মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতা বিরোধী অপরাধে দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত এ পাঁচটি অভিযোগের ভিত্তিতেই আজ রায় প্রদান করেছে আপিল বিভাগ।

সোমবার আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিসুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।রায় পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের রায়ের ভিত্তিতে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখা হয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউর কোন সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। বিশেষ আইনে বিচার হচ্ছে, এখানে রিভিউর কোন সুযোগ থাকবে না।

সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জামায়াতের আরেক নেতা কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে তাকে রিভিউ আবেদন করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল-এই তথ্যের উল্লেখ করে কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রেও এই অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে কীনা জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কাদের মোল্লার সময়ও আমি এই অনুচ্ছেদ প্রয়োগের বিরোধিতা করেছিলাম।

তিনি বলেন, আমি এখনও আগের মতই এই মত দিচ্ছি যে, কামারুজ্জামানের ব্যাপারেও সংবিধানের রিভিউ সংক্রান্ত ১০৫ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না।

রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমার ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, রায়ের কপি জেল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌছালে তখন আসামীকে সুযোগ দিবেন জেল কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ-১ বদিউজ্জামান হত্যা : একাত্তরের ২৯ জুন সকালে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আলবদররা শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার রামনগর গ্রামের আহম্মেদ মেম্বারের বাড়ি থেকে বদিউজ্জামানকে অপহরণ করে আহম্মেদনগরে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে সারারাত নির্যাতন করে পরদিন হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

"আপিল বিভাগ তাকে অব্যাহতি প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ে কামারুজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।"

অভিযোগ-২ অধ্যক্ষ আবদুল হান্নানকে নির্যাতন : কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীরা শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নানকে নগ্ন অবস্থায় শহরের রাস্তায় হাঁটাতে হাঁটাতে চাবুকপেটা করেন।

"আপিল বিভাগ এই সাজা বহাল রাখেন। এই অভিযোগে কামারুজ্জামানকে ১০ বছরের সাজা দেন ট্রাইব্যুনাল।"

অভিযোগ-৩ সোহাগপুরে গণহত্যা : একাত্তরের ২৫ জুলাই আলবদর ও রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং নারীদের ধর্ষণ করে। এটি কামারুজ্জামানের পরামর্শে পরিকল্পিতভাবে করা হয়। সেদিন ওই গ্রামে ১২০ জন পুরুষকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার দিন থেকে সোহাগপুর গ্রাম ‘বিধবাপল্লী’ নামে পরিচিত।

"আপিল বিভাগ এই সাজা বহাল রাখেন।এই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় কামারুজ্জামানকে।"

অভিযোগ-৪ গোলাম মোস্তফাকে হত্যা : একাত্তরের ২৩ আগস্ট কামারুজ্জামানের নির্দেশে আলবদর সদস্যরা গোলাম মোস্তফাকে ধরে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে স্থাপিত আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে কামারুজামান ও আলবদররা তাকে গুলি করে হত্যা করে।

"আপিল বিভাগ এই সাজা কমিয়ে যাবতজীবন দেন।এ অভিযোগেও কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।"

অভিযোগ-৫ লিয়াকত-মুজিবুরসহ আটজনকে হত্যা : মুক্তিযুদ্ধের সময় রমজান মাসের মাঝামাঝি কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীরা শেরপুরের চকবাজার থেকে লিয়াকত আলী ও মুজিবুর রহমানকে অপহরণ করে বাঁথিয়া ভবনের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে তাদের নির্যাতনের পর থানায় ৪ দিন আটকে রাখা হয়। পরে কামারুজ্জামানের নির্দেশে ওই দুজনসহ ১৩ জনকে ঝিনাইগাতীর আহম্মেদনগর সেনা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। পরে লিয়াকত, মুজিবুরসহ আটজনকে উপজেলা পরিষদের কার্যালয়ের কাছে সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। কামারুজ্জামান ও তার সহযোগী কামরান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

"এই অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়নি।"

অভিযোগ-৬ টুনু হত্যা :  একাত্তরের নভেম্বরে কামারুজ্জামানের নির্দেশে আলবদর সদস্যরা টুনু ও জাহাঙ্গীরকে ময়মনসিংহের জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। টুনুকে সেখানে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। জাহাঙ্গীরকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

"এ অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি।"

অভিযোগ-৭ দারাসহ ছয় হত্যা : মুক্তিযুদ্ধকালে ২৭ রমজান কামারুজ্জামান আলবদর সদস্যদের নিয়ে ময়মনসিংহের গোলাপজান রোডের টেপা মিয়া ও তার বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে ধরে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। পরদিন সকালে আলবদররা ওই দুজনসহ সাতজনকে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে নিয়ে হাত বেঁধে সারিতে দাঁড় করান। প্রথমে টেপা মিয়াকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচাতে গেলে তিনি নদীতে লাফ দেন। আলবদররা গুলি করলে তার পায়ে লাগে। তবে তিনি পালাতে সক্ষম হন। কিন্তু অন্য ছয়জনকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

"আপিল বিভাগ তা বহাল রাখেন। এ অভিযোগে কামারুজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।"

উল্লেখ্য, এ বছরের ১৮ মে থেকে কামরুজ্জামানের মামলার আপিল শুনানি শুরু হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে আপিল বিভাগে কামরুজ্জামানের মামলার শুনানির জন্য একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়।

গত বছরের ৬ জুন ট্রাইব্যুনাল-২ এর দেওয়া ফাঁসির আদেশ থেকে খালাস চেয়ে আপিল করেন কামারুজ্জামান।

গত বছরের ৯ মে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

তার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমান হওয়ায় এ রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া বাকি দুটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি মর্মে সে অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়।

কেএ