১১ জানুয়ারী বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। যেই দিনটিকে শেখ হাসিনা আখ্যায়িত করেছিলেন তাঁর লগি-বৈঠার আন্দোলনের ফসল হিসাবে।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী মইন ইউ আহমদ ক্ষমতা দখল না করলে আমাদের কপালে কি ঝুটতো সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

মইন ইউ আহমদের ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপট কমবেশি সবাই জানেন। তবে অন্তরালের ঘটনা গুলো এখনো বের হয়ে আসেনি। সেদিনের খলনায়করা স্বাধীনতা বিসর্জনে ব্যবহৃত হয়েছিলেন। তাদের বাহিৃ্ক পরিণতি ভাল হয়নি।

নেপথ্য নায়কদের হুকুম তামিলের ঘটনায় জড়িত মূলনায়কদের মধ্যে অনেকে এখন স্বেচ্ছায় নির্বাসিত। কোথায় আছেন তাও জানান দেয় না এই কাপুরুষরা।

মইন ইউ আহমদ, ফখরউদ্দিন আহমদ, আমিন উদ্দিন, ফজলুল বারী সবাই দেশের বাইরে। কিন্তু ১/১১-এর পর তাদের নাম শুনলে অনেকের শরীরে ঘাম ঝরতো। সেদিন বঙ্গভবনের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন রাষ্ট্রপতির উপদেস্টা মোখলেসুর রহমান চৌধুরী।

বর্তমানে তিনি লন্ডনে পিএইচডি গবেষণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ব্যস্ততার ফাঁকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গভবনের ভেতরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর গুরুত্বপূর্ন অংশ বর্ণনা করেছেন আমার দেশ-এর কাছে।

লন্ডনে নির্বাসিত দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি অলিউাল্লাহ নোমান-এর প্রশ্নের উত্তরে উঠে আসে সেই দিনের অনেক অজানা তথ্য। নিচে টাইম নিউজের পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হল।

আমার দেশ : আপনি তখন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের উপদেষ্টা। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গভবনের ভেতরে কি ঘটেছিল। পাঠকের উদ্দেশ্যে দয়া করে সংক্ষেপে বলবেন কি?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: অনেক বড় ঘটনা। সংক্ষেপ করে বলতে গেলেও অনেক কিছু আসবে। ১১ জানুয়ারী প্রতিদিনের মত সকালে মিন্টু রোডের বাসা থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। বঙ্গভবন ছিল আমার কর্মস্থল। সেদিন বঙ্গভবনে যাওয়ার পথে সকাল ১১টা ৪৫মিনিটে ফকিরাপুল মোড়ে পৌছাই। তখন আমার সঙ্গে থাকা সিকিউরিটি ও ড্রাইভার দেখাচ্ছিলেন সেনা বাহিনীর একটি কনভয়। এই কনভয়ে ছিলেন ডিজিএফআই'র তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারী। তিনি আমার গাড়িটি আগে যাওয়ার জন্য সিগন্যাল দেন। তারা আমাদের সাইড দিলেন। তাদের গাড়ি ওভারটেক করে আমার গাড়িটি আগে যাওয়ার সুযোগ দিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে বঙ্গভবনের গেইটে পৌছাই। গেইটে পৌছে দেখি সেখানে প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) মেজর জেনারেল জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী, এসএসএফ (স্পেশাল সিকিউরিটে ফোর্স)-এর ডিজি মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমদ রুমী, এনএসআই-এর ডিজি মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী গাড়ি থেকে নেমে নিচে দাড়িয়ে আছেন। তাদের গাড়িগুলো বঙ্গভবনের প্রধান ফটকে কর্তব্যরত সেনা সদস্যরা চেক করছেন। এটাই বঙ্গভবনের নিয়ম। আমার গাড়ি বঙ্গভবনের সিংহদ্বারে পৌছামাত্র সঙ্গে থাকা সিকিউরিটির গাড়িটি যথারীতি বাইরে রেখে আমাকে সরাসরি গাড়ি নিয়ে ভেতরে চলে যেতে অনুরোধ করা হল। তখন কয়েকবার বললাম আমিও নামি। আমার গাড়িও চেক করা হউক। জবাবে বলা হল স্যার মিনিস্টারের গাড়ি চেক করা হবে না। স্যার, ভেতরে চলে যেতে পারেন।

আমার দেশ: ভেতরে প্রবেশ করে কি দেখলেন। পরিস্থিতি কি অন্যান্য দিনের মতই ছিল?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: সেদিন পরিবেশ ভেতরেও একটু ভিন্ন ছিল। ভেতরে প্রবেশের পর মূল ভবনে যাওয়ার পথে গাড়ি থেকে বঙ্গভবনের সবুজ লনে চোখ পড়ল। দেখি গাছের নিচে জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে সাদা পোশাকে লোকজন গিজগিজ করছে। তাদের সকলের বুকে সিকিউরিটি পাস ঝুলছে। যথারীতি গাড়ি থেকে নেমে যখন অফিস রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তখনো দেখি আমার অফিসের আশে পাশের করিডোরে সাদা পোশাকে লোকজন ভর্তি। বঙ্গভবনের সবুজ চত্তরে এবং ভবনের ভেতরের করিডোরে সাদা পোশা যারা ছিলেন সবাই ডিজিএফআই-এর সদস্য।

