রাশিয়ার সামরিক অভিযানের কারণে শুধু সিরিয়ার রাজনীতির দৃশ্যপট পাল্টে যায় নি; একইসঙ্গে পাল্টে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির গতিপ্রকৃতি।

এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যে রাশিয়া সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, সেই রাশিয়া সিরিয়ায় সামরিক অভিযান শুরুর মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের একমাত্র মোড়ল আমেরিকাকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেছে।

এসব ঘটনা প্রবাহের মধ্যদিয়ে খুব দ্রুতই বদলে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের গতিপ্রকৃতি। এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কীভাবে ঘটছে এই পরিবর্তন মূলত তা নিয়েই আজকের এ আলোচনা।

ভিয়েনায় পাত্তা পায় নি আমেরিকা:

সিরিয়া ইস্যুতে গত ৩০ অক্টোবর (শুক্রবার) অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সম্মেলনটি মূলত নভেম্বরের মাঝামাঝি হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সিরিয়ায় রুশ অভিযানের তীব্রতা ও সব ধরনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ত্রিশংকু অবস্থা সৃষ্টির কারণে আমেরিকা নিজেই উদ্যোগী হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে।

তারই অংশ হিসেবে সম্মেলনের সময় এগিয়ে এনে ৩০ অক্টোবর ভিয়েনা শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। বিমান হামলা শুরুর পর রাশিয়া যেহেতু কূটনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে সাফল্যজনক অবস্থানে রয়েছে এবং সিরিয়া ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে গেছে সে কারণে ভিয়েনা সম্মেলনে রাশিয়ার অবস্থান ছিল যথেষ্ট শক্ত।

সামরিক অভিযানে বড় ধরনের সফলতা পাওয়ার কারণে রাশিয়া সহজেই এ ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নিতে পেরেছে। এ কারণেই গত ৩০ অক্টোবর ভিয়েনা সম্মলেনে আমেরিকার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে সক্ষম হয়েছে রাশিয়া।

আমেরিকা ও তার মিত্ররা চেয়েছিল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ছয় মাস পর ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে। কিন্তু রাশিয়া সে কথা মানে নি।

রাশিয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছে বাশার আল-আসাদ সিরিয়ার বৈধ প্রেসিডেন্ট এবং তিনি ক্ষমতায় থাকবেন। তার ভাগ্য নির্ধারণ করবেন সিরিয়ার জনগণ।

দৃশ্যপটে ইরান: সিরিয়া সংকট শুরুর পর থেকেই যে দেশটি রাজনৈতিক উপায়ে এর শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছে সেটি হচ্ছে ইরান। তেহরান সবসময় বলে আসছে সিরিয়ার জনগণই কেবল পারে সে দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করতে।

প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ক্ষমতায় থাকবেন কিনা তাও সিরিয়ার জনগণের বিষয়; তারাই ঠিক করবে আসাদের ভবিষ্যত। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতির সমীকরণে ইরান আসাদকে অর্থনৈতিক ও কুটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে।

এছাড়া, সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সামরিক পরামর্শমূলক সহযোগিতা করছে ইরান। এর আগে সিরিয়া ইস্যুতে দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও ইরানকে আমন্ত্রণ জানানো হয় নি।

দ্বিতীয় সম্মেলনে জতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ইরানকে আমন্ত্রণ জানালেও আমেরিকার চাপের কাছে সে আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু এবারের সম্মেলনে ইরানকে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য হয়েছে আমেরিকা।

সে দিক থেকে কূটনীতির ক্ষেত্রে ইরানের এটি প্রকাশ্য বিজয়। ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠীর পরমাণু চুক্তি এবং ইরান, রাশিয়া, ইরাক ও সিরিয়ার অংশগ্রহণে বাগদাদে সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে যৌথ তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা তেহরানকে নতুন করে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

বাস্তবতা হচ্ছে- অনেক আগেই স্পষ্ট হয়েছিল আঞ্চলিক ইস্যুতে বিশেষ করে সিরিয়ার ঘটনাবলীতে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ; সমস্যা সমাধানে তেহরান বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু ইরানকে কোণঠাসা করে রাখতেই তাকে এতদিন ডাকা হয় নি। কিন্তু ইরানকে শেষ পর্যন্ত শান্তি সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য হয়েছে। ‌ইরানকে বাদ দিয়ে যে সমস্যার সমাধান হবে না তাও পরিষ্কার হয়েছে।

