আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় বিশ্বের অন্যতম সেরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বার্কেলি ইউনিভার্সিটির (Berkeley University) নিকট প্রাচ্য ও ধর্মীয় শিক্ষা বিভাগের (Department of Near Eastern and Ethnic Studies) সিনিয়র লেকচারার হাতেম বাজিয়ান। একই সঙ্গে তিনি ইসলামোফোবিয়া শিক্ষা জার্নালের (Islamophobia Studies Journal ) সহ-সম্পাদক এবং ইসলামোফোবিয়া গবেষণা ও ডকুমেন্টেশন প্রজেক্টের (Islamophobia Research and Documentation Project) প্রতিষ্ঠাতা।
গাজায় আগ্রাসন ও গণহত্যার পটভূমিতে কেন সব মুসলিম এবং মানবীয় গুনাবলীসম্পন্ন মানুষকে ইসরাইল বিশেষ করে ইসরাইলি পণ্য বয়কট করা উচিত-তা নিয়ে সম্প্রতি হাতেম বাজিয়ান একটি সুচিন্তিত প্রবন্ধ লিখেছেন। চলতি মাসের ৭ তারিখ (৭ আগস্ট ২০১৪) এই প্রবন্ধটি আল জাজিরার ওয়েবসাইটে মতামত (opinion) অধ্যায়ে ছাপা হয়েছে।
টাইম নিউজের সম্মানিত পাঠকদের জন্য হাতেম বাজিয়ানের প্রবন্ধটির অনুবাদ করা হলো। অনুবাদ করেছেন আমাদের ডিপ্লমেটিক করেসপন্ডেন্ট এবং প্ল্যানিং এডিটর মো: কামরুজ্জামান বাবলু। পাঠকদের চেনার সুবিধার্থে এই গবেষক হাতেম বাজিয়ানের একটি ছবি সংযুক্ত করা হলো। তার লেখার সরল অনুবাদের বিস্তারিত নিম্নরুপ:
১৯৬০ সালে নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক সমুদ্রভ্রমনকারী ইউনিয়ন (New York City Seafarers' International Union) এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ-মাল খালাসকারী সংস্থা (International Longshoremen's Association) ২২ দিনের জন্য ক্লিওপেট্রা (Cleopatra) নামের একটি মিশরীয় নৌযান অবরোধ করে রাখেন।
এ ঘটনায় আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত ডকুমেন্টের একটি ফোনালাপের তথ্য বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমেরিকার অাভ্যন্তরীন রাজনীতি বিষয়ক ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি (Deputy Under Secretary of State for Political Affairs) রেইমন্ড হ্যারি এবং আমেরিকার শ্রমিক স্বার্থ বিষয়ক সংগঠন (American Federation of Labor and Congress of Industrial Organizations- AFL–CIO)-এর সভাপতি জর্জ মিয়ানির মধ্যে এই ফোনালাপটি সংগঠিত হয়।
ফোনালাপে হ্যারি মিয়ানিকে বলেন, ক্লিওপেট্রা জাহাজ অবরোধ ইস্যুকে কেন্দ্র করে সমস্যা জটিল থেকে জটিলতরো হচ্ছে। কারণ এর প্রতিবাদে শিগগিরই প্রাচ্যের সব সমুদ্রবন্দরে আমেরিকার নাবিক ও জাহাজ আরব বয়কটের মুখোমুখি হবে। এমনকি এই বয়কট শেষ পর্যন্ত আমেরিকার বিমানের বেলায়ও প্রয়োগ করা হতে পারে। আর এতে আমেরিকার স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের তখন পুরো আরব বিশ্বকে একত্র করে সম্মেলন করেছিলেন। মিশরীয় নৌযান ক্লিওপেট্রার ওপর আরোপিত অবরোধের জবাবে কী পদক্ষেপ নেয়া যায় তা ঠিক করাই ছিল ওই সম্মেলনের একমাত্র আলোচ্য বিষয়।
এরপর সমস্ত আরব বন্দর শ্রমিকরা একযোগে আমেরিকান নৌযান থেকে মাল খালাস বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট রীতিমতো দিশাহারা হয়ে পড়ে এবং আমেরিকার স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকায় শংকা প্রকাশ করে। যে কোন মূল্যে সমস্যা সমাধানে জোর তৎপরতায় নেমে পড়ে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি গাজায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও অমানবিক আগ্রাসন চালাচ্ছে দখলদার ইসরাইল। আর ইসরাইলের এই গণহত্যায় দিনের পর দিন শর্তহীনভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া। এ পরিস্থিতিতে অবশ্যই প্রশ্ন আসতে পারে কেন আরব বিশ্ব ও মুসলিমরা এসব দেশের পণ্য কিনবে?