আমার দেশ: রুমে পৌছে আপনি প্রতিদিনের ন্যায় কাজ করতে পারছিলেন নাকি কোন বাঁধার সম্মুখিন হলেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: রুমে পৌছার পর আমি প্রতিদিনের মত কাজ শুরু করি। প্রথমেই রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সাথে হটলাইনে কথা বলি। গেইট থেকে অফিস পৌছানো পর্যন্ত দেখা দৃশ্যগুলো বর্ণনা করি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথেও টেলিফোনে কথা বলার চেস্টা করি তখন। পাশাপাশি বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পেট্রিসিয়া এ বিউটেনিসের সাথেও ফোনে কথা বলার চেস্টা করি। তাঁকে বললাম, সেনা বাহিনী ক্ষমতা দখল করতে যাচ্ছে। আমি সব সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে বিদেশী দূতদের সাথে কথা বলার চেস্টা করতাম। গণতন্ত্র ও সংবিধান সমুন্নত রাখতে যখন তারা একমত হলেন তখন তাদের সাহায্য চাইতে কার্পন্য করিনি।

আমার দেশ: বিউটেনিসের সাথে তখন আপনার কি কথা হয়েছিল?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: বিউটেনিস তখন বঙ্গভবন এবং তাঁর বাসভবনে আমাদের দু’জনের অনেক গুলো বৈঠকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন- আমরা বাংলাদেশে সামরিক শাসন বন্ধ করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড এ বাউচার-এর বাংলাদেশ সফরের ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট নিকোলাস বার্ণস ও রিচার্ড বাউচার স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে আপনার সাথে এবিষয়ে কথা বলেছেন। এর বাইরে জাতিসংঘ মহাসচিবের সাথে আপনার যোগাযোগের পর মহাসচিবের বিশেষ দূত বাংলাদেশে সফর করে গেছেন। আপনার বক্তব্যের সূত্র ধরে গত ৮ এবং ৯ জানুয়ারি আমরা ২জন রাষ্ট্রদূত যথাক্রমে সেনা প্রধান ও প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের (পিএসও) সাথে দেখা করেছি। তাদেরকে মার্শাল ল’র বিরুদ্ধে আমাদের সুস্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা করেছি। ফলে এটা বলতে পারি যে, সামরিক শাসন জারি হবে না। তবে স্টেট অব ইমার্জেন্সি জারি হলে সেই ক্ষেত্রে আমরা কিছু করতে পারছি না। বাংলাদেশের সংবিধানে স্টেট অব ইমার্জেন্সি জারির সুযোগ রয়েছে। এই কথা গুলো তখন বিউটেনিস আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন।

আমার দেশ: আপনারা বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে তখন কি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: ওই দিন দুপুর ১২টায় বঙ্গভবনের কেবিনেট কক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেস্টা প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সভাপতিত্বে আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। আমরা মিটিং যথা সময়ে শুরুর চেস্টা করি। ওই মিটিং চলাকালে দুপুর পৌনে ১টায় এমএসপি (রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব) মেজর জেনারেল আমিনুল করিম বললেন ৩ বাহিনী প্রধান বঙ্গভবনে আসছেন। মিটিং চলাকালে এমএসপি কয়েকবার টেলিফোনে কথা বলেন। এমনকি এমএসপি মিটিং থেকে উঠে বাইরে গিয়েও মোবাইলে কথা বলতে দেখা গেছে। বঙ্গভবনে আসার ব্যাপারেই সেনাপ্রধানের সাথে এমএসপি তখন ফোনে কথা বলায় তৎপর ছিলেন। এখানে উলে­খ করতে চাই, ১১ জানুয়ারি ক্ষমতা দখলের আগেও বঙ্গভবনের বিভিন্ন কক্ষে এমএসপি এবং সেনাপ্রধানকে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতে দেখা গেছে।

আমার দেশ: এমএসপি যখন জানালেন ৩ বাহিনী প্রধান আসছেন, তখন রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য উপদেষ্টারা কি করলেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: এমএসপি যখন জানালেন ৩ বাহিনী প্রধান আসছেন, তখন রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে বলা হল আমরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মিটিং-এ আছি। এছাড়া তিন বাহিনী প্রধানকে রাষ্ট্রপতি ডাকেননি। এমনকি তারা রাষ্ট্রপতির কাছে কোন এপয়েন্টমন্টেও চাননি। তারপরও এমএসপি’র বক্তব্য ছিল তখন মিটিং বন্ধ করতে হবে এবং রাষ্ট্রপতিকে তিন বাহিনী প্রধানের সঙ্গে বসতে হবে। এমএসপি বারবার আর্মি চীফ, আর্মি চীফ করছিলেন। মিটিং-এ উপস্থিত উপদেস্টা এবং সচিবসহ উচ্চ পর্যায়ের সবাই বুঝতে পারছিলেন সামরিক সচিব আমিনুল করিম রাষ্ট্রপতির চেয়ে সেনাপ্রধানের প্রতি বেশি অনুগত।