এ জন্য শান্তি সম্মেলনের চুড়ান্ত বিবৃতিতে ইরানের বেশিরভাগ প্রস্তাব সংযুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও আমেরিকাসহ তাদের মিত্ররা সিরিয়ার ভবিষ্যত রাজনীতিতে আসাদের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না এবং আসাদকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে বলে যে বক্তব্য দিয়ে আসছিল তা গ্রহণযোগ্য হয় নি। ইরান, রাশিয়া, চীন মিলে তা ঠেকিয়ে দিয়েছে।

ভিয়েনা সম্মেলন চলার মধ্যেই পশ্চিমা গণমাধ্যম খবর ছড়িয়ে দেয় যে, আসাদকে ছয় মাস পর ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার প্রস্তাব মেনে নিয়েছে ইরান। ইরান অবশ্য তা পরিষ্কার ভাষায় নাকচ করেছে। সিরিয়া ইস্যুতে ইরানের কতটা শক্ত অবস্থান তা বোঝা যায় এ ঘটনার মধ্যদিয়ে।

ধারণা করা হচ্ছে- সিরিয়া ইস্যুতে ইরানকে নিয়ে যখন সমাধানে বসা হয়েছে তখন আঞ্চলিক ইস্যুতে ইরানের অংশগ্রহণের এ ধারা অব্যাহত থাকবে। দিন দিন ইরানের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হবে বটে। তাতে বলা যায়- দ্রুতই পাল্টে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দৃশ্যপট।

কূটনীতিতে পরাজিত আমেরিকা:

সিরিয়ায় এক বছর ধরে কথিত বিমান অভিযান চালানোর দাবি করে আসছিল আমেরিকা। কিন্তু উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র শক্তি এতটুকুও কমে নি বরং দিন দিন তারা মহিরূহ আকার ধারণ করেছে। আমেরিকা সবসময় আইএস-কে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরেছে।

স্পষ্টত, আমেরিকা সিরিয়ায় আইএস’র ওপর হামলার নাম করে সময়ক্ষেপণ করেছে কিন্তু ধারণাও করতে পারে নি যে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এমন ত্রুপের তাস খেলবেন। বলা যায়, আমেরিকার তৈরি করা সুযোগ কাজে লাগিয়েছে রাশিয়া। আমেরিকার ভাষ্য মতে আইএস হচ্ছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

অতএব, পুতিন যখন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সিরিয়ায় সামরিক অভিযান শুরু করলেন তখন মার্কিন প্রশাসনের পক্ষে আমতা আমতা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকল না। কারণ তারা প্রকাশ্যে বলার সুযোগ পায় নি যে, আইএস’র বিরুদ্ধে হামলা করা যাবে না।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে- আমেরিকা, সৌদি আরব, তুরস্ক, ফ্রান্সসহ আরো অন্তত ১০টি মিত্র মিলে এক বছরের বেশি সময় ধরে আইএস’র মতো একটি ভুঁইফোড় গোষ্ঠীকে নির্মুল করতে পারে নি।

অথচ রুশ বাহিনীর কয়েক দিনের হামলায় আইএস-সহ সব সন্ত্রাসীগোষ্ঠী দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এতে পরিষ্কার হয় মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা আসলে আইএস’র বিরুদ্ধে প্রকৃত হামলা চালায় নি; যা কিছু করেছে তা নামকাওয়াস্তে এবং নিতান্তই লোক দেখানো।

এখানে আরেকটি বিষয় হচ্ছে- সিরিয়ায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর জন্য আমেরিকা ও তার মিত্ররা না সিরিয়া সরকারের অনুমোদন নিয়েছে, না জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়েছে। সে কারণে তাদের হামলা মূলত বেআইনি ও অবৈধ।

অন্যদিকে, পুতিন ঠিকই সিরিয়া সরকারের অনুরোধে দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। এ জায়গায়ও মার্কিন সরকার নৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে।

