আমেরিকার রাজনীতিতে বড় ধরনের একটি পরিবর্তনের আভাস দেখা দিচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ছেড়ে দিতে পারে আমেরিকা। কেননা, আমেরিকা এখন নিজের তেল-গ্যাসের ওপরই নির্ভর করতে যাচ্ছে। আমেরিকার মাটির নিচে যে পরিমাণ তেল-গ্যাস রয়েছে তা সঠিকভাবে উত্তোলন শুরু করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যেই দেশটি তেল-গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাবে বলে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে।

বৃহস্পতিবার এ নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আমেরিকা যদি তার তেলের ক্ষুধা মিটিয়ে ফেলতে পারে তাহলে তাদের ভূরাজনীতি, কৌশল ও নীতি-উদ্দেশ্যগুলো আগামী বছরগুলোতে পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনটা কেমন হতে পারে বা আমেরিকার বিশ্ব রাজনীতির নতুন মডেলটা কী হতে পারে তা জানা যাবে এই প্রতিবেদন থেকে।

আমেরিকা যদি ২০৩০ সাল নাগাদ নিজস্ব তেল-গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যে বিতর্ক এতেও নতুন নতুন নীতি প্রণীত হতে পারে। গত পাঁচ বছরে আমেরিকায় প্রতিদিনের গড় তেলের উৎপাদন ছিল ৩৭ লাখ ব্যারেল। এর ফলে আমেরিকার তেল আমদানি ৪৪ শতাংশ হ্রাস পায়।

এ ব্যাপারে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাজেন্সি (আইইএ)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ফাতিহ বিরুল বলেন, "আমেরিকার তেল প্রাপ্তির এ বিষয়টি জ্বালানি, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতিতে বিরাট প্রভাব ফেলবে।" ৫০ বছর আগে পারমাণবিক শক্তি আবিষ্কারের মাধ্যমে যেভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন চলে আসে, এখনও তেমনটি হবে বলে মনে করেন বিরুল। টেক্সাসের ঈগল ফোর্ড শেল, নর্থ ডাকোটার বাকেন শেলসহ অন্যান্য তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলো বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে টেক্সাসের ঈগল ফোর্ড ক্ষেত্র থেকে পাঁচ বছর আগেও এক ফোঁটা তেল উত্তোলন করা যায়নি। কিন্তু এখন সেখান থেকে প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদিত হচ্ছে।

আইইএ'র এই অর্থনীতিবিদ আরও জানিয়েছেন, আগামী দুই এক বছরের মধ্যে আমেরিকা হতে যাচ্ছে বিশ্বের সর্বোচ্চ তেল উৎপাদনকারী দেশ। তেল উৎপাদনে সৌদি আরবকে ছাড়িয়ে যেতে আর বছর দুয়েক লাগবে বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। ইতোমধ্যে ২০১২ সালে গ্যাস উৎপাদনে রাশিয়াকে টপকে এক নম্বর স্থান দখল করে নিয়েছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাজেন্সি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা যৌথভাবে ২০২০ সাল নাগাদ তেল ও গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। আর যুক্তরাষ্ট্র ২০৩৫ সাল নাগাদ এককভাবেই তেল-গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাবে।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাজেন্সির অর্থনীতিবিদ বিরুল বলেন, "এটি একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। আমেরিকা হতে যাচ্ছে জ্বালানি আমদানিকারক থেকে রফতানিকারক। এর ফলে আমেরিকার জ্বালানি নীতি, পররাষ্ট্র নীতিতে আসবে বড় ধরনের পরিবর্তন।"

আমেরিকার গত ৩৫ বছরের নীতিতে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এর ফলে বিশ্ব ব্যবস্থাতেও দেখা দেবে বড় ধরনের পরিবর্তন। আমেরিকা ৩৫ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যে নীতি শুরু করেছে এটাকে বলা হয় 'কার্টার ডকট্রিন'। কার্টার ডকট্রিনের মূলনীতি হচ্ছে আরব দেশগুলো থেকে যেকোন মূল্যে তেল নিয়ে আসা। আর এই তেল আনার পথকে সুগম করতে যখন যা করার দরকার বলে আমেরিকা মনে করেছে, তাই করেছে। এর নীতির প্রয়োগ আমরা দেখতে পাব ইরাকে, আফগানিস্তানে, লেবাননে, কুয়েতে। আর এসব ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য কোন না কোন ছুঁতো বের করেছে আমেরিকা।