আমার দেশ: আপনারা কি শেষ পর্যন্ত মিটিং চালিয়ে যাচ্ছিলেন নাকি বন্ধ করে দিয়েছিলেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে মিটিং স্থগিত করা হয়। রাষ্ট্রপতি ও আমি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির অফিস কক্ষে যাই। রাষ্ট্রপতির অফিস কক্ষ থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগের চেস্টা করি। কারন এখানে রাজনৈতিক পক্ষ বিপক্ষের কোন বিষয় নয়। গণতন্ত্রের প্রশ্নে রাজনৈতিকদের সবার এক হওয়ার কথা। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও একটি দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে না ফোন রিসিভ করা হয়, না ব্যাক করা হয়।

আমার দেশ: আমি জানতে চাচ্ছিলাম আপনারা প্রতিরোধের কোন উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিনা?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের মিটিং শুরু হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) কমান্ডেট মেজর জেনারেল আবু সোহায়েল আমার কক্ষে আসেন। তখন বঙ্গভবনের ভেতরে ডিজিএফআই-এর ব্যাপক উপস্থিতির কারনে কিছ্টুা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। পিজিআর কমান্ডেট আমার কাছে জানতে চান জেনারেল মইন ক্ষমতা দখল করতে আসলে আমরা কি করবো। তখন তাঁকে বললাম, আপনাদের উপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন। যে কোন অবৈধ এবং অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের প্রচেস্টা প্রতিহত করতে হবে। তিনিও আমার সাথে একমত হলেন এবং প্রতিহত করার একটি মানষিক প্রস্তুতি আমাদের ছিল।

আমার দেশ: এই প্রস্তুতি অনুযায়ী কোন উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কি?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: সেনাপ্রধান ও তাঁর সঙ্গীদের যথারীতি বঙ্গভবনের প্রধান গেইটে পিজিআর আটকে দেয়। অতি উৎসাহী এমএসপি আমিনুল করিম তখন অফিস থেকে বের হয়ে বঙ্গভবনের গেইটে আসেন। পিজিআর চীফ-এর সাথে এমএসপি’র অনেক বাদানুবাদ হয়। এক পর্যায়ে পিজিআর চীফকে উদ্দেশ্য করে এমএসপি বলেন, আমি হলাম তোমার উর্ধ্বতন। সুতরাং সেনা আইন অনুযায়ী আমি তোমার পাওয়ার সীজ করলাম। তারপরও পিজিআর প্রধান তাঁর অবস্থানে দৃঢ় ছিলেন। এক পর্যায়ে এমএসপি তিন বাহিনী প্রধানকে তাঁর রুমে চা খাওয়ানোর জন্য নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। এবং আরো বলেন, তারা কোন মুভ করবে না। এমএসপি এবং পিজিআর চীফ-এর বাদানুবাদের সময় পিজিআর অর্গানোগামের কথা উলে­খ করেন এমএসপি। তিনি পিজিআর চীফকে বলেন, আই অ্যাম নাউ অপারেশনাল কমান্ডেন্ট অব পিজিআর। এক পর্যায়ে উত্তেজনা সাময়িক নিরসন হলে ৩ বাহিনী প্রধানকে চা আপ্যায়নের কথা বলে এমএসপি ভেতরে নিয়ে যান।

আমার দেশ: ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পর সেনাপ্রধানসহ অন্যদের ভূমিকা কি ছিল?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: ভেতরে এমসএসপি’র রুমে নিয়ে প্রথম তাদের বসানো হয়। তখন স্যান্ডওইচ-এর ট্রেতে করে ন্যাপকিনে মোড়ানো ৩টি পিস্তল তিন বাহিনী প্রধানকে সরবরাহ করেন এমএসপি। কারন বঙ্গভবনে বহিরাগত যে কারো অস্ত্র নিয়ে প্রবেশে আইনত নিষিদ্ধ। তাই তারা অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করতে পারেননি। এজন্যই বঙ্গভবনের ভেতরে এমএসপি তাদের ৩টি পিস্তল সরবরাহ করলেন।