তবে এ কথা ঠিক যে, এসব পরাজয়কে আমেরিকা তোয়াক্কা করবে না। গায়ের জোরে মধ্যপ্রাচ্যে তার সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা অপরিবর্তিত রাখতে এবং বাস্তবায়ন করতে আরো মরিয়া হয়ে উঠবে।  

পুতিনের কাছে বাগযুদ্ধে ধরাশায়ী:

সিরিয়ায় রুশ হামলা শুরুর পর বার বার আমেরিকা তার বিরোধিতা করেছে। মার্কিন প্রশাসন এখন না আইএস’র দায় নিতে পারছে, না তাদেরকে অস্বীকার করতে পারছে। এ অবস্থায় বার বার বলেছে, রাশিয়ার উচিত- শুধু আইএস’র ওপর হামলা করা।

সিরিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে অন্য যেসব বিদ্রোহী লড়াই করছে তাদের ওপর হামলা করা ঠিক হচ্ছে না। জবাবে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, সন্ত্রাসীদের মধ্যে ভালো সন্ত্রাসী আর খারাপ সন্ত্রাসী হয় কী করে? সন্ত্রাসীদের আবার রকমফের আছে নাকি? আমেরিকার এ বক্তব্যে পুতিন ওয়াশিংটনকে দ্বিমুখী নীতি নেয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন।

দ্বৈত অবস্থানের জন্য আমেরিকাকে গালমন্দ করতেও বাদ দেন নি পুতিন। পুতিনের এসব যুক্তির কাছে চুপসে যেতে বাধ্য হয়েছে মার্কিন প্রশাসন।

এর পাশাপাশি মার্কিন কর্মকর্তারা বার বার বলেছেন, রাশিয়া ভুল জায়গায় হামলা চালাচ্ছে। জবাবে পুতিন বলেছেন, “সঠিক জায়গা দেখিয়ে দিন সেখানেই হামলা করব।” পুতিনের এ বক্তব্যেও লা-জওয়াব হয়েছে আমেরিকার।

সিরিয়ায় মার্কিন স্পেশাল ফোর্স:

আমেরিকা একদিকে ভিয়েনা শান্তি সম্মেলনে যোগ দিচ্ছে শক্তি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছে। ভিয়েনা সম্মেলনের দিনই সিরিয়ায় স্পেশাল অপারেশন্স ফোর্স পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। এখানেও আইএস-বিরোধী যুদ্ধে মার্কিন অনুগত বিদ্রোহীদের সহায়তার কথা বলা হচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- সিরিয়ায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কখনো কখনো দ্বন্দ্ব ও মতপার্থক্য হলেও রুশ হামলা শুরুর পর সেখানে আইএস’র বিরুদ্ধে কেউ লড়ছে না; সবাই আসাদ বিরোধী এবং সবাই লড়াই করছে সিরিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে। সে কারণে মার্কিন দাবি ভুয়া বলে প্রমাণ হয়।

কেউ কেউ ধারণা করছেন, মার্কিন স্পেশাল ফোর্স মূলত আইএস-কেই সহায়তা করবে। তাদের নিরাপত্তা ও যুদ্ধকৌশলও বাতলে দেবে মার্কিন সেনারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বহুবার বলেছেন, সিরিয়ায় স্থল সেনা পাঠানো হবে না।

কিন্তু এখন স্পেশাল ফোর্স পাঠানোর প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ওবামার আগের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘণ করা হলো। শুধু তাই নয়, আরেক দফা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সিরিয়া কিংবা জাতিসংঘের অনুমোদন না নিয়ে আমেরিকা সিরিয়ার মাটিতে স্পেশাল ফোর্স মোতায়েন করতে যাচ্ছেন। গ্লোবাল রিসার্চ ডট কমে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে- আইএস-কে উদ্ধারের জন্য মার্কিন স্পেশাল ফোর্স মোতায়েন করা হচ্ছে।

এ প্রশ্নের জবাব কী:

সিরিয়ায় বিনা অনুমতিতে আমেরিকা বহুদিন ধরে বিমান হামলা চালানোর দাবি করছে। আবার নতুন করে স্পেশাল ফোর্স মোতায়েনের কথা ঘোষণা করেছে। এবারও সিরিয়া বা জাতিসংঘের অনুমোদন নেয়ার তোয়াক্কা করবে না আমেরিকা।

আমেরিকা তার ভাষায় বলছে, আইএস নয় বরং অন্য যেসব সরকারবিরোধী গোষ্ঠী লড়াই করছে তাদের সহায়তা করার জন্য স্পেশাল ফোর্স মোতায়েন করা হবে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- যদি কোনো দেশ আমেরিকার ক্ষুব্ধ জনগণের হাতে অস্ত্র দেয় কিংবা তাদেরকে সামরিক সহায়তা দিয়ে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামিয়ে দেয়া হয় তখন কী মানবে আমেরিকা?

