম আয়েশের সামগ্রী মাত্র। সমাজে তাদের কোন অধিকার ছিলো না। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে এই দশা থেকে মুক্তি প্রদান করেন। তিনি তাদেরকে এমন মর্যাদায় আসীন করেন যে, বিশ্ব ইতিহাসে তার নজীর বিরল।

এআই