আমার দেশ: এটাতো এমএসপি’র রুমের ভেতরের কথা বলছেন। আমি জানতে চাচ্ছিলাম তারা কি ভুমিকায় ছিলেন তখন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তারা এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করার কথা বলেন। আমরা তখন রাষ্ট্রপতিকে অফিস কক্ষ এবং গেষ্ট ডাইনিং হলসহ বিভিন্ন কক্ষে নিয়ে যাই। কখনো দুপুরের খাবার আবার কখনো ইনস্যুলিনের কথা বলে সময় ক্ষেপেনের চেস্টা করা হয়। একই সঙ্গে জেনারেল মইনের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে বঙ্গভনে তৎপরতা প্রসঙ্গে রাজনৈতিক মহলে অবহিত করার প্রচেস্টা চালানো হয়। এই যোগাযোগের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরামর্শ মোতাবেক মইন ইউ আহমদের পরিকল্পনা নস্যাত করা।

আমার দেশ: রাজনৈতিক মহল থেকে আপনারা কি ফিডব্যাক পেয়েছিলেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেদিন আমাদের ডাকে সাড়াদিতে ব্যর্থ হন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক পক্ষ চেয়েছিলেন জেনারেল মইন ক্ষমতা দখল করুক। তার ধারাবাহিকতায় তারা ক্ষমতায় আসবেন। আরেক পক্ষকে সেনা প্রধান হিপনোটাইজ করে ফেলেছিলেন যে, জরুরি অবস্থার মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষমতায় পূনর্বহাল করা হবে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত নিতেন। এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯৬ সালের ২০ মে একটি সামরিক ক্যু প্রচেস্টা ভন্ডুল করে দিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহযোগিতা নিয়ে। সেদিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের সামরিক ক্যু প্রচেস্টা প্রতিহত করা সম্ভব হতো না। এছাড়া তৎকালীন এমএসপি মেজর জেনারেল রুহুল আলম চৌধুরী, নবম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান, ডিজিএফআই-এর ডিজি মেজর জেনারেল এম এ মতিন ও ঢাকার ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আবু রুশদ রোকন উদ দৌলা, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভুইয়া সম্মিলিত ভাবে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের পাশে থেকে তৎকালীন সেনা প্রধানের সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেস্টা রুখে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী এমএসপি মেজর জেনারেল আমিনুল করিম, ডিজিএফআই, এস এস এফ, নবম ডিভিশন সকলেই ছিলেন সেনা প্রধান মইন ইউ আহমদের ক্ষমতা দখলের পক্ষে। শুধুমাত্র পিজিআর কমান্ডেন্ট এবং এনএসআই-এর ডিজি ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে ছিলেন। এখানে আরেকটু বলে রাখতে চাই মাঝারি পর্যায়ের কিছু অফিসারও জেনারেল মঈনের ক্ষমতা দখলকে সমর্থন করেনি। তাদেরকে পরবর্তিতে ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকান্ডের আগে বিডিআর-এ বদলী করা হয়েছিল, অর্থাৎ ডাম্পিং করা হয়েছিল। তারা সকলেই এই হত্যাকান্ডে শহীদ হয়েছেন।

আমার দেশ: আপনি বলেছেন ৩ বাহিনী প্রধানকে এমএসপি ভেতরে নিয়ে যান। নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তখন কি তাদের সঙ্গে ছিলেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: না। মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তখন অনুপস্থিত ছিলেন। তখনো তিনি এসে পৌছাননি। সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমদ সহ অন্যান্য অফিসাররা যখন রাষ্ট্রপতিকে জরুরী অবস্থা জারির জন্য চাপ সৃস্টি করছিলেন তখন রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, জেনারেল মাসুদ উদ্দিন কোথায়। জেনারেল মাসুদ আপনাদের সঙ্গে আছেন? আমি রাষ্ট্রপতিকে আগেই বলেছিলাম জেনারেল মইন কোন পরিস্থিতি সৃস্টি করলে আমাদেরকে নবম ডিভিশনের জিওসি’র বক্তব্য শুনতে হবে। রাষ্ট্রপতির এই জিজ্ঞাসার পর মইন ইউ আহমদ জানান, তাঁকে বঙ্গভবনে আসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাৎক্ষনিকভাবে তিনি আবার রাষ্ট্রপতির সামনে থেকে মাসুদ উদ্দিনকে টেলিফোন করেন। সেনাপ্রধান রাষ্ট্রপতির সামনে থেকে নবম ডিভিশনের জিওসি মাসুদ উদ্দিনকে বঙ্গভবনে আসার নির্দেশ দেন মইন ইউ আহমদ। মাসুদ উদ্দিন এসে মইনের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন।