সেই পদক্ষেপ যদি না মানে তাহলে সিরিয়ার নির্বাচিত বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে কীভাবে বিদ্রোহীদেরকে অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে? এই একই প্রশ্ন রয়েছে- রজব তাইয়্যেব এরদোগানের তুরস্কের বিরুদ্ধেও।  

কেন সিরিয়ায় মার্কিন স্পেশাল ফোর্স?:

সিরিয়ায় হঠাৎ করে কেন স্পেশাল ফোর্স পাঠানোর চিন্তা করছে আমেরিকা তা নিয়ে নানা গুঞ্জন ওঠাও স্বাভাবিক। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ভিয়েনা সম্মেলনে সুবিধা না করতে পেরে কী আমেরিকা রাশিয়া, চীন ও ইরানের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এসব সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিল?

অনেকে জানতে চান- এসব সেনা পাঠিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে রাশিয়ার সঙ্গে বৃহত্তর সংর্ঘষের পথ উন্মুক্ত করতে চায় কিনা মার্কিন প্রশাসন? সে ক্ষেত্রে কী বিরাট অঙ্গন জুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে?

রাশিয়ার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে মিশরের আকাশে রুশ যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত করা হয়েছে কিনা সে প্রশ্নও জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। যদি এমনটি হয় তাহলে রুশ প্রতিক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে রয়েছে নানা জল্পনা।

তবে এ কথা ঠিক- সিরিয়ায় স্পেশাল ফোর্স পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে আমেরিকা সেখানে একটি পুতুল সরকার বসাতে চায় যে কিনা মার্কিন কথায় উঠবস করবে আর মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র দেশ সিরিয়া থেকে রুশ প্রভাব ও সামরিক ঘাঁটি মুছে যাবে।

মার্কিন স্পেশাল ফোর্স পাঠানোর পরিকল্পনার মাধ্যমে এ কথা পরিষ্কার হয়ে ওঠে-বারাক ওবামা শান্তি নয়, যুদ্ধ চান। গ্লোবাল রিসার্চও আশংকা প্রকাশ করেছে, মার্কিন স্পেশাল ফোর্স পাঠানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি করা হলো। কাতারও সিরিয়ায় স্থল সেনা পাঠাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ফলে যুদ্ধের পরিধি বেড়ে যাওয়ার আশংকা জোরদার হলো।

আসাদের পাশে থাকবেন তো পুতিন?:

সিরিয়ায় বিমান হামলা শুরুর পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, শেষ পর্যন্ত রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন সিরিয়ার পাশে থাকবেন তো? আমেরিকার মোকাবেলায় তিনি কতদিন শক্ত অবস্থানে থাকবেন? রাশিয়ার যে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি তা দিয়ে কী টিকে থাকতে পারবে রাশিয়া?

এসব প্রশ্নের জবাবে বলা যায়- সিরিয়া সংকট শুরু হয়েছে সাড়ে চার বছর। শুরু থেকেই রাশিয়া, ইরান ও চীন বাশার আসাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সমগ্র পরিস্থিতি বহুদিন ধরে এসব দেশ পর্যবেক্ষণ করেছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া ও চীন মিলে সিরিয়া-বিরোধী প্রস্তাবে দু দফা ভেটো দিয়েছে। শেষ পর্যায়ে এসব দেশ বিশেষ করে রাশিয়া যে সামরিক অভিযান শুরু করেছে তা কোনো হোমওয়ার্ক ছাড়াই করেছে তা ভাবার কারণ নেই।