ফলে, আমরা দেখতে পাই ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র ধ্বংসের নামে হামলা হয়েছে। আফগানিস্তানে কথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে প্রায় দেড় দশক ধরে জবরদখল করে রাখা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্যেকটি দেশেই রয়েছে আমেরিকার উপস্থিতি। যারা আমেরিকার তেলনীতিকে মেনে নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হয়নি তাদের। ১৯৮০ সালে এই তেলনীতি অর্থ্যাৎ মধ্যপ্রাচ্য নীতি শুরু করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। তাই এই নীতিকে বলা হয় 'কার্টার ডকট্রিন'।

ইতিহাসবিদ এবং লেখক অ্যান্ড্রু বাচেভিচ আশা প্রকাশ করে বলেন, আমেরিকায় এই তেল-গ্যাসের মজুদ ও উত্তোলন দেশটির দীর্ঘদিনের কার্টার ডকট্রিন নীতিতে পরিবর্তন নিয়ে আসবে। একই কথা জানালেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য এবং ন্যাটোর পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বলিতে ডেনমার্কের প্রতিনিধি জেপি কুফুড।

তবে, আমেরিকার তেল এ স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া এবং তার বিশ্বনীতিতে পরিবর্তন আসবে এটাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা সাদাদ আল-হুসেইনি।

হুসেইনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, আমেরিকা এখনও প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করে। ব্যাপারটা এমন নয় যে আমেরিকা নিজের ৭০ লাখ ব্যারেলের চাহিদা মিটিয়ে আরো ৭০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন করে ফেলবে।

হুসেইনি আরও বলেন, আমেরিকা যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানি নাও করে তবু এর বাজার বন্ধ হবে না। বাকি বিশ্ব ঠিকই তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দিকেই তাকিয়ে থাকবে। বিশ্বের ৪০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

এদিকে, জাতিসংঘের অ্যাম্বাসেডর এবং বিল ক্লিনটনের সময়ের মার্কিন জ্বালানি সচিব বিল রিচার্ডসন মনে করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা আমেরিকা শীঘ্রই কমাবে না। এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল প্রবাহ নিশ্চিত করার আমেরিকার যে কার্টার ডকট্রিন এটাও বাতিল হতে যাচ্ছে না শীঘ্রই। মধ্যপ্রাচ্যে এখনও ব্যাপক রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ আমেরিকার রয়ে গেছে বলেও মনে করেন তিনি।

এ বছরই সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি টাস্ক ফোর্সের একটি প্রতিবেদনে রিচার্ডসন বলেন যে, "আমেরিকার নতুন নতুন তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান আমাদেরকে অনেক উপায় খুলে দিচ্ছে। তবে, আল কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট বা আইএস'র মতো উগ্রবাদী সংগঠনগুলো যেভাবে মাথাছাড়া দিয়ে উঠছে এবং মার্কিন বিরোধী তৎপরতা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে ওই অঞ্চলে তাতে করে ওই অঞ্চল (মধ্যপ্রাচ্য) ছেড়ে আসা যাবে না। বরং আমাদেরকে রাজনৈতিকভাবে এবং কৌশলগতভাবে ওই অঞ্চলে আরও বেশি যুক্ত হতে হবে।"

তবে, আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বনীতি খুব সহসা পরিবর্তন হচ্ছে না বা পরিবর্তন হলেও খুব বড় ধরনের পরিবর্তন আশা করা যাচ্ছে না। তবে, আমেরিকা যদি সত্যিই তেল-গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে; তবে তাদের যুদ্ধংদেহী বিশ্বনীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। তখন তাদের বিশ্ব ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিতে পারে। তবে, একটা বিষয় আবারো স্পষ্ট হলো, আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি মূলত তেলনীতি। সূত্র: আল জাজিরা

এসএমএ