আমার দেশ: রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ পত্রে সাক্ষর করানো হয়েছিল। অপর একজন উপদেষ্টাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ছাড়া অন্য কোন উপদেস্টার নিকট থেকেও কি পদত্যাগ পত্র নেয়া হয়েছিল? মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী মধ্যরাতে অথাৎ ১২টার পর সেনা প্রধান লে: জেনারেল মঈন ইউ আহমদের সাথে আমি রেড টেলিফোনে কথা বলি। তাঁকে বললাম, জরুরী অবস্থা জারির নামে এবং রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেস্টার পদ থেকে সরাতে গিয়ে সংবিধানের বেশ কিছু ধারার লঙ্ঘন হয়েছে। তখন তিনি জানতে চাইলেন কি কি ধারা লঙ্ঘন হয়েছে। বললেন, সংবিধানের বিষয়ে কি ত্রুটি ঘটেছে একটু বলবেন। তখন আমি পরিস্কার করে বললাম, সংবিধান অনুযায়ী প্রধান উপদেস্টা পদত্যাগ করার সাথে সাথে উপদেস্টা পরিষদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু আপনারা প্রধান উপদেস্টার নিকট থেকে পদত্যাগ পত্র নিয়েছেন। একই সাথে একজন ছাড়া বাকী সকল উপদেস্টার নিকট থেকেও পদত্যাগ পত্র নিয়েছেন। যেটার কোন দরকার ছিল না। তাঁকে আমি আরো বললাম, প্রধান উপদেস্টা পদত্যাগ করলেও নতুন প্রধান উপদেস্টা দায়িত্ব গ্রহন না করা পর্যন্ত বিদায়ী প্রধান উপদেস্টাই দায়িত্বে থাকবেন। এটাই সংবিধানের নিয়ম। অথচ আপনারা ভারপ্রাপ্ত প্রধান উপদেস্টা নিয়োগ দিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত উপদেস্টা বলে সংবিধানে কোন পদবী নেই। এছাড়া প্রেসিডেন্টের ভাষন আপনারা যেটি লিখে এনেছেন তার মধ্যে অনেক ভুল রয়েছে। ভাষণে কিছু রাষ্ট্র বিরোধী কথা আমি কেটে দিয়েছি।

আমার দেশ: জবাবে মঈন ইউ আহমদ তখন আপনাকে কিছু বলেছিলেন কি?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: আমার কথা শোনার পর মঈন ইউ আহমদ বললেন আমরা তো রাজনীতি বুঝি না। এখন আপনি কিছু বলার দরকার নেই। যা হবার হয়ে গেছে।

আমার দেশ: আমরা তো মঈন ইউ আহমদের লেখা বইয়ে দেখেছি আপনি সেনাবাহিনীর সহানুভূতি লাভের চেস্টা করেছিলেন সেদিন।

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তিনি উল্টাটা বলেছেন। আমি তাঁর সহানুভুতি চাইনি। তিনিই বরং আমার সহানুভুতি চাইতেন। আমি মইন ইউ আহমদকে যা বলেছিলাম সেটা স্পস্ট করেই বলেছিলাম। আমি এখানে যা উল্লেখ করেছি তাতে কি সহানুভূতির কোন গন্ধ আছে! কিন্তু কোন কোন কথা সাহিত্যিকের সহযোগিতা নিয়ে লেখা মইন ইউ আহমদের বইয়ে বলার চেস্টা করা হয়েছে, আমার কথাবার্তায় তাঁর নাকি মনে হয়েছিল সহানুভূতি লাভের চেস্টা করছি। অথচ বাস্তবতা হল ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে জেনারেল মইন প্রতিনিয়ত আমার সহানুভূতি লাভের চেস্টা করতেন। বেগম খালেদা জিয়ার সরকার বিদায়ের আগে শেষ ৩ মাস মইন ইউ আহমদ প্রতিনিয়ত তাঁর সহানুভূতি লাভের যে চেস্টা চালাতেন তা ছিল দৃশ্যমান। একইভাবে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে তিনি আমারও সহানুভূতি লাভের চেস্টা করতেন। এটা তখন তার দরকার ছিল।

আমার দেশ: সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আপনি তখন আর কারো সাথে আলোচনা করেছিলেন কি, নাকি মইন ইউ আহমদের কথামত নীরব ছিলেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির সময়ে সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো বঙ্গভবনে উপস্থিত অন্যান্য সেনা কর্মকর্তাদের সাথেও আলোচনা করেছি। তারা আমাকে বলেছিলেন এগুলো সেনা প্রধানকে বলার জন্য। তাদের পরামর্শে আমি সেনা প্রধানের সাথে রেডফোনে কথা বলি এবং সংবিধান লঙ্ঘনের বিষয়গুলো অবহিত করি।

আমার দেশ: আপনিতো আগে উল্লেখ করেছেন জরুরি অবস্থা জারির আগে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগের করার চেস্টা করেছেন। জরুরি অবস্থা জারির পর সেই রাতে কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে আপনার কথা হয়েছিল কী ?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: সেনা প্রধান মঈন ইউ আহমদের সাথে কথা শেষ হওয়ার একটু পরই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। তিনি বললেন-মোখলেস চৌধুরী, আপনি থাকতে প্রধান উপদেস্টার পদত্যাগের পরও অন্যান্য উপদেস্টাদের কাছ থেকে পদত্যাগপত্র গ্রহন এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান উপদেস্টা নিয়োগের মত সংবিধান পরিপন্থি ঘটনাগুলো কিভাবে ঘটল!