পুতিন ভালো করেই জানেন, তিনি কত বড় শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছেন এবং কী কী প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আসাদের পাশে থাকার বিষয়ে সন্দেহের আপাতত কোনো কারণ নেই।

এছাড়া, সিরিয়ায় রুশ সামরিক উপস্থিতির যে সুযোগ করে দিয়েছেন আসাদ তা মস্কোর জন্য অনেক বড় বিষয়। পাশাপাশি এ যুদ্ধে হঠাৎ রণেভঙ্গ দিলে রাশিয়ার সামরিক ও আর্থিক যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেয়া কঠিন হবে। রুশ অস্ত্রের বাজার প্রশ্নের সম্মুখীন হবে।

রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়েও হুমকি হবে নানা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ইউক্রেন ইস্যুতে তখন রাশিয়াকে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞাসহ আরো কঠিন অবস্থা মোকাবেলা করতে হবে। অন্যদিকে ন্যাটো বাহিনী রাশিয়াকে আরো ঘিরে ধরার ধৃষ্টতা দেখাবে। এসমস্ত কিছু বিবেচনায় নিয়েই পুতিনকে সিরিয়া ইস্যুতে মাঠে নামতে হয়েছে।

অতএব, অবশ্যই ধরে নেয়া যায়, প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের পাশে শেষ পর্যন্ত পুতিন থাকবেন। বাশার আসাদও ঘোষণা করেছেন, একটি সন্ত্রাসী জীবিত থাকতেও তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না।

সর্বশেষ অবস্থা:

আজকের এ আলোচনা শেষ করব সিরিয়া যুদ্ধের সর্বশেষ খবর দিয়ে। সিরিয়ায় আইএস সন্ত্রাসীদের অবস্থানে রাশিয়া এক মাস ধরে হামলা চালাচ্ছে। এ সময়ে রুশ বিমান বাহিনী ১,৪০০ অভিযানে সন্ত্রাসীদের ১,৬০০ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৪৯টি কমান্ড পোস্ট, ৫১টি ট্রেনিং ক্যাম্প, ১৩১টি গোলাবারুদ ও জ্বালানি তেলের ডিপো এবং ৭৮৬টি মাঠ পর্যায়ের ঘাঁটি।

এসব তথ্য জানিয়েছেন রাশিয়ার জেনারেল স্টাফ কর্নেল জেনারেল আন্দ্রে কারতোপোলভ। বিমান হামলায় মারা গেছে আইএস’র ঘৃণ্যতম ২৮ নেতা। এরইমধ্যে সিরিয়ার সামরিক বাহিনী ৫০টি শহর ও গ্রাম মুক্ত করেছে। রুশ হামলায় আইএস সন্ত্রাসীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে তবে তাদের বিরুদ্ধে এখনো পূর্ণাঙ্গ বিজয় আসে নি।

এদিকে, আন্দ্রে কারতোপোলভের বক্তব্য অনুসারে, সিরিয়ার আইএস জঙ্গীগোষ্ঠী ইরাকও আশপাশের দেশগুলো থেকে সন্ত্রাসী নিয়ে সিরিয়ায় মোতায়েন করার চেষ্টা করছে। তবে তাদের নৈতিক মনোবল এখন একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

আসন্ন পরাজয় ঠেকাতে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আন-নুসরা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র সঙ্গে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আলেপ্পোর কাছে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীকে সামান্য কিছু প্রতিরোধ করার খবর পাওয়া গেছে।

গত ছয় দিনে তারা আলেপ্পোর রাজধানীর সঙ্গে সাপ্লাই রুটে বাধা সৃষ্টি করেছে। তবে সিরিয়ার সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটের নিরাপত্তা পুনর্বহালের চেষ্টা চালাচ্ছে।

এ অবস্থায় আইএস সম্প্রতি খানাসের-ইথরিয়া টু সালামিয়া-ইথরিয়া রোডের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। ইথরিয়া শহর দখলের জন্য সিরিয়ার বাহিনী তাদের শক্তি বাড়াচ্ছে।

যদি এ শহরের পতন হয় তাহলে সন্ত্রাসীদের প্রধান সাপ্লাই লাইন কেটে দেয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে সিরিয় বাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা খানাসের-ইথরিয়া মহাসড়ক দখল থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে রয়েছে।

এসএইচ