অটিস্টিক শব্দের সঙ্গে আমরা যতটা না পরিচিত, তার চেয়ে বেশি পরিচিত অটিস্টিক শিশুদের সঙ্গে। কারণ, এমন কোন গ্রাম বা মহল্লা খুঁজে পাওয়া দায় যেখানে কোন অটিস্টিক শিশুর দেখা মেলে না। সুস্থ্য-স্বাভাবিক শিশুর চেয়ে অটিস্টিক শিশুদের আচরণ কিছুটা অন্যরকম হওয়ায় মানুষের চোখে পড়ে বেশি।
চিকিৎসা শাস্ত্র মতে, অটিজম একটি রোগ। তবে কোন মানসিক রোগ নয়। আর যেসব শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হয় তাদের বলা হয় অটিস্টিক। শিশু অবস্থায় এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। সাধারণত তিন বছর হওয়ার আগেই শিশুর অটিজম সম্বন্ধে লক্ষণ দেখা যায়।
অটিস্টিক শিশুদের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বাংলাদেশেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অটিস্টিক শিশু ও কিশোরদের সংখ্যা বৃদ্ধির হার ভয়াবহ। সূত্র মতে, প্রতি ১ হাজার শিশুর মধ্যে একজন শিশু অটিস্টিক হয়ে জন্ম গ্রহণ করে বা অটিজমে আক্রান্ত হচ্ছে।
ছেলেরা এই রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। ছেলে-মেয়ের আনুপাতিক হার ৪:১। আবার প্রতি ১০ জন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে ২ জনের মধ্যে অত্যন্ত দক্ষতা দেখা যায় ছবি আঁকা, গান, নৃত্য অথবা কম্পিউটার বা গণিতসহ নানা ক্ষেত্রে।
তবে শিশুদের জন্য অটিজম একটি অন্যতম সমস্যা হলেও বিষয়টি সম্পের্কে দেশের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা নেই বললেই চলে। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের সবার ধারণা থাকা প্রয়োজন। আর তাই অটিজম বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতনতার জন্য ২০০৮ সাল থেকে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ পালিত হয়ে আসছে।
প্রতিবছরের ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। সে হিসেবে এবার ৮ম বারের মতো দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও দিবসটি ঘটা করেই পালন করা হচ্ছে। এবারে দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘অটিজম সচেতনতা থেকে সক্রিয়তা, একীভূত সমাজ গঠনে বারতা।’
বাংলাদেশে দিবসটি এবার আরো বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কারণ হলো, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে শিশু মনোবিজ্ঞানী সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল)। তার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও পরামর্শক্রমে ২০১১ সালের ২৫ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে 'Autism Spectrum disorders and developmental disabilities in Bangladesh and South Asian’ এর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১১টি দেশের অংশগ্রহণে ‘ঢাকা ঘোষণা’ গৃহীত হয়, যা অটিজম শিশুদের উন্নয়নে এক মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। তখন থেকেই অটিজম বিষয়ে বাংলাদেশে সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়।
ওই সম্মেলনেই গঠন করা হয় ‘South Asian Autism Network (SAAN)’। যার মাধ্যমে সবাই সক্রিয় হয় অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নে কাজ করার জন্য। ২০১৩ সালে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের রাজধানীতে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ গ্রহণ করে বাংলাদেশে প্রথম সদর দফতর প্রতিষ্ঠিত করে।
এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সায়মা ওয়াজেদের আন্তরিকতার কারণে অটিজম বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এমনকি কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ‘এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারস অ্যান্ড অটিজম সংক্রান্ত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল)। বর্তমানে অটিজম বিষয়ে গবেষণা, সচেতনতা ও কাজের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশে ২০০০ সালে অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নে ঢাকায় প্রথম কাজ শুরু করে ‘সোসাইটি ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব অটিস্টিক চিলড্রেন (সোয়াক)। ‘সুইড বাংলাদেশ’ এর ৪৮টি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলেও অটিস্টিক শিশুদের লেখাপড়ার সুযোগ রয়েছে।
২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে সরকারিভাবে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মিরপুরে ’অটিজম রিসোর্স সেন্টার’ চালু করা হয়েছে। যেখানে অটিজমসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এ ছাড়াও প্রতিটি জেলায় ও কিছু উপজেলায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র ’ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে অটিজমসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে বিভিন্ন সেবা ও সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
সংযুক্তির বিষয় হলো ২০০৮ সালের শেষ দিকে নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে রূপকল্প-২০২১ তুলে ধরে বলা হয়। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তিতে বাংলাদেশকে জনগণ যেভাবে দেখতে চায়- সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভিশন-২০২১ শিরোনামে ২৩ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে।
ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০২১ সালে মধ্যে বাংলাদেশকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এ জন্য নিরলসভাবে কাজও করে যাচ্ছে। তবে সব কিছুর মূলেই রয়েছে মানবসম্পদ। আর টিস্টিক শিশুরা এই মানবসম্পদের বাইরের কিছু নয়।
তাই অটিস্টিক শিশুদের বাদ দিয়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়াও অসম্ভব। এজন্য অটিজম বিষয়ে সচেতনতার পাশাপাশি ওদের উন্নয়নে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে অটিজমের চিকিৎসা বের হলেও আমাদের দেশে এদের নিয়ে সরকারি বা বেসরকারীভাবে তেমন চিন্তাভাবনা করা হয়নি বললেই চলে।
তাই ৮ম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে সরকারের কাছে প্রত্যশা অটিস্টিক শিশু যেন আমাদের বোঝা হয়ে না দাঁড়ায় তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। আর অটিস্টিক শিশুদের পরিবার বা অভিভাবকদের কাছে প্রত্যাশা একটাই 'ওরা আমাদেরই সন্তান, ওদের প্রতি কোন অবহেলা নয়'।
এআর