আমার দেশ: জবাবে আপনি কি বলেছিলেন এবং শেখ হাসিনা আপনাকে তখন আর কি কি বললেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: আমি তাঁকে বললাম এইমাত্র সেনা প্রধানকে এ বিষয়গুলো বলেছি। তিনি আরো বললেন, আপনাকে দুই জন লোক বঙ্গভবনে থাকতে দেবে না। জিজ্ঞাস করলাম বলুনতো তারা কে কে। তিনি জনালেন তাদের একজন সেনাপ্রধান ও আরেকজন এমএসপি।

আমার দেশ: বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে আপনার কোনো কথা হয়েছিল সেদিন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: শেখ হাসিনার ফোন রাখার একটু পরই বেগম খালেদা জিয়াও ফোন করেছিলেন। তিনি বললেন, ঘটনা তো ঘটে গেছে। এখন দেখুন অ্যাডজাস্ট করে থাকা যায় কিনা। আমি বললাম, এটা সম্ভব হবে না। আমি থাকবো না, থাকা সম্ভব হবেও না। শেখ হাসিনা পর্যন্ত এটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

আমার দেশ: আপনিতো সেই রাতেই বঙ্গভবন থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। জরুরি অবস্থা জারির উদ্যোক্তা সেনা কর্মকর্তাদের কেউ কি আপনাকে কিছু বলেছিলেন তখন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: হ্যাঁ। আমি সেই রাতেই বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেই। কেউ কিছু বলেনি। তবে রাত সাড়ে ১২টার দিকে সেনা গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তা আমার রুমে আসার অনুমতি চাইলেন। আমি তাঁকে রুমে আসতে বলি। তিনি আমাকে বললেন, স্যার মুখে কিছু বলতে পারব না। আপনাকে একটি চিরকুট দিতে চাই। আমার সম্মতি পেয়ে তিনি চিরকুট টেবিলে রেখে যান। একই সঙ্গে বললেন স্যার, এটা আপনি একটু পর খুলবেন এবং আধাঘন্টা পর আপনার সাথে আবার দেখা করব। তখন আমি বঙ্গভবনের জরুরি ও গুরুত্বপূর্ন কিছু কাগজপত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং প্রেসিডেন্টের একটি ভাষণ নিয়ে কাজ করছিলাম। চিরকুটের কথা ভুলে যাই।

আমার দেশ: চিরকুটে কি লিখা ছিল?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তিনি যখন দ্বিতীয়বার আসলেন চিরকুট তখনো পড়া হয়নি। আমার অফিস কক্ষে তখন এসি এবং ফ্যান একসাথে চলছিল। ফ্যানের বাতাসে চিরকুট কোথায় যেন উড়ে গিয়েছিল। সেনা গোয়েন্দা বিভাগের ওই কর্মকর্তা বুঝতে পেরেছিলেন চিরকুট পড়ার সুযোগ হয়নি আমার। এটি না পাওয়ায় আবার আমাকে বললেন, স্যার আরেকবার লিখে দিয়ে যাচ্ছি। দ্বিতীয়বার চিরকুট লিখে পেপার ওয়েটারে চাপা দিয়ে রেখে যান তিনি। এবং বললেন স্যার, চাপা দিয়ে রেখে যাচ্ছি। আপনি দেখুন। আমি একটু পর আবার আসছি। এবার ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বাইরে যাওয়ার পরপর-ই আমি এটা দেখলাম। তাতে লেখা ছিল-‘অথরিটি হ্যাজ রিক্যুয়েস্টেড ইউ টু গো অন লিভ, স্যার।’

আমার দেশ: ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আবারো কি ফিরে এসেছিলেন আপনার কাছে?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: হ্যা, একটু পর আবার এসেছিলেন তিনি। আমি তাঁকে বললাম, দেখুন আমি কিন্তু চলে যাওয়ার জন্য সবকিছু রেডি করছি। না বললেও এমনিতেই আমি চলে যেতাম। তিনিও দেখছিলেন যে আমি ইতোমধ্যে অফিস গোছগাছ করছি। বঙ্গভবন থেকে এইবারের মত চূড়ান্ত চলে যাওয়ার জন্য আমার স্যুটগুলোসহ অন্যান্য ব্যক্তিগত সরঞ্জামাদি একজায়গায় জমা করি। সব প্রস্তুতি শেষে রাত আড়াইটায় বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেই।

আমার দেশ: বিদায় নেয়ার সময় আপনি কি আপনার বরাদ্দ করা গাড়িতেই ফিরছিলেন, নাকি অন্য কোন গাড়িতে করে বাড়িতে গিয়েছিলেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: আমার জন্য বরাদ্দ করা নিয়মিত সরকারি গাড়িতে করেই বাড়িতে ফিরি। তখন কারফিউ চলছিল। রাত আড়াইটার দিকে যখন গাড়িতে উঠার জন্য প্রস্তুত হই, তখন দেখি ওই সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তাটি আমার গাড়ির সামনে দাড়িয়ে আছেন। অর্থাৎ যিনি আমাকে চিরকুট দিয়ে এসেছিলেন তিনি। তাঁকে বললাম এত রাতে এখানে আপনি কি করছেন। জবাবে জানালেন বাসায় যাবে। কিভাবে যাবেন জানতে চাইলাম। কারন কারফিউ চলাকালে বাইরে কোন যানবাহন নেই। তখন আমার সামনে পেছনে প্রটোকল গাড়ি রেডি। সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তাটি বললেন স্যার, আমি হেটে হেটে বাসায় যাওয়ার চিন্তা করছি। সেনাবাহিনীর সদস্য, কিন্তু গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত থাকায় তিনি সিভিল ড্রেসে ছিলেন। আমি বললাম, এই কারফিউ অবস্থায় সিভিল ড্রেসে আপনি হেটে কিভাবে ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত যাবেন। আপনাকে তো রাস্তায় গুলি করবে। তারাতো আর চিনবে না আপনি আর্মির একজন মেজর। এক পর্যায়ে তাঁকে বললাম আপনি আমার গাড়িতে উঠুন। তিনি বললেন, এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমার পক্ষে মন্ত্রি পর্যায়ের কারো গাড়িতে উঠা উচিত নয়, সম্ভবও নয়।

আমার দেশ: ওই কর্মকর্তা শেষ পর্যন্ত কিভাবে বাড়ি ফিরেছিলেন কিছু জানেন কী?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: সেটাই তো বলছিলাম। আমি যতই তাঁকে গাড়িতে উঠতে বলি, তিনি ততই জোর দিয়ে না না করতে থাকলেন। এক পর্যায়ে আমি বললাম ‘দিস ইজ মাই অর্ডার, ইউ হ্যাভ টু ক্যারি আউট’। তখন ওই সেনা কর্মকর্তা আমার গানম্যান বা সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা সদস্যকে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি আমার মিন্টু রোডের বাসার দিকে রওয়ানা দিল। কারফিউর মধ্যে রাস্তায় শুনসান নিরবতা। কোন শব্দ নেই। এমন কি পশুপাখি পর্যন্ত নেই। বঙ্গভবন থেকে মুহূর্তেই কাকরাইল মসজিদের পাশে চলে আসি। তখন ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে বললাম এই অবস্থায় আপনি কেমন করে ক্যান্টনমেন্ট যাবেন। তিনি বললেন স্যার, আমাকে দয়া করে এখানে নামিয়ে দিয়ে আপনি মিন্টুরোডে ঢুকে যান। আমাকে এখানে নামিয়ে আপনি বাসায় চলে যান। বললাম কোন অবস্থাতেই এটা সম্ভব নয়। অর্ডার দিলাম গাড়ি ক্যান্টনমেন্ট যাবে। বললাম, ক্যান্টনমেন্টে বাসার সামনে তাঁকে নামিয়ে মিন্টুরোডে নিজের বাসায় ফিরব। সঙ্গে সঙ্গে আমার সিকিউরিটি ও সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে থাকা ওয়ারল্যাসগুলো সচল হয়ে উঠে। শুনতে পাচ্ছিলাম ম্যাসেজ ত্রো হচ্ছে। বলা হচ্ছে মহামান্য রাষ্ট্রপতির মাননীয় উপদেস্টা ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাচ্ছেন। গাড়ি শেরাটন হয়ে বাংলামটর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। ওয়ারল্যাস ম্যাসেজে তখন আওয়াজ আসছিল ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ পথে জাহাঙ্গির গেইটের সামনে রাখা সামরিক ট্যাঙ্ক গুলো সরানো হচ্ছে। জাহাঙ্গির গেইটের একপাশ মূহুর্তের মধ্যেই পরিস্কার করা হল। গাড়ি এই জায়গা অতিক্রম করার সময় গেইটে কর্তব্যরত সেনা সদস্যরা স্যালুট করল। ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করে ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তার বাসায় তাঁকে পৌছে দেই। তাঁকে বাসায় পৌছে দিয়ে আমার গাড়ি আবার উল্টা দিকে মিন্টুরোডে রওয়ানা দেয়। কারফিউ থাকায় দ্রুততম সময়ে আমি মিন্টুরোডের বাসায় পৌছাই। ততক্ষণে রাত পৌনে ৩টা।