একজন সচেতন মানুষ এ অবস্থায় কিভাবে নিজেকে ন্যায় বিচারের পক্ষের লোক হিসেবে দাবি করতে পারেন, যেখানে তার কেনা পণ্যের বিনিময়ে অর্জিত অর্থ ইসরাইলকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা যোগাতে কাজে লাগানো হবে? অথচ এই ইসরাইলের বোমা হামলা থেকে গাজার হাসপাতাল এবং স্কুল পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না। শত শত নিস্পাপ শিশুদেরকে হত্যা করছে যায়নবাদী দখলদার ইহুদীরা। এরপরও এসব দেশ ইসরাইলকে সমর্থন করছে এবং ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন-হামাসকেই উল্টো দোষারোপ করছে।
গণমানুষের শক্তি (Power to the people)
আরব বিশ্ব এবং অন্য মুসলমানরা একত্রে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর রয়েছে শক্তিশালী ক্রয়ক্ষমতা। এই জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ শক্তি আগ্রাসনের সর্বোচ্চ পর্বতকেও মোকাবেলার সামর্থ রাখে। এই মুহুর্তে আমাদের অর্থনৈতিক শক্তির প্রদর্শন হওয়া উচিত। আমাদের বিশাল ক্রেতাদের ইসরাইলি আগ্রাসন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সুচিন্তিত ও সংঘবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে।
বোঝাপড়া: আক্রান্ত গাজা (INTERACTIVE: Gaza Under Attack)
ইসরাইলকে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কুটনৈতিকভাবে রক্ষায় যেসব দেশ কাজ করছে, তারা যেন তাদের কর্মকান্ডের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে আরব ও মুসলিম বিশ্বের কণ্ঠ শুনতে পায়। মনে রাখতে হবে এটা আপনার ওপরই নির্ভর করছে-আপনি ন্যায় ও সততার পক্ষে থাকবেন; নাকি বিলাসিতা, তথাকথিত স্বাধীনতা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী শক্তির ক্রীড়নক থাকবেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরই গৃহিত কিছু স্ট্র্যাটেজিক নীতিমালা পরবর্তীতে গ্রহণ করার পর থেকেই তথাকথিত স্বাধীন আরব বিশ্ব ও মুসলিম সম্প্রদায় ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় কিছুই করতে পারছে না। নিজেদের অক্ষমতা ছাড়া অন্যকিছু ভাবার সামর্থ্য যেন হারিয়ে ফেলেছে মুসলমানরা।
একটি বড় হাতিকে যেমন শুধু অক্ষমতার শিক্ষা দিয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে ওই হাতি নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে কোন ধারনাই রাখে না, ঠিক একইভাবে মুসলিম সম্প্রদায় আজ নিজ লোকদের সামর্থ্যের ব্যাপারেও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। তারা একসাথে স্বপ্ন দেখা ভুলে গেছে এবং অক্ষম রাষ্ট্র যা করতে পারে তার বাইরে কিছুই করার সামর্থ্য নেই আরব বিশ্বসহ মুসলিম সম্প্রদায়ের।
"Power to the people" অর্থাৎ ‘গণমানুষের শক্তি’র এখন অন্যতম দাবি হলো অকার্যকর আরব ও মুসলিম দেশের নেতৃত্বকে তোয়াক্কা না করে নিজেদের জন্য নতুন করে একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা। একজন ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো তার ব্যক্তিগত এবং স্বজাতির মানুষের মনের স্বাধীনতা। দখলদার ইহুদীরা যখন ফিলিস্তিনের শহর ও রাস্তা নিয়ন্ত্রন করছে, তখন ফিলিস্তিনিদের মনের অবস্থা কী হয়? তারা কি তখন নিজেদেরকে স্বাধীন বলে ভাবতে পারছেন, নাকি মানসিকভাবে অবরুদ্ধ মনে করছেন?
ফিলিস্তিনিরা বার বার বিক্ষোভ করছেন তাদের বিরুদ্ধে আরোপিত অবরোধ, বিধি-নিষেধ এবং ক্ষমতার সীমাহীন ভারসাম্যের বিরুদ্ধে। এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে মনের অবস্থার প্রতিফলন হচ্ছ, নাকি এই বিক্ষোভ কেবলই বাহ্যিক? মনে রাখতে হবে একজন অবরুদ্ধ অবস্থায়ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, আবার স্বাধীন হয়েও পরধীনের মতো আচরণ করতে পারেন।
দখলদারিত্বকে কি মেনে নেয়া হবে? (Empowering the occupation?)
একদম নিশ্চিত করে বলতে পারি আরব ও মুসলিম নারী-পুরুষ নিজেদেরকে স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পুরোপুরি সক্ষম। তারা খুব ভালোভাবেই নিজেদের ভাগ্যের নিয়ন্তা হতে পারেন। আর এখনই হচ্ছে তার উপযুক্ত সময়। এই লক্ষ্য অর্জন খুব কঠিন কিছু নয়। এজন্য শুধু একটা বিষয় বিবেচনায় নিলেই অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া যাবে। আর তা হচ্ছে-শুধু ভাবুন আপনি কোন পণ্য ক্রয় ও ব্যবহার করছেন। এই পণ্য কি দখলদার শক্তিকে বলীয়ান করছে?
