একাত্তরের ১৯ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয় । সে কারণে মার্চের এই ১৯ তারিখ স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক। এ দিনটিতেই গাজীপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হামলার মুখে গড়ে তোলা হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিক্ষুব্ধ জনতা বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. কর্নেল মাসুদ ও সহ-অধিনায়ক মেজর একেএম শফিউল্লাহর সহায়তায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর সরাসরি সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। ভাওয়াল রাজবাড়ীর বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করার জন্য ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেবের নেতৃত্বে একদল সৈন্য জয়দেবপুরের দিকে রওনা হয়।

এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজীপুর ও জয়দেবপুর এলাকার রাজনীতিবিদ এবং আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। গাজীপুরের বিশিষ্ট রাজনীতিক শামসুল হকের নেতৃত্বে গঠন করা হয় ৩ সদস্যের কমান্ড। আওয়ামী লীগ নেতা আকম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে গঠিত ৯ সদস্যের অ্যাকশন কমিটির নির্দেশে চন্দ্রা থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত পুরো রাস্তায় অর্ধশতাধিক ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। প্রতিরোধকারী জনতা স্থানীয়ভাবে বন্দুক, পিস্তল, ফলা, বল্লম, রাম দা ও বাঁশের লাঠি সংগ্রহ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

পাকিস্তানি বাহিনীর সৈনিকরা পথের ব্যারিকেড সরিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় জয়দেবপুর চৌরাস্তায় আসার পরই শুরু হয় তাদের ওপর তুমুল আক্রমণ। চারিদিক থেকে জনতার দুর্বার প্রতিরোধের মুখে দিশেহারা হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ও মেশিনগান থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে চৌরাস্তায় শহীদ হন নিয়ামত, মনু খলিফা এবং আহত হন অর্ধশতাধিক সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। এ ঘটনার প্রতিবাদে টঙ্গীতেও বিরাট বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় ফিরে আসার সময় টঙ্গীতে নেমে সাধারণ মানুষের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। দ্রুত এ খবর ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে রাজপথে নেমে আসে হাজার হাজার আন্দোলনকারী জনতা।

বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের ধানমণ্ডির বাড়ির সামনে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা সমবেত হয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। বঙ্গবন্ধু বাইরে বেরিয়ে এসে জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বাংলার মানুষকে হত্যা করে, নির্যাতন চালিয়ে চলমান সংগ্রাম স্তব্ধ করা যাবে না। যারা নির্যাতন চালিয়ে বাংলার মানুষের আন্দোলনকে বন্ধ করতে চায়, তারা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করছেন। তিনি বলেন, বাংলার মানুষ এখন উদ্ভূত পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। রক্ত দেয়ার জন্য যারা তৈরি থাকে তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে কিছু হবে না। কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে সবই খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে। ’ আজকের দিনে সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ভবনে স্বল্প সময়ের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাক্ষাৎ হয়।

কিন্তু আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে ৩২ নম্বরের বাসায় চলে আসেন। সেখানে তিনি কর্নেল এমএজি ওসমানীর সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের কৌশল এবং মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। কর্নেল ওসমানী বঙ্গবন্ধুকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের নানা কৌশল ও ভালো-মন্দ নানা বিষয়ে সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ দেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ ও ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। বিকালেও হাজার হাজার ছাত্র-জনতা লাঠিমিছিল করে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে সমবেত হয়। বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করে যাব।

তিনি সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অধিকার আদায়ের জন্য সবাইকে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে। এদিকে অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের এ পর্যায়ে দেশের বহু স্থানে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে স্থানীয়ভাবে অস্ত্র সংগ্রহ এবং প্রশিক্ষণ শুরু করে। যেসব বাঙালির বাড়িতে গাদা বন্দুক, দোনলা বন্দুক ও রিভলভার ছিল তারা স্বেচ্ছায় সেগুলো দান করেন। বিভিন্ন স্থানে থানা ও ট্রেজারিতে হামলা চালিয়েও অস্ত্র সংগ্রহ করতে থাকেন উৎসাহী যোদ্ধারা। পরিস্থিতি দিন দিন উত্তপ্ত হতে থাকে এবং সবাই সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেন। বিশেষ করে গাজীপুরের প্রতিরোধ এবং পাক বাহিনীর সঙ্গে বাঙালি সৈন্যদের সম্মুখ যুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়লে, সারা দেশেই আন্দোলনরত লাখ লাখ তরুণের মনের সাহস আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। তারাও প্রস্তুতি নিতে শুরু করে সম্মুখ প্রতিরোধ যুদ্ধের।

এআইজে