আমার দেশ: আপনি বার বার এমএসপি আমিনুল করিমকে জরুরি অবস্থা জরির সহযোগি হিসাবে উল্লেখ করছেন। আপনারা দুইজনই তো বঙ্গভবনে দায়িত্ব পালন করতেন। আপনারা দুইজন একে অপরের সহকর্মী। আপনার বিরুদ্ধে এমএসপি যাবেন কেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: সেটার অনেক কারণ ছিল। সেনাপ্রধানের ক্যু’র প্রধান হাতিয়ার ছিলেন এমএসপি মেজর জেনারেল আমিনুল করিম। ২৯অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পর একজন উপদেস্টার সাথে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডির বাসভবনে গিয়েছিলেন এমএসপি। অর্থাৎ ২৯ অক্টোবর শপথ নেয়া উপদেস্টা পরিষদের এক সদস্যের সাথে। বিদ্যমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে বঙ্গভবনের প্রচেস্টার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে সব উপদেস্টাকেও এগিয়ে আসার আহব্বান জানানো হয়েছিল। শেখ হাসিনার সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিল উপদেস্টা শফি সামি’র। উপদেস্টা সিএম শফি সামি আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন ১৪ দলীয় নেত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে। কিন্তু আশ্চার্য্য জনক হলেও সত্য উপদেস্টা সিএম শফি সামির সাথে সামরিক ইউনিফর্ম লাগিয়ে মেজর জেনালের আমিনুল করিম সেদিন শেখ হাসিনার ধানমন্ডির বাসায় গিয়েছিলেন। আমরা তখন রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে নানা চেস্টায় ব্যস্ত। উপদেস্টা সিএম শফি সামিকে এগিয়ে দেয়ার কথা বলে অর্থাৎ বিষয়টি ফ্যাসিলেটেট করার কথা বলে সামরিক কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গ করে আমিনুল করিম একেবারে শেখ হাসিনার সামনেই চলে যান। উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে কিছু কথা বলে তাঁর আপন হওয়ার চেস্টা করা। কিন্তু উপদেস্টা সিএম শফি সামি এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকায় তাঁর সেই লক্ষ্য ব্যর্থ হয়।

আমার দেশ: আপনি কিভাবে বুঝলেন এমএসপি গিয়েছিলেন শেখ হাসিনাকে কিছু কথা বলতে এবং আপন হতে? আপনার সেই ধারনা সঠিক নাও হতে পারে!

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তাহলে আরো কিছু কথা বলতে হয়। এতেই পরিস্কার ধারনা পাওয়া যাবে। এই ঘটনার কয়েকদিন পরই বঙ্গভবনের উদ্যোগে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন। অর্থাৎ উপরে যে ঘটনাটি বললাম। নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সামনে গাড়ি পৌছালে এমএসপি রিসিভ করেন। সেই দিন সুযোগটি কাজে লাগানোর চেস্টা করেন এমএসপি আমিনুল করিম। গাড়ি বারান্দায় শেখ হাসিনাকে রিসিভ করে রাষ্ট্রপতির রুমের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়ি বারান্দা থেকে রাষ্ট্রপতির রুমে যাওয়ার পথে এমএসপি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন. ‘আপা আমি শেখ কামালের কোর্সমেট।’ তাঁর কথা শুনে মাথা নাড়েন শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতির রুমে পৌছার আগে সিড়িতে আমি তাঁকে রিসিভ করি। তখন উপরে উঠে আসার সময় আমাকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন-‘শুনলেন, আপনাদের বেঈমান এমএসপি আমাকে কি বলল’। জবাবে বললাম, আমরা জানতাম সময়মত এমএসপি এই বক্তব্য নিয়ে আপনার সামনে হাজির হবেন।

আমার দেশ: সরকার পরিবর্তনের আগে অর্থাৎ চার দলীয় জোট সরকার থাকার সময় এমএসপি’র ভুমিকা নিয়ে কোন রিপোর্ট করেননি?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: অবশ্যই বলেছি। যাদেরকে বলেছিলাম তাদেরকে বিশ্বাস করাতে পারিনি। উল্টো আমাদের মধ্যকার একটি গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে আমার বিরুদ্ধে এবং এমএসপি’র পক্ষে অপপ্রচার তথা বিভ্রান্তি জনক প্রচার চালিয়েছেন।

আমার দেশ: এমএসপি যখন শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেন তখনতো প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। তখনো জরুরি অবস্থা জারি হয়নি। তখন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন?

মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: এমএসপি সবার সামনে জোর গলায় বলেই সেদিন সিএম শফি সামীর সাথে শেখ হাসিনার কাছে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সাথে উপদেস্টা শফিক সামি বৈঠক করে বঙ্গভবনে ফিরে আসার পর রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এবং উপদেস্টাবৃন্দ এমএসপির কাছে জানতে চেয়েছিলেন কেন সেনাবাহিনীর পোশাকে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানের বাসায় গিয়েছিলেন। তখন এমএসপি একটু বিব্রতবোধ করেছিলেন। শফি সামি বলেন, আমি তাঁকে নেইনি। তিনি সেখানে গিয়ে বঙ্গভবনের দোহাই দিয়েছেন।