ইসরাইলের প্রতি যাদের নি:শর্ত সমর্থন রয়েছে, সেইসব দেশকে সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে আজ সব মুসলমানকে এই প্রশ্ন করতে হবে।
এখন আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনার হালাল সম্পদ দিয়ে যেসব পণ্য আপনি ক্রয় করছেন, তা কিছুটা হলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর আগ্রাসন, অবিচার ও হত্যাযজ্ঞ পরিচালনায় সহায়ক হচ্ছে কীনা। সবাইকে জানিয়ে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি স্থানীয়ভাবে তৈরি জিনিসই ক্রয় করতে আগ্রহী, যা আপনার দেশের জনগণকেই প্রকারান্তরে সাহায্য করবে।
ফিলিস্তিনের সহায়তা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে আরব ও মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতিতে মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে শক্তভাবে চেপে বসা দখলদার সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থনীতিকে খতম করাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়, পুরো দক্ষিণা বিশ্বের স্বার্থেই জরুরী।
কোন বিবেকমান মানুষেরই এমনটা ভাবা উচিত হবে না যে গাজার মানুষের সম্মান ও তাদের স্বাধীনতার চেয়ে জীবনের জন্য আরামদায়ক ও সহজলভ্য জিনিস হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে আমরা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদার ও উন্মুক্ত, কিন্তু সেটা নিজেদের সম্মিলিত স্বাধীনতা ও মর্যাদার বিনিময়ে নয়।
সত্যিকার অর্থে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা হলো- পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের দ্বৈতনীতি, ভন্ডামি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখতে দেখতে বিশ্ববাসী রীতিমতো ক্লান্ত। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের অনুভূতি ও মতকে প্রতিনিয়ত অসম্মান করছে ওইসব তথাকথিত বিশ্ব মোড়লরা।
ফিলিস্তিনবাসী, আরববাসী ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমানরা বিগত ৬৭ বছর ধরে পশ্চিমাদের মিথ্যাচার, প্রতারণা, হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসাত্মক কার্যাবলী দেখছেন। আর এটা সম্ভব হচ্ছে ইসরাইলের প্রতি নি:শর্ত সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের কারণেই।
এটা এখন দিবালোকের মতো পরিস্কার যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ যেকোন পরিস্থিতিতে ইসরাইলকে রক্ষায় বদ্ধ পরিকর। ইসরাইলের অবস্থান সঠিক হোক আর বেঠিক হোক এই অবস্থানে কোন পরিবর্তন নেই। যে কোন অবস্থায় ইসরাইলকে অর্থনৈতিক, সামরিক এবং কুটনৈতিক সুরক্ষা প্রদানই যেন আমেরিকা ও ইউরোপের ধর্ম।
ওইসব পণ্য ও ব্র্যান্ড যা ইসরাইলকে শক্তি যোগাতে সহায়তা করছে, যার উৎপাদকরা যায়নবাদী ইহুদীদের নি:শর্ত সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে এবং যা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আরব ও মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ পরিপন্থী, তা থেকে আমরা নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত ঘোষণা করছি। আরব ও মুসলিম নারী-পুরুষের অবস্থান একেবারেই পরিস্কার: শক্তিকে নিজের করায়ত্তে নিয়ে নাও এবং ওইসব দেশ থেকে পণ্য ক্রয় কর যা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে সম্মান করে।
আমি আরও বলতে চাই, তোমার প্রতি আগ্রাসনমূলক তৎপরতায় নিয়োজিত দেশের সরকারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে সেই দেশগুলোর পরিবর্তে ওইসব দেশ থেকে পণ্য ক্রয় কর, যারা তোমার নিজের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে শ্রদ্ধা করে। যেসব দেশ তাদের অর্থ পশ্চিমা অস্ত্র ক্রয় ও ট্রেনিংয়ে ব্যয় করে যাতে তোমাকে তোমার নিজের ভূমিতে কৃতদাসে পরিণত করতে পারে, তাদের পণ্য অবশ্যই বর্জন করতে হবে।
সবশেষ বলতে চাই, হয়তো উপহাস করে কেউ বলতে পারে স্বাধীনতা ও সম্মান কোন একটি পণ্য-যেমন জুতা বা গাড়ি-এর ওপর নির্ভর করে না। যতই তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সুরে এমন কথা বলে আমাদেরকে প্রতারিত করতে প্রয়াস চালাক না কেন, এই বর্জন কর্মের মধ্য দিয়েই আমরা যে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইটা শুরু করতে পারি, তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। একবার শুরুই করি না এ বর্জন যুদ্ধ, দেখবেন মাত্র কয়েকদিনেই এর সুফল কিভাবে ধরা দেয় আপনার হাতে।
ঢাকা, ৮ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি





